kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ম্যাথিউর আঘাতে লণ্ডভণ্ড হাইতি

শোক আর ভীতির মধ্যেই একের দিকে অন্যের হাত

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



শোক আর ভীতির মধ্যেই একের দিকে অন্যের হাত

হাইতিতে হারিকেন ম্যাথিউর তাণ্ডবে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে এ রকম বহু বাড়িঘর। গতকাল জেরেমি এলাকা থেকে তোলা ছবি। ছবি : এএফপি

হারিকেন ম্যাথিউর প্রভাবে লণ্ডভণ্ড পুরো হাইতি। প্রচণ্ড ঝড়ে দরিদ্র দেশটিতে মারা গেছে ৩০০ জনের বেশি মানুষ।

সব খোয়ানো মানুষগুলোর চোখেমুখে শোক আর ভীতি স্পষ্ট। তবু এরই মধ্যে নতুন করে উঠে দাঁড়াতে হবে তাদের। আন্তর্জাতিক সাহায্যের ঘোষণা আসছে। কিন্তু দেশ পুনর্গঠনে বিদেশি সাহায্যের চেয়ে নিজেদের কর্মঠ হওয়ার ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছে হাইতিবাসী। একে অন্যের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে কাজে লেগে পড়েছে অনেকেই।

ঝড় থামার পর থেকেই প্রায় সব হারানো দোমিনিক ওসনি কঠোর পরিশ্রম করছেন। দক্ষিণ উপকূলের লেস কায়েসে অঞ্চলের সুস-রসে এলাকার বাসিন্দা দোমিনিক বলেন, ‘ঘুমানো দূরে থাক, দুই দিন ধরে আমি দাঁড়িয়েই আছি। আমাদের পরস্পরের সাহায্য দরকার। ’ দোমিনিকের কাজকর্ম দেখেই তাঁর কথার মর্ম বোঝা গেল। ঝড়ে উড়ে যাওয়া ঘরগুলোর টিনগুলো সবাই মিলে জড়ো করে আবার চালা তৈরি করছেন তিনি। দোমিনিক বলেন, ‘এখানে প্রত্যেকের ক্ষতি হয়েছে। ঘরবাড়ি ভেসে গেছে। আমরা সবাই মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়েছি। আমি সব কিছু হারিয়েছি, এমনকি আমার জন্ম সনদটা পর্যন্ত। ’ তিনি জানান, হাইতিবাসীর জন্য জন্ম সনদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এটা হারিয়ে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে আরেকটা সনদ পাওয়া খুব কঠিন।

গত মঙ্গলবার হাইতির ওপর ১০ ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চালায় ঘণ্টায় ২৩০ কিলোমিটার বেগে বয়ে যাওয়া চার মাত্রার হারিকেন ম্যাথিউ। সঙ্গে ছিল ভারিবর্ষণ। এতে তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংসযজ্ঞের পরিমাণ অনুমান করা না গেলেও এখন ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের সদস্য সিনেটর হার্ভে ফোরকান্দ গত বৃহস্পতিবার জানান, দেশজুড়ে ৩০০ জনের বেশি নিহতের তথ্য তাঁরা পেয়েছেন। নিহতদের বেশির ভাগই দক্ষিণ উপকূলীয় শহর ও জেলেপাড়ার বাসিন্দা। এর মধ্যে দক্ষিণের রসে-আ-বাতো শহরে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৫০। দক্ষিণাঞ্চলে ৩০ হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। জেরেমি শহরের ৮০ শতাংশ ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতু ধসে পড়ায় হাইতির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফোন যোগাযোগ ও বিদ্যুত্ব্যবস্থাও অচল হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা। খাবার ও পানির সংকট দেখা দিতে শুরু করেছে।

সমস্যার সাগরে পড়ে হাল ছাড়তে রাজি নন জুনিয়র জেত্রো শেরুবিন। ঝড়ে তাঁর সবই গেছে। তিনি জানান, ‘ভুট্টা আর মরিচের ক্ষেত করেছিলাম আমি। ১০০টি আমগাছ আর একটি নার্সারিও ছিল। ’ কিন্তু এখন সেসবের কিচ্ছু নেই। সেসব ভেবে বুক চাপড়ানোর বদলে তিনি বললেন, ‘এ দেশকে আবার সবুজ শ্যামল করে তোলার জন্য এখন আমাদের সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। লোকজনকে মজবুত ঘরবাড়ি তৈরির প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তা না হলে প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবারের মতোই আমাদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ’

হাইতির ৫০ হাজার মানুষের খাবার, পানি, আশ্রয়, চিকিৎসা ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে রেডক্রস ৬৯ লাখ ডলারের জরুরি তহবিল গঠনে সামর্থ্যবানদের সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। ধর্মীয় সংগঠন ‘অ্যারাইজ হাইতি’ ইতিমধ্যে লেস কায়েসে খাবার বিতরণ শুরু করেছে। হাইতির সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় ত্রাণ সরবরাহে সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর ৯টি হেলিকপ্টার পাঠানো হচ্ছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়কারী দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী হাইতিজুড়ে দুর্যোগকবলিত প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের সহায়তা প্রয়োজন।

বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে চাইছে না, এমন মানুষও হাইতিতে আছে। দেশটির সাধারণ মানুষের একজন গেদিওন দরফিলে বলেন, ‘আমি কখনো বিদেশি সহায়তায় বিশ্বাস করিনি। যে আশ্বাসে কাজ হয় না, দয়া করে শত শত কোটি অর্থের সে রকম আশ্বাস নিয়ে আমাদের কাছে আর আসবেন না। আর হ্যাঁ, কোনোভাবেই এখানে আর সেনাবাহিনী পাঠাবেন না। ’ সেনাবাহিনীর প্রতি এমন ক্ষুব্ধতার কারণ কী? ২০১০ সালের ভূমিকম্পে আড়াই লাখ মানুষের মৃত্যু আর হাইতিবাসীর সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর আগমন স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘ওইবার সহায়তা সংস্থাগুলো আর্থিক সহায়তার ৮০ শতাংশই পকেটে ভরে নিয়ে গেছে। ’ আর তাই এখন স্বাবলম্বিতায় বিশ্বাস করেন দরফিলে। কাজেও সেটার প্রমাণ দিয়ে চলেছেন। সূর্যটা অস্তাচলে গেছে। এর পরও হাতুড়ি পিটিয়ে প্রতিবেশীদের ঘরের চাল ঠিকঠাক করে চলেছেন আত্মনির্ভরশীলতায় বিশ্বাসী দরফিলে।

সূত্র : এএফপি।


মন্তব্য