kalerkantho


বিশ্ব পানি সম্মেলনে প্রতিবেদন প্রকাশ

বিশ্বের ৩৬০ কোটি মানুষ পানি সংকটে

আশরাফুল হক, ব্রাসিলিয়া (ব্রাজিল) থেকে   

২০ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বিশ্বের ৩৬০ কোটি মানুষ পানি সংকটে

বিশ্বে বর্তমানে ৩৬০ কোটি মানুষ পানি সংকটে রয়েছে। প্রতিবছর পানি ব্যবহারের হার ১ শতাংশ হারে বাড়ছে। বৃদ্ধির এই হার অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে ৫৭০ কোটি মানুষ পানির সংকটে পড়বে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেসকোর ২০১৮ সালের পানি উন্নয়ন প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। গতকাল সোমবার ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় অনুষ্ঠানরত অষ্টম বিশ্ব পানি সম্মেলনে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও ব্যবহারের ধরন বদলে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী পানির ব্যবহার প্রতিবছর ১ শতাংশ হারে বাড়ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যা দাঁড়াবে এক হাজার ২০ কোটি। তখন এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের জোগান দিতে খাদ্য উৎপাদন ৫০ ভাগ বাড়াতে হবে। বর্তমানে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ ক্ষুধা নিয়ে ঘুমাতে যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপদ পানির সবচেয়ে বড় হুমকি হচ্ছে দূষণ। আফ্রিকা, এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার বেশির ভাগ নদীর পানি দূষিত। এটা আগামী দশকে মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। প্রায় ৮০ শতাংশ শিল্প ও নগর বর্জ্য কোনো ধরনের শোধন ছাড়াই নদীতে ফেলা হচ্ছে, যা পানির গুণগত মান নষ্ট করছে। এটা জনস্বাস্থ্যের ক্ষতিসহ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ‘ফাও’কে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে কৃষিকাজে পানির ব্যবহার সাড়ে পাঁচ শতাংশ বাড়বে। এতে আরো বলা হয়, উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে পানির চাহিদা অনেক বেশি বেড়েছে। একই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক পানিচক্র ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে। এর ফলে পানিসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোতে পানি আরো বাড়ছে আর খরাপ্রবণ এলাকাগুলোতে পানির সংকট আরো তীব্র হচ্ছে। পানিদূষণ কমানোর জন্য প্রকৃতিভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। হুমকির মুখে থাকা কোটি কোটি মানুষের পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘সবুজনীতি’ গ্রহণ করতে হবে। পানির সরবরাহ ও মান উন্নয়নের জন্য সব দেশের সরকারকে আরো মনোযোগ দিতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সবুজ সমাধানে এরই মধ্যে ব্যাপক সফলতা পাওয়া গেছে। নিউ ইয়র্কে ১৯৯০ সাল থেকে পানি সরবরাহের জন্য তিনটি বড় জলাধার সংরক্ষণ করা হচ্ছে। বন সংরক্ষণ কর্মসূচি ও কৃষকদের পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য আলাদা করে অর্থ দিতে হয়। সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত পানি সরবরাহব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে শহরটি এখন অনেক অর্থ সাশ্রয় করতে পারছে। সেখানকার সাগরের পানি পরিশোধন ও উপকূল রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ শহর কর্তৃপক্ষ বছরে ৩০ কোটি ডলার সাশ্রয় করতে পারছে।

নগরের পানির প্রাপ্যতা বাড়ানোর জন্য চীন ‘নগর জীবন যাপন’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে নগরের ব্যবহার্য শতকরা ৭০ ভাগ পানি হবে বৃষ্টির পানি। এই পানি ব্যবহারের পর শোধন করে আবার ব্যবহার করা হবে। এ ধরনের ১৬টি পাইলট প্রকল্প ২০২০ সালের মধ্যে নির্মাণ করবে দেশটি, যেখানে ব্যয় হবে ১২০ কোটি ডলার। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন মাটি ব্যবস্থাপনা, ধারণক্ষমতা বাড়ানো ও সংরক্ষণ করা, পানি বিশুদ্ধকরণ ও আশপাশের জলাধারে তা সংরক্ষণ করার পরিকল্পনা করছে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার মাটি ও পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির সংকটের কথাও রয়েছে। বরিশালে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে পান করার জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

ব্রাসিলিয়া সম্মেলনে ইউনেসকোর মহাপরিচালক অদ্রি আজুলাই প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বলেন, ‘আমরা যদি বসে থাকি বা কোনো উদ্যোগ না নিই তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৫৭০ কোটি মানুষ পানির তীব্র অভাবের মধ্যে পড়বে। পানিসংক্রান্ত দ্বন্দ্ব নিরসনে আমাদের সবাইকে এক হয়ে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এসব বাস্তবায়ন করতে হবে।’

প্রতিবেদনের প্রধান সম্পাদক রিচার্ড কনর বলেন, ‘মানুষের তৈরি অবকাঠমো যেমন সংরক্ষণাগার, সেচ খাল ও পরিশোধনকেন্দ্র এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট নয়। আর পলি ভরাট, পরিবেশগত উদ্বেগ ও প্রতিবন্ধকতার কারণে নতুন করে সংরক্ষণাগার তৈরি করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া বেশির ভাগ উন্নত দেশের স্বল্প ব্যয়ের ও সহজলভ্য স্থানগুলো এরই মধ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে।’


মন্তব্য