kalerkantho


ঢাকার অতিথি

নৃত্যবিদ দুলাল তালুকদার

একজন শিল্পীকে প্রতিষ্ঠা পেতে কঠোর পরিশ্রম ও অনুশীলন করতে হয়। তবে সবার আগে তাঁকে ভালো মানুষ হতে হবে। কারণ মানুষের কাছে একজন শিল্পী অনুকরণীয়

শেখ মেহেদী হাসান   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



নৃত্যবিদ দুলাল তালুকদার

সম্প্রতি ঢাকায় এসেছিলেন হার্ভার্ড স্কুল অব ডান্সের শিক্ষক নৃত্যবিদ দুলাল তালুকদার। তিনি বুলবুল ললিতকলা একাডেমির প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী।

বাঙালি শিল্পী হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর রয়েছে অনবদ্য ভূমিকা। তিনি একাধারে নৃত্যশিল্পী, শিক্ষক, কোরিওগ্রাফার ও সংগীতজ্ঞ। তাঁর সৃজনশীল নাচের কম্পোজিশনে গভীর যত্ন, নিষ্ঠা, শৈল্পিক বোধসহ নানা আঙ্গিক ও শৈলী সার্থকভাবে ফুটে ওঠে। গত মাসে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন তাঁর একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে। ‘আমি দুলাল তালুকদার’ নামে তাঁর জীবনস্মৃতি প্রকাশিত হয়েছে ঢাকা থেকে। বইটিতে স্থান পেয়েছে একটি রক্ষণশীল পরিবার ও সমাজের ব্যূহ ভেদ করে কিভাবে তিনি নৃত্যশিল্পী হয়ে উঠলেন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করলেন, রয়েছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা।

দুলাল তালুকদারের জন্ম ১৯৪৬ সালে, কলকাতায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তাঁরা ঢাকায় চলে আসেন। সেই থেকে কমলাপুরের ঠাকুরপাড়ায় তাঁদের বসবাস।

ছেলেবেলায় গান ও নাচ শেখার ঝোঁক ছিল। তখন সদ্যঃপ্রতিষ্ঠিত বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে (বাফা) ভর্তি হতে উৎসাহিত করেন তাঁরই বড় ভাই গল্পকার মাহবুব তালুকদার। এরপর বাফায় ভর্তি হওয়া এবং নাচ শেখা শুরু। ১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া বাফার নাচের ক্লাসে প্রথম শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিলেন মন্দিরা নন্দী, দুলাল তালুকদার ও রাহিজা খানম ঝুনু। তাঁদের নৃত্যগুরু অজিত সান্যাল ছিলেন নৃত্যাচার্য বুলবুল চৌধুরীর দলের অন্যতম সদস্য। ১৯৬৩ সালে নবাবপুর স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা কলেজে। তারপর দেশ-বিদেশে নাচ বিষয়ে পড়াশোনা ও নিবিড় চর্চায় মনোযোগ দেন। গত শতকের ষাটের দশকে সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হিসেবে বিশ্বের প্রায় ২০টি দেশে নৃত্য পরিবেশনায় অংশ নেন।

ইংল্যান্ডের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, ইরানের বাদশাহ রেজা শাহ পাহলভি, চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করেন দুলাল তালুকদার। তিনি সান্নিধ্য পান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বিশ্বখ্যাত ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান, গজলসম্রাট মেহেদী হাসান, নৃত্যরানি সিতারা দেবী, উদয়শঙ্কর, পণ্ডিত রবিশঙ্করসহ বহু গুণীর। ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে দুলাল তালুকদার যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান স্থায়ীভাবে। সেখানে তিনি নাচের শিক্ষক ও প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি), বোস্টন ইউনিভার্সিটি, বিশ্বখ্যাত লোকনৃত্যদল ‘মান্দালা’সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। বর্তমানে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ডান্সের সঙ্গে যুক্ত আছেন। দুলাল তালুকদারের সম্মানে গত ৬ ফেব্রুয়ারি একটি আলাপচারিতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সেমিনারকক্ষে সেদিন দেশের বিশিষ্ট ও নবীন নৃত্যশিল্পীদের জমায়েত হয়। ওই অনুষ্ঠানে নিজের শিল্পীজীবনের নানা স্মৃতিচারণা করেন প্রবাসী ওই নৃত্যগুরু। নবীন নৃত্যশিল্পীদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন তিনি। সেদিন তিনি বলেন, ‘একজন শিল্পীকে প্রতিষ্ঠা পেতে কঠোর পরিশ্রম ও অনুশীলন করতে হয়। তবে সবার আগে তাঁকে ভালো মানুষ হতে হবে। কারণ মানুষের কাছে একজন শিল্পী অনুকরণীয় ব্যক্তি। যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রচার-প্রসারে আমি কাজ করছি। দেশের সমৃদ্ধি আমাদের গৌরবান্বিত করে। আমি ৪৫ বছর বিদেশে থাকলেও মনটা পড়ে থাকে বাংলাদেশে। দেশের জন্য কিছু করতে চাই। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সম্মান বৃদ্ধির জন্য সবাইকে কাজ করতে হবে। ’


মন্তব্য