kalerkantho


ঢাকার খোঁজে

তার পরও তাঁরা ঢাকায়ই থাকেন

আবুল হাসান রুবেল   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



তার পরও তাঁরা ঢাকায়ই থাকেন

অঙ্কন : মাসুম

কিছু একটা আছে এই শহরে— প্রয়োজনের সম্পর্কের বাইরেও। কী সেটা? আসলে নানাভাবে ভেঙেচুরে গেলেও, দূষিত হলেও এই শহরের নিজস্ব একটা চরিত্র আছে।

বহুবার ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে ঢাকা। ঢাকার নিজের কথা বলার একটা ভঙ্গি আছে, নিজস্ব খাবারের ধরন আছে, আছে আড্ডা  ►

ঢাকা শহরে আমি যত লোক চিনি, তার অর্ধেকের বেশি এই শহরের ওপর বিরক্ত। ঢাকা ছেড়ে যেতে পারলে যেন বাঁচেন। তার পরও তাঁরা ঢাকায়ই থাকেন। হয়তো হাঁসফাঁস গরমে, যানজটে জবজবে হয়ে ভাবেন—আর না, এভাবে আর পারা যায় না; এবার ছাড়তেই হবে ঢাকা। অনেকে বলেও ফেলেন, অন্য কোনো সুযোগ থাকলে আর দেখতেন না এখানে আমাকে। তার পরও তাঁদের সেটা বেমালুম ভুলে যেতে খুব বেশি সময় লাগে না। এমনকি ঢাকার বাইরে নানা ধরনের সুযোগ দেখিয়ে দিলেও তাঁরা ঢাকা ছাড়েন না। কেউ কেউ কিছুদিনের জন্য গেলেও ফেরার জন্য হাঁ-হুতাশ করেন।

কী আছে ঢাকায়? কোন আকর্ষণে কোন এক অমোঘ টানে আমাদের বেঁধে রেখেছে ঢাকা?

প্রশ্নটার খুব সোজা উত্তর নেই মনে হয়। এক বন্ধুর সঙ্গে আলোচনায় একবার আমরা একমত হয়েছিলাম, ঢাকার সঙ্গে ঢাকাবাসীর সম্পর্কটা অনেকটা সংসারজীবনের মতো। অনেক সময় সেটা একঘেয়ে হয়ে ওঠে, বিরক্তি চরমে পৌঁছে; মনে হয়—আর পারছি না, এবার মুক্তি চাই। কিন্তু কয়েকটা দিন গেলেই বোঝা যায়, আপনার জীবনের সাধারণ বিন্যাসের সঙ্গেই মিশে গেছে সংসার। আপনার কাজকর্মসহ জীবনের প্রয়োজনীয় আয়োজন সেখানেই। ফলে আপনাকে ফিরে আসতে হয়। এই সময়ের ঢাকাবাসীর সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক খানিকটা সে রকম। তাহলে এ কথা বলতেই হয়—সম্পর্কটা যতটা প্রয়োজনের, ততটা প্রেমের নয়। কিন্তু একেবারে প্রেমহীনও নয়; না হলে তো প্রথম সুযোগেই ঢাকা ছাড়ত সবাই বিকল্প পাওয়া মাত্র। তার মানে, কিছু একটা আছে এই শহরে প্রয়োজনের সম্পর্কের বাইরেও।   কী সেটা?

আসলে নানাভাবে ভেঙেচুরে গেলেও, দূষিত হলেও এই শহরের নিজস্ব একটা চরিত্র আছে। বহুবার ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে ঢাকা। ঢাকার নিজের কথা বলার একটা ভঙ্গি আছে, নিজস্ব খাবারের ধরন আছে, আছে আড্ডা। এই শহর তার বাইরে থেকে আসা বহু লোককে নিয়েছে। তবে তারা যেমন ছিল তেমন অবস্থায় নেয়নি, নিজের মতো করে গড়েপিটে নিয়েছে। আর সে যেভাবে নিজের সঙ্গে মিলিয়েছে বহু মানুষকে, তার মধ্যে একটা কৌতুক আছে। সেই কৌতুক যেমন সে অন্যদের নিয়ে করে, তেমনি করে নিজেকে নিয়েও। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই তার কৌতুক নির্দয় পরিহাস না হয়ে মজা করা থেকেছে। সাংস্কৃতিকভাবে ঢাকার একটি বড় গুণ হলো মজা করেও আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা। ঢাকার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তার বেপরোয়া ভাব, তার মর্যাদাবোধ, যাকে বলে ‘হ্যাডম’। এই ‘হ্যাডম’টা ঢাকার খুব আছে । সে কাউকে তেমন গোনে না।

