kalerkantho


আফগানিস্তানের ৭০ শতাংশ এলাকা তালেবানের কবলে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আফগানিস্তানের ৭০ শতাংশ এলাকা তালেবানের কবলে

আফগানিস্তান থেকে জঙ্গিবাদ উৎখাতের নামে ১৫ বছর ধরে চলছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা। দেশটিতে এখনো ১১ হাজার সেনা সদস্য মোতায়েন রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আফগানিস্তানের ৭০ শতাংশ এলাকায় তালেবান প্রবল মাত্রায় সক্রিয়। এর মধ্যে কিছু এলাকা পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং বাকি এলাকাগুলোতে তাদের প্রকাশ্যে চলাফেরা আছে, যেখানে হরহামেশা তারা হামলা চালায়। গতকাল বুধবার প্রকাশিত বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে আফগানিস্তানে তালেবান তৎপরতার এ চিত্র।

বিবিসির প্রতিবেদকরা গত বছর ২৩ আগস্ট থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত আফগানিস্তানের ৩৯৯ জেলার সব কটিতে অনুসন্ধান চালায়। প্রতিটি জেলায় কমপক্ষে দুজন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছয়জন ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি অথবা ফোনে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সব মিলিয়ে এক হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসির কর্মীরা। সংগৃহীত তথ্য বলছে, আফগানিস্তানের মোট জনগণের অর্ধেক অর্থাৎ প্রায় দেড় কোটি মানুষ তালেবান অধ্যুষিত এলাকায় বাস করছে।

জঙ্গি অধ্যুষিত এলাকার বাসিন্দাদের কাছে রাতে ঘরে ফিরতে পারার মানে হলো আরেকটি দিন বেঁচে থাকতে পারা, আরেকটি দিন প্রিয় মুখগুলোর সান্নিধ্যে সময় কাটাতে পারা। উত্তরাঞ্চলীয় বাদাখশান প্রদেশের বাহারাক জেলায় তালেবানের উপস্থিতি মাঝারি পাল্লার। সেখানকার এক পরিবহন কম্পানির মালিক আমরুদ্দিন বলেন, ‘আমরা সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকি। সরকারপক্ষ তালেবানের সঙ্গে লড়াই শুরু করলেই আমরা ক্রসফায়ারে আটকে যাই, জীবনটা যেন থমকে যায়।’ কাবুল প্রদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলার শিক্ষক মাহগুল বলেন, ‘হয় তালেবানের শাসনে থাকতে হবে, নয়তো বাড়িঘর আর জমিজমা ছেড়ে চলে যেতে হবে। এ ছাড়া মানুষের অন্য কোনো রাস্তা নেই।’

২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো সেনাদের আফগানিস্তানের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর তালেবানের প্রভাব কতটা বেড়েছে, সেটাই তুলে ধরা হয় বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। বলা হয়, ২০১৪ সালের পর থেকে তালেবান জঙ্গিরা তাদের দক্ষিণাঞ্চলীয় শক্ত ঘাঁটি থেকে সারা দেশে বিস্তৃত হয়েছে। আফগানিস্তানের ১৪টি জেলা অর্থাৎ দেশের ৪ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতে। এ ছাড়া আরো ২৬৩ জেলায় তাদের প্রকাশ্য তৎপরতা রয়েছে। বাকি ১২২ জেলায় জঙ্গিদের খোলাখুলি তৎপরতা নেই। এ জেলাগুলো দৃশ্যত সরকারের নিয়ন্ত্রণে বটে, তবে এসব এলাকার কোনোটিই সহিংসতামুক্ত নয়।

