kalerkantho


পুরান ও নতুন ঢাকায় বাড়ছে শিক্ষাবৈষম্য

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



পুরান ও নতুন ঢাকায় বাড়ছে শিক্ষাবৈষম্য

একসময় নামি-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সবই ছিল পুরান ঢাকায়। দিন দিন ঢাকার সীমানা বাড়লেও তা পরিচিতি পায় নতুন ঢাকা হিসেবে। তবে নতুন ঢাকা যতই বাড়ুক, মানসম্মত শিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের আসতে হতো সেই আদি ঢাকায়ই। সময়ের পরিক্রমায় পাল্টেছে সেই চিত্র। এখন উল্টো পুরান ঢাকার শিক্ষার্থীদের আসতে হচ্ছে নতুন ঢাকায়। দুই সিটির শিক্ষার বৈষম্য নিয়ে লিখেছেন শরীফুল আলম সুমন

 

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, ঢাকার গণ্ডি সীমাবদ্ধ ছিল গুলিস্তান, পল্টন পর্যন্ত। অর্থাৎ পুরান ঢাকাই ছিল সে সময়ের ঢাকা। দিন দিন ঢাকার সীমানা বাড়লেও তা পরিচিতি পায় নতুন ঢাকা হিসেবে। কিন্তু নতুন ঢাকা যতই বাড়ুক, পড়ালেখার জন্য সেই আদি ঢাকায়ই আসতে হতো শিক্ষার্থীদের। এত দিন নামি-দামি স্কুল-কলেজ সবই ছিল পুরান ঢাকায়। কিন্তু ২০ বছরের ব্যবধানে পরিস্থিতি পুরোই পাল্টে গেছে ঢাকার।

এরই মধ্যে ভাগও হয়ে গেছে ঢাকা। পুরান ঢাকার বেশির ভাগ অংশই এখন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, আর নতুন ঢাকা হচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। ভালো স্কুল-কলেজের জন্য এখন উল্টো পুরান ঢাকার শিক্ষার্থীদের আসতে হচ্ছে নতুন ঢাকায়। পুরান ঢাকার নামি-দামি স্কুল-কলেজগুলোও আগের সেই মান ধরে রাখতে পারছে না। আগে যেখানে পুরান ঢাকার স্কুলগুলোতে ভর্তির জন্য থাকত দীর্ঘ লাইন, এখন সেখানে শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়াই কষ্টকর। ফলে দিন দিন দুই সিটির মধ্যে শিক্ষায় বৈষম্য বেড়েই চলছে। উত্তরে নামি-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ছে, আর দক্ষিণে কমছে।

দুই সিটির মধ্যে শিক্ষায় বৈষম্য বাড়ায় নানা দুর্ভোগও পোহাতে হচ্ছে রাজধানীবাসীকে। এক অঞ্চলের শিক্ষার্থী অন্য অঞ্চলে যাওয়ায় বাড়ছে যানজট। প্রতিদিন সকালে অভিভাবকদের পুরান ঢাকা থেকে শিশুদের নিয়ে দৌড়াতে হচ্ছে নতুন ঢাকায়। আবার ফিরতে হচ্ছে বিকেলে। এমনিতেই পুরান ঢাকা ব্যবসায়িক কেন্দ্র হওয়ায় সব সময়ই থাকে গাড়ির চাপ। তার ওপর শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আসা-যাওয়ার চাপে যানজটে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে দক্ষিণ ঢাকা। একদিকে যানজট, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক চাপ থেকে রক্ষা করতেই ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ব শিশু দিবসের অনুষ্ঠানে প্রতিটি শিশুকে তাদের এলাকার স্কুলে ভর্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘শিশুরা যে এলাকায় বসবাস করে, সেখানকার স্কুলগুলোতে ভর্তির সুযোগ পাওয়া তাদের অধিকার। ’ এরপর নিজ নিজ এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য ৪০ শতাংশ এলাকা কোটা নির্ধারণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু এতেও পুরান ঢাকার অভিভাবকদের নতুন ঢাকায় আসার প্রবণতা কমেনি। কারণ অভিভাবকদের মতে, মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দক্ষিণ ঢাকায় নেই বললেই চলে। ফলে তাঁদের উত্তর ঢাকায় যেতেই হচ্ছে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও বেশির ভাগই মানসম্মত নয়। ফলে নামি-দামি স্কুলগুলো যেখানেই থাক না কেন, অভিভাবকরা সেখানেই ছুটছেন। আমাদের এখন অঞ্চলভিত্তিক কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান বাড়াতে হবে। রাজধানীতে কয়েক শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সেগুলোতে বড় খেলার মাঠ রয়েছে, ভবনও আধুনিক। তার পরও অভিভাবকরা কেন সেখানে তাঁদের সন্তানদের ভর্তি করান না তা খুঁজে বের করে সমাধান করতে হবে। বিশেষ করে আগে যেসব নামি-দামি পুরনো স্কুল ছিল, সেগুলোর হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। এলাকাভিত্তিক ৪০ শতাংশ কোটা চালু করার উদ্যোগটি অবশ্যই ভালো, কিন্তু এতেও সমস্যার সমাধান পুরোপুরি হবে না। এলাকাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করতে না পারলে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে দৌড়াদৌড়ি থামবে না।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এস এম ওয়াহিদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার কিন্তু নতুন আর পুরান ঢাকার শিক্ষায় কোনো বৈষম্য করছে না। ঢাকা মহানগরীতে বেশ কিছু নতুন সরকারি স্কুল-কলেজ স্থাপন করা হচ্ছে। মূলত জনসংখ্যার ভিত্তিতে এবং যেখানে সরকারি স্কুল নেই সেখানেই এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হচ্ছে। দক্ষিণ ঢাকায়ও অনেক সরকারি স্কুল-কলেজ হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান বাড়ানোর জন্য আমরা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণসহ নানা ব্যবস্থা নিয়েছি। তবে বেসরকারি স্কুল ও কলেজ পরিচালনা করে গভর্নিং বডি ও পরিচালনা কমিটি। পুরান ঢাকার স্কুলগুলোর ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে তাদেরই বড় ভূমিকা নিতে হবে। ’

