kalerkantho


সিএনএনের বিশ্লেষণ

সালমানকে বাঁচাতে খাশোগি হত্যার ‘উদ্ভট’ ব্যাখ্যা

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



সালমানকে বাঁচাতে খাশোগি হত্যার ‘উদ্ভট’ ব্যাখ্যা

যাঁর সব আছে তাঁকে আর কী দেওয়া যায়? জবাবটি হলো—খুন করার পর হোয়াইট হাউসের দায়মুক্তি! সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আল সৌদ ঠিক এই আবদারটিই করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে। আর অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ট্রাম্প সেই আবদার মিটিয়েছেন। এখন তার লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে। আর আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের কূটনৈতিক এডিটর নিক রবার্টসনের একটি প্রতিবেদনে বিষয়টির বিশ্লেষণ এভাবেই করা হয়েছে।

মোহাম্মদ বিন সালমান এমবিএস নামেই বেশি পরিচিত। ধারণা করা হয়, ৫০ কোটি ডলার মূল্যের একটি সুবিশাল প্রমোদ তরীর মালিক তিনি। বিশ্বের সবচেয়ে দামি বাড়ি প্যারিসের উপকণ্ঠে সুম্পতুয়াস শাত্যু প্রাসাদ তাঁর। গত বছর বিশ্বের সবচেয়ে দামি শিল্পকর্ম লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির সালভাতর মুন্ডি ৪৫ লাখ ডলার দিয়ে কেনেন তিনি।

এত সম্পদশালী একজন মানুষ তাঁর এক সমালোচকের মুখ বন্ধ করতে সহযোগিতা নেন তাঁর ধামাধারীদের। এখন সেই লোকগুলোকেই ফাঁসানো হচ্ছে ওয়াশিংটন পোস্টের কলাম লেখক জামাল খাশোগিকে হত্যার দায়ে। আর এই সত্য প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করছেন খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

গত শনিবার সৌদি সংবাদ সংস্থা জানায়, ১৮ দিন আগে নিখোঁজ খাশোগি মারা গেছেন। এই দাবি তুরস্কের কর্মকর্তারা করে আসছেন খাশোগি নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর থেকেই। শনিবারের আগ পর্যন্ত সৌদি আরবের অবস্থান ছিল, তারা খাশোগির বিষয়ে কিছুই জানে না। এমনকি খাশোগি নিখোঁজ হওয়ার পরদিন ব্লুমবার্গকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সালমান বলেন, যে কেউ চাইলে ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেট পরীক্ষা করে দেখতে পারে। যদিও সৌদি আরবের নানা টালবাহানায় সেই তল্লাশি করতে তুর্কি কর্মকর্তারা ঢোকে ১৫ অক্টোবর। তত দিনে দূতাবাস ভবনের ভেতরের চেহারায় বেশ পরিবর্তন এসেছে। এক পরত রং-ও বসে গেছে দেয়ালের গায়ে। এরও দিনতিনেক পর সৌদি আরবের তরফ থেকে খাশোগির খবর প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে তারা জানায়, সৌম্য স্বভাবের খাশোগি সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ‘মারামারি’ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। এ ব্যাপারে বিস্তারিত তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে  সালমানকে। তবে ‘গভীর দুঃখজনক’ এ সংবাদ যে বিবৃতির মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। যেমন এটি প্রকাশের সময়। শনিবার স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় বিবৃতিটি প্রকাশ করা হয়। সৌদি অ্যাটর্নি জেনারেলের কাজের সময় এটি প্রকাশ করা হয়নি। লাশ কোথায়, কী করা হয়েছে জানানো হয়নি। একই সঙ্গে মারামারি কেন শুরু হলো সে সম্পর্কেও কিছু বলা হয়নি। পুরো বিবৃতিটিই ফাঁপা।

আরেকটি বিষয় নিয়েও বারবার সৌদি আরব থেকে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তারা তুরস্কের সঙ্গে তদন্তকাজ পরিচালনায় আগ্রহী। এতে সত্যতার লেশমাত্র নেই। তুরস্কের তদন্তকারীদের কনস্যুলেটে অভিযান চালানোর ব্যাপারেও সহযোগিতা করা হয়নি। ঘটনার বেশ কিছুদিন পর ১৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক চাপের কারণে কনস্যুলেটে ঢোকার সুযোগ পায় তুরস্ক। যে ১৫ জন সৌদি থেকে ২ অক্টোবর অর্থাৎ খাশোগির কনস্যুলেটে যাওয়ার দিন তুরস্কে যায় এবং সারা দিন ওই ভবন ও পার্শ্ববর্তী কনসাল জেনারেলের বাসভবনে কাটায় তাদের বিষয়েও সৌদি আরবের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। এই দলটিকে কিলিং স্কোয়াড হিসেবে মনে করছে তুরস্ক।

সৌদি আরব জানিয়েছে, খাশোগির হত্যার সঙ্গে যুক্ত সন্দেহে ১৮ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে এর মধ্যে ওই ১৫ ব্যক্তি আছে কি না তা স্পষ্ট নয়। আর এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে বড় রহস্য মোহাম্মদ বিন সালমানের ভূমিকা সম্পর্কে একটি শব্দও খরচ করা হয়নি। ইঙ্গিতে বলা হয়েছে, তিনি এর কিছুই জানতেন না। সৌদি আরবের সব ক্ষমতা এই এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত। বলা হয়ে থাকে তাঁর সহকারীরা তাঁর অনুমতি ছাড়া একটা ইঁদুরও মারেন না। তাহলে তাঁর অজ্ঞাতে এত বড় ঘটনা কী করে ঘটে গেল?

ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের বহু দেশ সৌদি বিবৃতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, খাশোগির মৃত্যুর ব্যাপারে সৌদি ব্যাখ্যায় আস্থা আছে তাঁর। যদিও সৌদি বিবৃতির মূল্যায়ন অব্যাহত রয়েছে। তবে তাঁর আচরণে স্পষ্ট যে মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রতি তাঁর সমর্থন অব্যাহত থাকবে। ঠিক এই অবস্থানটিই বিন সালমানের প্রত্যাশিত ছিল। সামগ্রিক অর্থে যা ভয়াবহ। এই বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ বিশ্বের সবচেয়ে স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তিকে দায়মুক্তি দিতে আগ্রহী, যা সৌদির ওপর মোহাম্মদ বিন সালমানের নিয়ন্ত্রণ আরো কঠোর করবে। সৌদি আরবের মানুষ এখন ফিসফিস করে কথা বলতেও ভয় পায়। ট্রাম্পের এ অবস্থানের ফলাফল স্পষ্ট, আরো নৈরাজ্য আসছে।

সূত্র : সিএনএন।

 



মন্তব্য