kalerkantho


লুকানো বরফের আগ্নেয়গিরিতে ভরা গ্রহাণু ‘সেরেস’?

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



লুকানো বরফের আগ্নেয়গিরিতে ভরা গ্রহাণু ‘সেরেস’?

মঙ্গল আর বৃহস্পতির মধ্যে থাকা গ্রহাণুপুঞ্জ (অ্যাস্টারয়েড বেল্ট) ‘সেরেস’-এ নাকি আরো অনেক বরফের ‘আগ্নেয়গিরি’ (ক্রায়ো-ভলক্যানো) লুকিয়ে রয়েছে। একেবারে হালের একটি গবেষণাপত্রে এমনটাই দাবি করা হয়েছে।

বরফেরও যে আগ্নেয়গিরি হয়, তা প্রথম টের পাওয়া গিয়েছিল ২০১৫ সালে।

নাসার মহাকাশযান ডনের তোলা ছবিতে দেখা গিয়েছিল গ্রহাণুপুঞ্জের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রহাণু সেরেসে মাথা উঁচিয়ে রয়েছে ‘আহুনা মন্স’ নামে একটি বরফের আগ্নেয়গিরি বা ‘ক্রায়ো-ভলক্যানো’। যার উচ্চতা চার কিলোমিটার। অর্থাৎ মাউন্ট এভারেস্টের যতটা উচ্চতা, তার ঠিক অর্ধেক উচ্চতা সেরেসের ওই বরফের আগ্নেয়গিরির। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের এত দিন ধারণা ছিল, এই ধরনের বরফের আগ্নেয়গিরি বা ক্রায়ো-ভলক্যানো হয়তো আরো অনেক লুকিয়ে রয়েছে এই সৌরমণ্ডলের গ্রহ প্লুটো বা বৃহস্পতি ও শনির চাঁদ—ইউরোপা, ট্রাইটন, শ্যারন ও টাইটানে। কিন্তু সেরেসে এমন বরফের আগ্নেয়গিরি হয়তো আর নেই।

ক্রায়ো-ভলক্যানো বলতে কী বোঝায়?

‘ক্রায়ো-ভলক্যানো’রই অন্য নাম ‘আইস-ভলক্যানো’ বা বরফের আগ্নেয়গিরি, যা একেবারে আগ্নেয়গিরির মতোই। কিন্তু সেখান থেকে ‘আগুনের গোলা’ বা গলতে থাকা পাথর যেভাবে বেরিয়ে আসে, ক্রায়ো-ভলক্যানো থেকে তেমন কোনো আগুনের গোলা বেরিয়ে আসে না। এর বদলে ভেতর থেকে ছিটকে ছিটকে বেরিয়ে আসে জলের কণা, অ্যামোনিয়া বা মিথেন।

এদের যৌথভাবে বলে ‘ক্রায়ো-ম্যাগমা’ বা ‘আইস-ভলক্যানিক মেল্ট’। এগুলো মূলত থাকে তরল অবস্থায়, যা ধোঁয়ারও জন্ম দেয়। গ্যাসীয় অবস্থায়ও থাকতে পারে।

পৃথিবীতেও কি ক্রায়ো-ভলক্যানো দেখা যায়?

একমাত্র দেখা যায় লেক সুপিরিয়রের দক্ষিণ উপকূলে। এটা মূলত দেখা যায় উপকূলের পরকুপাইন পার্বত্য এলাকায়। শীতকালে। ওই সময় লেক সুপিরিয়রের জল জমে বরফ হয়ে যায়। সেখান থেকেই ছিটকে ছিটকে বেরিয়ে আসে জল আর বরফের কণা, ধোঁয়া। হালের গবেষণা বিজ্ঞানীদের সেই ধারণারই মর্মমূলে সজোরে ধাক্কা দিল। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্সে প্রকাশের জন্য গৃহীত একটি গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়েছে, আহুনা মনেসর মতো সেরেসের অন্তরে-অন্দরে আরো অনেক বরফের আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে যথেষ্টই। সেই আগ্নেয়গিরিগুলো হয়তো ছিল লাখ লাখ বা কোটি কোটি বছর আগে। গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বরফের আগ্নেয়গিরিগুলো হয় নিচে চেপে বসে গেছে (ফ্ল্যাটেন্ড) বা সেরেসের পিঠে সেঁধিয়ে গেছে।

এত দিন ধাঁধাটা ছিল কোথায়?