যা হোক, বলছিলাম ঢাকার কৌতুকপ্রবণতা নিয়ে। ঢাকার কৌতুকপ্রবণতা স্বীকৃত। সবচেয়ে বেশি আলোচিত সম্ভবত ঢাকার ঘোড়ার গাড়ি চালক, যাদের বলা হতো কোচোয়ান, তাদের রসিকতা করার ক্ষমতা। একজন যাত্রী কোচোয়ানকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার ভাড়া জিজ্ঞেস করল। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, ‘এক টাকা। ’ তখন যাত্রী অনুযোগ করল, ‘এত ভাড়া চাচ্ছ কেন? ওইটা তো এখান থেকে দেখা যায়। ’ উত্তর এলো—‘হ, চানও তো এইহান থেইকা দেহা যায়, তো চান্দে যান গিয়া!’ এই জবাবের পর বেচারা যাত্রীর আর কী-ই বা বলার থাকে! একইভাবে আরেকটি বিখ্যাত গল্প : যাত্রীর বলা ভাড়া শুনে কোচোয়ানের মন্তব্য—‘আর কইয়েন না সাব, ঘোড়ায় ভি হাসবার লাগছে। ’ এ ধরনের রসিকতায় কল্পনাশক্তির একটা বেশ ভালো ব্যবহার আছে। তবে এটা শুধু ব্যক্তিবিশেষের কল্পনাশক্তিরই প্রকাশ নয়, এর পেছনে একটা সাধারণ সংস্কৃতি আছে। এ ধরনের অসংখ্য রঙ্গরস এখানকার মানুষ, বিশেষত শ্রমজীবী জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। সেটা একটা সাধারণ সংস্কৃতিরই প্রমাণ দেয়। ঢাকায় এখন ঘোড়ার গাড়ি বিলুপ্ত হয়েছে। এই পেশার সঙ্গে যুক্ত রসিকতাগুলোও পরিণত হয়েছে অতীতের ঘটনায়।

কিন্তু কৌতুক ঢাকাকে ছেড়ে যায়নি। বহুদিন পর্যন্ত ঢাকার রিকশাচালক, চা দোকানিদের ভেতরে সেই রঙ্গরসের ধারাবাহিকতা দেখেছি। দুঃখজনক হলো, সেই ধারা যেন ক্ষীয়মাণ। কেন এমন হচ্ছে? একটা শহরের বিবর্তন হতে পারে জীবনযাত্রার, পরিবহনের, খাদ্যাভ্যাসের—সব কিছুরই। কিন্তু সেই পরিবর্তনে অতীতের সঙ্গে একটা সম্পর্ক থাকতে হয়, একটা ধারাবাহিকতা থাকতে হয়। ঢাকার ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিকতার একটা ছেদ ঘটছে মনে হয়। যেমন ধরা যাক রিকশাচালকদের কথা। রসিক রিকশাচালকের সংখ্যা কমছে বলে মনে হচ্ছে। সম্ভাব্য কারণ কী হতে পারে এ ক্ষেত্রে? ঢাকার রিকশাচালকদের একটা বড় অংশ আগে মূলত ঢাকায়ই রিকশা চালাত। বহু বছর ধরে তারা ঢাকার জল-হাওয়া, আলো-বাতাস গায়ে মেখে ঢাকার সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গেছে। এখন পরিস্থিতি পুরোটাই উল্টে গেছে। বেশির ভাগ রিকশাচালক এখন ঢাকায় রিকশা চালায় খণ্ডকালীন কাজ হিসেবে। ঢাকা থেকে রোজগার করেই তাকে ফিরতে হয় গ্রামে। কৃষির জন্য করা ঋণ বা এনজিওর কিস্তির টাকা শোধ করতে। তার পরিবার-পরিজন থাকে গ্রামে। ঢাকায় সে থাকে তার মতো গ্রাম থেকে আসা আরো রিকশাচালকদের সঙ্গে গ্যারেজেই অথবা সস্তা কোনো মেসে। ঢাকার সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার সময় কোথায় তার। এ রকম উদাহরণ অন্যান্য ক্ষেত্রেও অন্যভাবে দেওয়া যায়। সমস্যাটা আসলে রিকশাচালকের নয়, ঢাকারও নয়; সমস্যাটা পুরো দেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক প্রক্রিয়ার। ঢাকা আমাদের অস্তিত্ব জুড়ে আছে। আমাদের সমস্যার প্রকাশ যেমন তাকে কেন্দ্র করে হয়ে থাকে, তেমনি আমাদের শক্তির প্রকাশও করে ঢাকা।

এই লেখা নানা ঘটনা, ইতিহাসের বা বর্তমান সময়ের কিংবা নানা বিষয়ের ভেতর দিয়ে ঢাকার অন্তরাত্মার খোঁজ করবে। চেষ্টা থাকবে ঢাকার বৈশিষ্ট্য আকারে তার কৌতুকপ্রবণ আন্তরিকতা আর ‘হ্যাডম’ও যাতে এই লেখার বৈশিষ্ট্য হয়। লিখেই ভাবলাম, ‘হ্যাডম’ আবার লেখার বৈশিষ্ট্য হয় কিভাবে? কিন্তু লিখে যখন ফেলেইছি, তখন আর তুলে নিচ্ছি না কথাটা। বরং করে দেখাতে চাই সেটা। এটাই আমার ‘ঢাকাইয়া হ্যাডম’।


মন্তব্য