kalerkantho


ঢাকার ক্লাব

খেলাধুলার জায়গায় চলে মাদক-জুয়া

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



খেলাধুলার জায়গায় চলে মাদক-জুয়া

ছবি : শেখ হাসান

ক্লাবগুলো খেলাধুলা চর্চার জন্য গঠন করা হলেও বর্তমানে জুয়া খেলাই মুখ্য ব্যাপার। রাতভর জুয়া চালানোর পর পেশাদার প্রতিযোগিতায় ক্লাবগুলো ভালো দল গঠন করতে পারছে না।

আবার কিছু ক্লাবে জুয়া ছাড়াও বসছে মাদকের আসর, চলছে দেহব্যবসা। ঢাকার ক্লাবগুলোর পরিস্থিতি জানাচ্ছেন সরোয়ার আলম  ►

সিদ্দিকুর রহমান (ছদ্মনাম) থাকেন কুমিল্লায়। তাঁর শখ ক্লাবে ক্লাবে গিয়ে জুয়া খেলা। সেই সুবাদে মাস চারেক আগে ঢাকার মতিঝিলে একটি ক্লাবে আসেন। জুয়া খেলে এক রাতেই আয় করেন ২০ লাখ টাকা। সেই লোভে আবারও আসেন ওই ক্লাবে। এবার আর লাভ নয়, লোকসান গুনতে হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা! সিদ্দিকুরের মতোই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা শত শত ব্যবসায়ী রাজধানীর মতিঝিলপাড়ার ক্লাবগুলোতে জুয়ার আসরে মেতে ওঠেন। রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন ক্লাব, হোটেল, বাসা, বস্তিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা ক্লাবগুলোতে দিব্যি চলছে জুয়ার আসর। আবার কিছু ক্লাবে চলছে অসামাজিক কর্মকাণ্ড।

ক্লাবগুলো খেলাধুলা চর্চার জন্য গঠন করা হলেও বর্তমানে জুয়া খেলাই মুখ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাতভর জুয়া চালানোর পর পেশাদার প্রতিযোগিতায় ক্লাবগুলো ভালো দল গঠন করতে পারছে না। এ রকম প্রকাশ্য জুয়ার আসর ক্রীড়াঙ্গনকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। জুয়ার আসর বসানোর জন্য অনেক ক্লাবই আদালতে রিট করেছে। গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে জুয়ার আসর টিকিয়ে রাখার জন্য উচ্চ আদালতে ৭২টির মতো রিট করা হয়েছে বলে জানান পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই ক্লাবগুলোতে নানা অনিয়ম চলে আসছে; বিশেষ করে জুয়ার আসর বেপরোয়া আকার ধারণ করেছে। সন্ধ্যার পরপরই ক্লাবগুলোর সামনে বাড়তে থাকে বিত্তশালীদের গাড়ির বহর। প্রতিদিন রাতের বেলা জুয়ার আসর জমজমাট হয়ে ওঠে। চলে গভীর রাত পর্যন্ত। আর এসব জুয়া খেলে কেউ হচ্ছেন লাখপতি, আবার কেউ হচ্ছেন পথের ফকির।

 

মৃত্যুও রুখতে পারছে না

জানা যায়, ১৯৯৪ সালের দিকে আরামবাগে আগমন ঘটে ওয়ান-টেন খেলার। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার সব ক্লাবে। এ নিয়ে জুয়াড়িদের মধ্যে এতটাই উত্তেজনা ছড়ায়, যার ফলে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে। ১৯৯৭ সালে দিলকুশা ক্লাবে জুয়াড়িদের হাতে খোকন নামের এক ব্যক্তি মারা যান। এর রেশ ধরে বেশ কয়েক বছর বন্ধ ছিল জুয়ার আসর। এরপর আবার চালু হয়। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সব ক্লাবে জুয়ার আসর নিষিদ্ধ করা হয়। ক্লাবগুলোতে র‌্যাব-সেনাবাহিনীর অভিযান চলত তখন নিয়মিত। কিন্তু ২০০৯ সালের পর ফের ক্লাবগুলোতে জুয়ার আসর জমজমাট আকার ধারণ করে। ২০০১ সালে পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়া রাইফেলস ক্লাবে সায়েম ও মহসীন নামের দুই যুবককে ১২ টুকরা করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় দেশ-বিদেশে তোলপাড় চলে। তার পরও থেমে নেই এই ক্লাবের অপরাধ কর্মকাণ্ড।