জানা যায়, ঢাকা মহানগরে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড অনুমোদিত ৩৪১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ২১০টি কলেজ রয়েছে। আর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর অনুমোদিত সরকারি ও বেসরকারি দুই হাজার ১৬০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৫১টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এই সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে কম নয়, তার পরও রাজধানীতে মানসম্পন্ন স্কুল-কলেজের ঘাটতি রয়েছে। মাত্র ৪০-৫০টি স্কুল-কলেজ অভিভাবকদের অগ্রাধিকারে রয়েছে। ফলে বছরের শুরুতেই সন্তানদের নিয়ে ভর্তিযুদ্ধে নামতে হয় তাঁদের। কাঙ্ক্ষিত এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে। দক্ষিণের বাসিন্দাদের যানজট ঠেলে সন্তানদের নিয়ে যেতে হয় উত্তরে।

একসময় পুরান ঢাকার খ্যাতিমান স্কুলগুলোর মধ্যে ছিল পোগোজ উচ্চ বিদ্যালয়, আহমেদ বাওয়ানী একাডেমী, আনন্দময়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ইস্ট বেঙ্গল ইনস্টিটিউশন, নবকুমার ইনস্টিটিউট, নারিন্দা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল, শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়, সেন্ট গ্রেগরীজ উচ্চ বিদ্যালয় প্রভৃতি। এসব বিদ্যালয়ে রয়েছে প্রশস্ত মাঠ, বড় বড় ক্লাসরুমসহ নানা সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু তাদের আগের সুনাম আর নেই। সাম্প্রতিক সময়ে এসব বিদ্যালয় মেধাতালিকায় আসতে পারেনি। এমনকি একসময়কার খ্যাতিমান স্কুল হওয়া সত্ত্বেও এখন ভর্তির জন্য কাঙ্ক্ষিত আসনসংখ্যাই পূরণ করতে পারে না। দক্ষিণে অবস্থিত ঢাকা কলেজের সুনামও আগের চেয়ে কমেছে। ঢাকা দক্ষিণে বিশ্ববিদ্যালয় ১১টি; তিনটি সরকারি, আটটি বেসরকারি।

বেশির ভাগ নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান উত্তর সিটি করপোরেশনে। রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রথম স্থান অধিকার করে রেখেছে। মিরপুরের মনিপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাথমিকে প্রথম স্থান অধিকার করে আসছে। দক্ষিণে অবস্থিত রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ধানমণ্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ হাই স্কুল, হলিক্রস কলেজ, সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল, বিএএফ শাহীন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মাইলস্টোন কলেজসহ বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অভিভাবকদের পছন্দের শীর্ষে অবস্থান করছে। ঢাকা উত্তরে বিশ্ববিদ্যালয় ৪০টি; এসবের মধ্যে সরকারি দুটি, বেসরকারি ৩৮টি।

ফল বিবেচনায় ঢাকা বোর্ডের সেরা ২০টি স্কুলের মধ্যে ঢাকা সিটিরই ১৬-১৭টি থাকে। এগুলোর মধ্যে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের থাকে চার-পাঁচটি স্কুল। সেগুলোর বেশির ভাগ আবার উত্তর সিটি করপোরেশনের সীমানাঘেঁষা। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, নটর ডেম কলেজ এবং ডেমরার সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ দক্ষিণের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রথম চারটির অবস্থান উত্তরের সীমানা ঘেঁষে। আবার প্রথম তিনটির শাখা ক্যাম্পাস রয়েছে উত্তরে। দিন দিন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী বাড়ছে। অথচ নামি-দামি সব ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলই উত্তর সিটি করপোরেশনে অবস্থিত।

দুই সিটি করপোরেশনের কোনোটাই শিক্ষা বিষয়ে তেমন কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে না। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মহানগর মহিলা কলেজ পরিচালিত হয়। শিক্ষায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অবদান বলতে এটুকুই। তবে এই প্রতিষ্ঠানও খুব একটা ভালো করতে পারছে না। অথচ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন তাদের এলাকায় ৩০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষাব্যয় যেমন কম, তেমনি ফলও ভালো। তাদের কোন এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কম, সেটা বিবেচনা করেই তারা নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে। এমনকি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও পরিচালনা করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।


মন্তব্য