kalerkantho


প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে আজকের বিশ্ব

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১২ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে আজকের বিশ্ব

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শত বছর পর আজ যখন ইতিহাসবিদরা পেছনে ফিরে তাকান, তখন তাঁরা নানা নেতিবাচক কারণে গোটা বিশ্বে উসকে ওঠা অস্থিতিশীলতাই দেখেন না, বরং দেখতে পান বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী দেশগুলোর সিদ্ধান্ত অনুসারে জার্মানিকে মূল্য চুকাতে হয়েছে বটে, তবে তাতে দুর্ভিক্ষ, সংঘাত, স্নায়ুযুদ্ধ, মানচিত্রে পরিবর্তনের ঘটনা এড়ানো যায়নি। তাই বলে সমাজ, সংস্কৃতি আর অর্থনীতির ইতিবাচক পরিবর্তনের গতি রুদ্ধ করাও যায়নি।

১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ করার জন্য যে শান্তিচুক্তি করা হয়েছিল, সেটার মাধ্যমে বিজয়ী দলগুলো আসলে জার্মানির ওপর কঠোর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছিল—সমালোচকদের অনেকে তেমনটাই মনে করেন। তাঁদের মতে, জার্মানির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ধ্বংস নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানোর যে চেষ্টা করা হয়েছিল, তাতে ফল হয়েছে উল্টো। এতে নািসবাদের ভয়ংকর উত্থান ঘটেছে, পাশাপাশি ইউরোপের পরাধীন ভূখণ্ডগুলোয় সংঘাতের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে নতুন সব রাষ্ট্র।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর হয়ে লড়াই করা ব্রিটেনের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন কর্মকর্তা অর্থনীতিবিদ জে এম কেইনসের কাছে ওই শান্তিচুক্তি কঠোর বলে মনে হয়েছে। ফলে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য কাজ করার পরিবর্তে পদত্যাগের রাস্তা বেছে নিয়েছিলেন তিনি। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ওই চুক্তি যথেষ্ট ছিল না, এমন মন্তব্য করেছিলেন ফ্রান্সের তৎকালীন মার্শাল ফার্দিনান্দ ফশ।

দুর্ভিক্ষ, সন্ত্রাস, স্নায়ুযুদ্ধ : দুর্ভোগ শুধু ইউরোপে নয়, ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরেশীয় রাশিয়ায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যেন ছিল ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের সূতিকাগার। এর মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের উদয় ঘটলেও পরবর্তী পরিস্থিতি আরো ভয়বহতার দিকেই এগিয়েছিল। বিধ্বংসী কৃষিনীতির জেরে ১৯৩০-এর দশকে প্রথম দিকে ওই ভূখণ্ডে ৩০ লাখের বেশি লোক দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারায়। তার ওপর জোসেফ স্টালিনের মহাশুদ্ধি কর্মসূচি বাস্তবায়নের সময় প্রাণ যায় আরো লাখ লাখ লোকের। এর পরবর্তী ফল হিসেবে একসময় টুকরা টুকরা হয়ে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। ভাঙন ধরে ইউরোপের মানচিত্রেও। এসবের পাশাপাশি নতুন বিশ্বশক্তি হিসেবে হিসেবে উদিত হয় পশ্চিমের যুক্তরাষ্ট্র।

মধ্যপ্রাচ্য পরিস্তিতি : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যেসব পরিবর্তন এসেছে, এর প্রভাব বিশ্ববাসীর সামনে আজও দৃশ্যমান। আরব বিদ্রোহ, আর্মেনীয় গণহত্যা, অটোমান ভূখণ্ডে স্থিতিশীলতা, ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি সৃষ্টির মতো উল্লেখযোগ্য ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে ঘটেছিল। অটোমান সাম্রাজ্যের ভাঙনের মধ্য দিয়ে উদারপন্থী তুরস্কের জন্ম হওয়ার ঘটনা বিশ্লেষকদের কাছে ইতিবাচক, সেটা যেমন সত্যি, তেমনই সত্যি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আজও চলতে থাকা ধর্মভিত্তিক বিভেদ, যার সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব।

নতুন সমাজব্যবস্থা : সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিস্থিতি ইউরোপকে ভীষণ ভাবিয়ে তোলে। অভ্যুত্থানের আশঙ্কায় ইউরোপের অনেক দেশে সংস্কার কার্যক্রম গতি পায়। শক্তিশালী হয়ে ওঠা শ্রমিক সংগঠনগুলোর তৎপরতায় কর্মপরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। এ ছাড়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ পরবর্তী সময়ে তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে। আর বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতায় যে বিপুলসংখ্যক মানুষের শারীরিক অক্ষমতা ও মানসিক বিকার দেখা দেয়, তাদের প্রতি বাকিদের মনে তৈরি হওয়া সহানুভূতি বড় ধরনের সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে আসে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইতিবাচক প্রভাবের তালিকা থেকে বাদ পড়েনি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিবর্তনও। সে সময় থেকেই কবিতা এক শিল্প হিসেবে বিশ্বজুড়ে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। সৃষ্টিশীল চিত্রকর্মে জায়গা করে পরাবাস্তববাদ। তারুণ্য জাগানো সংগীতের ধারা ‘জ্যাজ’ আমেরিকান সেনাদের হাত ধরে ইউরোপে বিস্তৃত হয়। সূত্র : এএফপি।



মন্তব্য