 

বেকায়দায় এলাকাবাসী

জুয়ার আসর নিয়ে বেকায়দায় আছে এলাকাবাসী। তারা কোনো প্রতিবাদ করতে পারছে না। নীরবে সব কিছু সহ্য করছে। আরামবাগ এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী আক্কাসুর রহসান বলেন, ‘এলাকার প্রতিটি ক্লাবেই জুয়ার আসর বসে। এলাকায় নিজের বাড়ি থাকায় চলেও যেতে পারছি না। মানসম্মান নিয়ে বাস করাটাই দুষ্কর হয়ে পড়েছে। সন্তানরা রাস্তা দিয়ে হাঁটতেও পারে না। কারো বাড়িতে অতিথি এলে রাস্তায় দালালরা ঘিরে ধরে জিজ্ঞেস করে, খেলবেন নাকি?’ তিনি আরো বলেন, আরামবাগ ক্লাবপাড়ায় কোটি কোটি টাকার জুয়া খেলা চলে। আর এই টাকা ভাগাভাগি হয় প্রভাবশালী ও এলাকার অপরাধীদের মধ্যে। যাদের আধিপত্য বেশি, তাদের ভাগের অঙ্কটাও বেশি হয়। এ কারণেই এখানে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ঘটে রক্তারক্তি ও খুনাখুনির ঘটনা।

 

রক্ষকই যখন ভক্ষক

আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও এসব অপকর্ম চলছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, প্রকাশ্য জুয়ার আসর বসালে ১৮৬৭ সালের আইন অনুযায়ী যেকোনো ঘর, স্থান বা তাঁবুর ভেতর শাস্তির বিধান রয়েছে। মালিক বা রক্ষণাবেক্ষণকারী, জুয়ার ব্যবস্থাপক বা তাদের সহায়তাকারীকে তিন মাসের কারাদণ্ড অথবা ২০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যায়। মূলত এসব অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান থাকলেও প্রয়োগ নেই। নানা কৌশলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তাদের ম্যানেজ করেই চলছে এসব জুয়ার আসর। ফলে তারা এসব কর্মকাণ্ড দেখেও না দেখার ভান করেন। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় থানা ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা জুয়ার আসর থেকে মোটা অঙ্কের মাসোয়ারা পেয়ে থাকেন। আবার নিয়মিত মাসোয়ারা না পেলে জুয়ার আসরগুলোতে হানা দিচ্ছে পুলিশ।

প্রতিটি জুয়ার আসরে প্রতি রাতে চলে কয়েক কোটি টাকার লেনদেন। আর এসব জুয়ার আসরের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে বড় ভাই হিসেবে খ্যাত প্রভাবশালী ব্যক্তিরা, যারা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। জুয়ার উপার্জনের বেশির ভাগই চলে যাচ্ছে তাদের পকেটে। জানা গেছে, নিপুণ, চড়াচড়ি, ডায়েস, ওয়ান-টেন, ওয়ান-এইট, তিন তাস, নয় তাস, রেমি, ফ্ল্যাশসহ ইনডোর গেমস নামে চলছে এসব জুয়া খেলা। এর মধ্যে রেমি ও হাজারি খেলায় আয়োজকরা নেয় বিজয়ীদের কাছ থেকে ২০ শতাংশ, ফ্ল্যাশ ও কাটাকাটিতে ১০ শতাংশ। এভাবে প্রতি আসর থেকে বিপুল টাকা আয় করে আয়োজকরা। পুরো দেশেই রয়েছে জুয়াড়িদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। মূলত তারাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের ম্যানেজ করে। আবার প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণের কারণে সৎ ও নিষ্ঠাবান পুলিশ কর্মকর্তারা ভয়ে এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন না।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মতিঝিল ডিভিশনের উপকমিশনার আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘কোনো ক্লাবে অবৈধ কর্মকাণ্ড চলতে পারবে না। বৈধ কাগজপত্র নিয়ে যদি কেউ জুয়ার আসর বসায়, তাহলে আমাদের করার কিছু নেই। তার পরও ক্লাবগুলোর প্রতি আমাদের নজরদারি রয়েছে। ’


মন্তব্য