kalerkantho


সংবাদ সম্মেলনে লেখক-সমাজকর্মীরা

ব্যর্থতা ঢাকতেই দেশের নজর ঘোরানোর ছক মোদির

বিজেপি ও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা যে ‘বিপজ্জনক গতিতে’ নামছে, বিভিন্ন সমীক্ষায়ই তা স্পষ্ট : অরুন্ধতী রায়

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ব্যর্থতা ঢাকতেই দেশের নজর ঘোরানোর ছক মোদির

ভিড়ে ঠাসা দিল্লির প্রেস ক্লাবে ছুড়ে দেওয়া হলো প্রশ্নটা—‘হাত তুলে বলুন, এখানে কে কে শহুরে মাওবাদী?’ হাত তুললেন সাহিত্যিক ও মানবাধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায়, হাত তুললেন গুজরাটের দলিত বিধায়ক জিগ্নেশ মেবাণী। হাত তুলল ছাত্র-ছাত্রী, আইনজীবী, সমাজকর্মী, সাংবাদিকদের ভিড়টাও।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে হত্যার ষড়যন্ত্র ও মাওবাদীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে লেখকসহ পাঁচ সমাজকর্মীকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে প্রেস ক্লাবে বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন অরুন্ধতী, জিগ্নেশ, আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ, সমাজকর্মী অরুণা রায়রা। সেখানেই তাঁরা অভিযোগ করলেন, ভোটের মুখে নিজেদের যাবতীয় ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরাতে ‘ডাইভার্ট অ্যান্ড রুল’ নীতি নিয়ে চলছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। এক ধাপ এগিয়ে জিগ্নেশ দাবি করেন, মোদি জমানার গুজরাটের মতোই হত্যার ষড়যন্ত্রের গল্প ফেঁদে সহানুভূতি উসকে দেওয়ার ছক কষছে বিজেপি।

আটক সমাজকর্মীদের এবং তাঁদের প্রতি সহানুভূতিশীলদের ‘শহুরে মাওবাদী’ বা ‘আরবান নকশাল’ তকমা দিচ্ছেন কেউ কেউ। বুকারজয়ী সাহিত্যিক অরুন্ধতী তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই বলেন, ‘আমি অরুন্ধতী রায় এবং হ্যাশট্যাগ-মিটু-আরবান নকশাল।’ তাঁর মতে, কয়েকজন সমাজকর্মীকে গ্রেপ্তার করে আসলে লাখ লাখ মানুষকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে সরকার।’

রাফাল দুর্নীতি, নোট বাতিল, জিএসটি, বেকারত্ব, দলিত ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, কৃষকদের অসন্তোষ, গৌরী লঙ্কেশের খুনের ঘটনায় হিন্দু সংগঠন সনাতন সংস্থার দিকে আঙুল ওঠা—মোদি সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের কারণ যথেষ্টই। অরুন্ধতীর কথায়, “বিজেপি ও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা যে ‘বিপজ্জনক গতিতে’ নামছে, বিভিন্ন সমীক্ষাতেই তা স্পষ্ট। পাঁচ সমাজকর্মীকে গ্রেপ্তার করলে যে প্রতিক্রিয়া হবে, সরকার তা জানত। তারা চেয়েছিল, এটা হোক।”

গত জানুয়ারিতে মহারাষ্ট্রের ভীমা-কোরেগাঁওতে দলিত বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান-পরবর্তী হিংসার তদন্তের সূত্রেই শুরু হয়েছিল ধড়পাকড়। দলিতদের সেই অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন জিগ্নেশ। তিনি বলেন, ‘এই গ্রেপ্তারের পেছনে তিনটি বিষয়ের মিশ্রণ দেখছি। ফ্যাসিবাদ, জরুরি অবস্থা এবং গুজরাট মডেল।’

কেন গুজরাট মডেল? রাজস্থানে ভোটের প্রচারের ফাঁকে দিল্লিতে আসা জিগ্নেশের ব্যাখ্যা, “গুজরাটের মতো এখানেও আন্দোলনকারীদের ওপরে হামলা করেছে রাষ্ট্র। আসল উদ্দেশ্য, মোদির জন্য সহানুভূতি জাগিয়ে তোলা। প্রতিবছরই কোনো না কোনো জিহাদি মোদিজিকে ‘খুনের’ জন্য গুজরাটে আসত। ভুয়া সংঘর্ষে সে মারা যেত। মোদি এবং অমিত শাহের নির্দেশেই এবারের গল্পটা সাজিয়েছে মহারাষ্ট্র পুলিশ।”

কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর সুরেই অরুন্ধতীও যুক্তি দেন, “নোট বাতিলে আর্থিক বৃদ্ধির হার ১.৫ শতাংশ কমেছে। ফলে ১৫ লাখ লোক চাকরি হারিয়েছে। আর বিজেপি সব থেকে ধনী দল হয়েছে। নীরব মোদী-বিজয় মাল্যেরা টাকা লুট করে পালিয়েছেন। সরকার কিছুই দেখেনি। আসল ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ হলো নতুন রাফাল চুক্তি। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বদলে অনিল অম্বানিকে বরাত দেওয়া হয়েছে। যৌথ সংসদীয় কমিটির তদন্তের দাবি উঠেছে। আবার শিক্ষার বেসরকারি করে সংরক্ষণে আঘাত করা হচ্ছে।” জিগ্নেশের অভিযোগ, দলিতদের ‘অম্বেদকর-বাদ’-কে মাওবাদের তকমা দেওয়া হচ্ছে। যারা সঙ্ঘ-পরিবারের বিরুদ্ধে লড়ছে, তাদেরই ভয় দেখানো হচ্ছে। তিনি জানান, ৫ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে রাস্তায় প্রতিবাদে নামবে দলিতরা। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০টি রাজ্যে বিক্ষোভ দেখাবে ভীমা-কোরেগাঁওয়ের আয়োজক এলগার পরিষদ। অরুণা রায়, প্রশান্ত ভূষণরা যুক্তি দেন, যে সমাজকর্মীরা গরিবদের জন্য কাজ করছেন, তাঁদেরই জেলে ভরা হচ্ছে। ভূষণ বলেন, ‘যা হচ্ছে, তা জরুরি অবস্থার থেকেও খারাপ।’

গতকাল দিল্লির যন্তর মন্তরের বিক্ষোভ জমায়েতেও উপচে পড়ে ভিড়। সেখানে দাবি ওঠে, ইউএপিএ আইন প্রত্যাহার করা হোক। পুনের মামলা তুলে নিয়ে ধৃতদের ল্যাপটপ, মোবাইল ফিরিয়ে দেওয়া হোক। অরুন্ধতী আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ভোটের দিন যতই এগিয়ে আসবে, ততই এই ধরনের ঘটনা বাড়বে। গৌরী লঙ্কেশের খুনে সনাতন সংস্থার নাম দেখিয়ে দিয়েছে, হিন্দু সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের হিটলিস্ট, গোপন আস্তানা, অস্ত্র-বোমা সব মজুদ। তিনি বলেন, ‘ভোটের আগে এদের কী পরিকল্পনা রয়েছে, জানে না কেউ। কাশ্মীর, না কুম্ভমেলা, নাকি অযোধ্যা—কোথায় হামলা হবে, কেউ জানে না।’

মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মীদের ধরপাকড়ের প্রতিবাদে ওই দিন কলকাতায় ১৭টি বাম দল বিক্ষোভ মিছিল করে। ওই মিছিল থেকে মোদিকেই ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা।



মন্তব্য