অনুসন্ধান চলাকালে দেখা গেছে, যেসব এলাকায় জঙ্গি তৎপরতা খুব বেশি, সেসব এলাকায় প্রতি সপ্তাহে দুটি করে হামলা হয়েছে। যেখানে জঙ্গি তৎপরতা কম, সেখানে তিন মাসে অন্তত একটি হলেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে বড় হামলাগুলো হয়েছে রাজধানী কাবুল ও অন্যান্য বড় শহরে। ছোট ছোট অসংখ্য হামলার ঘটনা বড় হামলার খবরের আড়ালে থেকে গেছে। জাতিসংঘের হিসাবে, ২০১৭ সালের প্রথম ৯ মাসে সাড়ে আট হাজারের বেশি সাধারণ নাগরিক সহিংসতায় হতাহত হয়েছে।

দেশজুড়ে কর আদায়ও করছে জঙ্গিরা। তাদের দখলে থাকা এলাকার ব্যবসায়ী, কৃষক ও বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনকারী বহরের কাছ থেকে তারা কর নিচ্ছে। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের মতো জনসেবা খাতের ব্যয়ভার তারা সরকারের ওপরই ছেড়ে রেখেছে। দক্ষিণাঞ্চলের এক ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘বিদ্যুৎ সরবরাহ করছি আমরা। আর মানুষের কাছ থেকে অর্থ নিচ্ছে তারা (তালেবান)।’

তালেবানের পাশাপাশি বেড়েছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) তৎপরতাও। আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তান সীমান্তবর্তী নাংগারহার প্রদেশে তারা সবচেয়ে শক্তিশালী। স্থানীয়দের তথ্য মতে, কেবল পূর্বাঞ্চলে নয়, উত্তরাঞ্চলীয় খানাবাদ ও কোহিস্তানাতসহ ৩০টি জেলায় তাদের কর্মকাণ্ড বিস্তৃত। বিবিসির অনুসন্ধানের তিন মাসে নাংগারহারের রাজধানী জালালাবাদে কমপক্ষে ৫০ জন আইএসের হামলায় নিহত হয়।

দেশজুড়ে জঙ্গিদের বিশেষত তালেবানের প্রকাশ্য তৎপরতার কথা কৌশলে এড়িয়ে গেছেন সরকারি কর্মকর্তারা। প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির মুখপাত্র শাহ হুসাইন মুর্তাজাভি বলেন, ‘কয়েকটি জেলায় হয়তো চিত্র অন্য রকম। কিন্তু আপনি যদি এ বছরের (২০১৭-১৮) পরিস্থিতি দেখেন, তাহলে দেখবেন তালেবান ও আইএসের তৎপরতা উল্লেখযোগ্য হারে ঠেকানো হয়েছে।’ জঙ্গিরা তাদের যুদ্ধ ও হামলার কৌশলে পরিবর্তন এনেছে, সেটা স্বীকার করার পাশাপাশি তিনি এটাও বলেন, ‘জঙ্গিদের পক্ষে একটা প্রদেশ, একটা বড় নগর বা একটা মহাসড়কের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা এখন আর সম্ভব নয়।’

মুর্তাজাভির দাবি, বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্থানীয়দের বক্তব্যের প্রভাব পড়েছে। তিনি মনে করেন, স্থানীয় যেসব লোকের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে, তারা হয়তো কোনো একদিন ‘এক ঘণ্টার জন্য’ অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতার মুখে পড়েছে এবং সেটাই তুলে ধরেছে। প্রেসিডেন্টের এ মুখপাত্র বলেন, ‘জেলাগুলোতে আমাদের স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতা ও সেবাই বলে দিচ্ছে, জেলাগুলোর বেশির ভাগ অংশে সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, কেবল হাতে গোনা কিছু জায়গা ছাড়া, যেখানে তালেবানের উপস্থিতি আছে।’

এদিকে বিবিসির দাবি, আফগানিস্তানে জঙ্গিদের এ ব্যাপক তৎপরতার খবর প্রকাশিত হতে দিতে চায় না যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী, যদিও তারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল ইন্সপেক্টর জেনারেল ফর আফগানিস্তান রিকনস্ট্রাকশন তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জঙ্গিদের তৎপরতা উদ্বেগজনক।



মন্তব্য