হঠাৎ অমন একটি বরফের উঁচু পাহাড় কিভাবে আর কেনই বা মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে গেল গ্রহাণু সেরেসের বুকে, তা নিয়ে যথেষ্টই সন্দেহ-সংশয় ঘুরপাক খাচ্ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মনে। আর আহুনা মনেসর বরফের পাহাড়ের ঢালটা যে অতটা খাড়া, তারও কোনো যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছিলেন না জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এটা থেকেই মনে করা হচ্ছিল, অতটা খাড়াই যখন আহুনা মনেসর পাহাড়ের ঢাল, তখন নিশ্চয়ই সেই পাহাড়টি তৈরি হয়েছে খুব সম্প্রতি। মানে, সেই পাহাড়টি তৈরি হওয়ার জন্য সেরেসের ভূস্তরের ওলটপালট খুব বেশি দিন আগে হয়নি।

কোন দুই সম্ভাবনার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছিলেন বিজ্ঞানীরা?

এক. সেরেসের বুকে আহুনা মনেসর মতো বরফের আগ্নেয়গিরি আর একটিও নেই। আর সেই বিরল বরফের আগ্নেয়গিরিটি খুব বেশি দিন আগে তৈরি হয়নি সেরেসের বুকে।

দুই. সেরেসের বুকে এমন ক্রায়ো-ভলক্যানো আরো অনেক রয়েছে। তবে সব কয়টিই লুকানো বা সেগুলো সেরেসের ভূস্তরে কোনো অস্বাভাবিক বা অজানা ওলটপালটের জন্য কোনো এক সুদূর অতীতে হারিয়ে গেছে বা নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু একটি ক্রায়ো-ভলক্যানোই এখনো বেঁচেবর্তে রয়েছে। তার নাম আহুনা মন্স।

যেভাবে তৈরি হয় বরফের আগ্নেয়গিরি বা ক্রায়ো-ভলক্যানো

কিভাবে সেই ক্রায়ো-ভলক্যানোগুলো হারিয়ে গেছে সেরেসের বুক থেকে? গবেষকরা একটি উপায়ের কথাও বাতলেছেন তাঁদের গবেষণাপত্রে। পৃথিবীতে আগ্নেয়গিরিগুলো হারিয়ে যায় বায়ুমণ্ডলের বাতাস, বৃষ্টি আর বরফের তোড়ে বা তোপের মুখে। কিন্তু গ্রহাণু সেরেসে কোনো বায়ুমণ্ডল নেই। তাই বাতাস, বৃষ্টি বা বরফের দাপটে তাদের (ক্রায়ো-ভলক্যানো) হারিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই ওই গ্রহাণুতে। সে ক্ষেত্রে অন্য আরেকটি উপায়ে সেগুলোর হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে বলে গবেষকদের অনুমান। সেই পদ্ধতির নাম ‘ভিসকাস রিল্যাক্সেশন’।

ভিসকাস রিল্যাক্সেশন কী জিনিস?

খুব কনকনে ঠাণ্ডায় জমাট বাঁধা মধুকে অনেকটা কঠিন পদার্থের মতো লাগে। কিন্তু অনেকটা সময় কেটে গেলে দেখা যায়, সেই কঠিন মধু ধীরে ধীরে গলে যায়। তারপর একসময় সেই মধুর কঠিন চেহারাটা একেবারেই হারিয়ে যায়। এটাকেই বলে ‘ভিসকাস রিল্যাক্সেশন’। এই ভিসকাস রিল্যাক্সেশনের মাধ্যমেই গ্রহাণু সেরেসের বুক থেকে হারিয়ে গেছে তার লাখো-কোটি বছর আগেকার বরফের আগ্নেয়গিরি বা ক্রায়ো-ভলক্যানোগুলো। সূত্র : আনন্দবাজার।


মন্তব্য