kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমরা ঝুঁকছে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমরা ঝুঁকছে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি

যুক্তরাষ্ট্রের মুসলমানদের খুব স্বাভাবিকভাবেই রিপাবলিকানদের ভোটদাতা বলে মনে করা হতো, কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে এই প্রবণতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হয়তো বিপুলসংখ্যক আমেরিকান মুসলিম ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে ভোট দিতে পারেন।

আনুমানিক পঁয়ত্রিশ লাখ মুসলমান যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করে, এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ হচ্ছে আফ্রিকান-আমেরিকান। তবে বেশির ভাগ আমেরিকান মুসলিমই হচ্ছে এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা অভিবাসী। এরা এসেছে অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল পটভূমি থেকে।

এসব অভিবাসী যেহেতু সেসব দেশ থেকে এসেছে যেখানে তেমন গণতান্ত্রিক নির্বাচন হয় না এবং নাগরিক কর্মকাণ্ডের মানও তেমন উঁচু নয়, তাই তারা যুক্তরাষ্ট্রে বিপুলসংখ্যায় ভোট দেয়নি এর আগে। তবে ২০০০ সালের নির্বাচনে এই প্রবণতায় পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। তখন বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হয়ে মুসলিম আমেরিকানরা রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জর্জ ডব্লিউ বুশকে সমর্থন করেছিল।

এ সম্পর্কে বিশিষ্ট মুসলিম-আমেরিকান সোহেল খান ‘ফরেন পলিসি’ পত্রিকায় লিখেছেন, মুসলিম আমেরিকানরা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে মোটের ওপর রক্ষণশীল এবং সে কারণেই তারা স্বভাবতই রিপাবলিকানদের ভোট ব্যাংক। অনেক মুসলিম-আমেরিকান দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন, গতানুগতিক নিয়মে বিয়ে এবং গর্ভপাতের বিরোধিতার কারণে রিপাবলিকানদের রক্ষণশীল মূল্যবোধকে সমর্থন করে। সোহেল আরো বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মুসলমান ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই তারা রিপাবলিকানদের কর হ্রাসের নীতিকেও সমর্থন করে থাকে। তবে এ অবস্থার যে পরিবর্তন এসেছে সে প্রসঙ্গে স্যাক্রাম্যান্টোতে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আবু নাসের কথা বলেন ভয়েস অব আমেরিকার সঙ্গে। তিনি বলেন, এ কথা সত্যি যে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর বুশ মুসলমানদের এই নিশ্চয়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত নয়। কিন্তু বর্তমানে রিপাবলিকান দলের নীতিমালা এবং বাগাড়ম্বরতা অনেক মুসলমানের মনে এই ধারণার জন্ম দিয়েছে যে দলটি ইসলামোফোবিয়ার বা ইসলামভীতি রোগের সূতিকাগারে পরিণত হয়েছে।

আবু নাসেরের বক্তব্যেরই অনুরূপ কথা বলেছেন ওয়াশিংটনভিত্তিক দ্য কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশন্সের রবার্ট ম্যাকাউ। তিনি বলছেন, দুর্ভাগ্যবশত ১৫ বছরে রিপাবলিকান দল ইসলামোফোবিয়ার রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তারা অন্তত ১০টি অঙ্গরাজ্যে মুসলিমবিরোধী নীতিমালা কিংবা বিদেশিবিরোধী প্রস্তাব আনছে। এ কারণেই মুসলমানরা রিপাবলিকান পার্টি থেকে সরে আসছে।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ ও ২০১২ সালের নির্বাচনে মুসলমানরা একজন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বারাক ওবামাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেন। অন্যরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে আসা অভিবাসীরা ঠিক কোন দলের প্রতি তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য প্রকাশ করবে সে বিষয়ে তাদের আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু কারণ থাকতে পারে।

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক এবং ‘দ্য ফিউচার অব ইসলাম’ নামে বইয়ের লেখক জন এস্পোসিটো বলেছেন, ঐতিহাসিকভাবে দেখা যাওয়া একটা প্রবণতা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে আসা জাতি গোষ্ঠিগুলো প্রায়ই ডেমোক্র্যাট দলের দিকে ভোট দিতে চায়, ইউনিয়নভিত্তিক চিন্তাভাবনা তাদের থাকে, যেমন—একই ব্যাপার ইতালিয়ান-আমেরিকানদের মধ্যেও দেখা যায়।

আমেরিকায় এখন দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের মুসলিমরা বড় হচ্ছে এবং জরিপে দেখা যাচ্ছে, মুসলমানদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই এখন প্রগতিশীল চিন্তাধারা গ্রহণ করছে, যা রিপাবলিকান গোঁড়া মনোভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য পূর্ণ নয়।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০১১ সালের এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, মুসলিম আমেরিকানরা ধীরে ধীরে সমকামিতাকেও গ্রহণ করছে এবং ৬৮ শতাংশ মনে করে যে আরো বেশি পরিষেবা প্রদানের জন্য সরকারের আয়তন আরো বড় হতে হবে।

ম্যাকাউ আরো একটি জরিপের কথা উল্লেখ করে বলছেন, এখন ৫৫ শতাংশ মুসলিম আমেরিকান মধ্যপন্থী এবং ২৬ শতাংশ উদারপন্থী বলে নিজেদের তুলে ধরছে। সাধারণত দেখা যায় যে মধ্যপ্রাচ্য বা দক্ষিণ এশিয়া থেকে আসা অনেক অভিবাসীই সামাজিকভাবে রক্ষণশীল এবং রিপাবলিকান দলে তাদের একসময়ে স্থান ছিল; কিন্তু আমেরিকায় যারা বড় হয়েছে বা হচ্ছে তারা তাদের মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টিয়েছে, তারা হয়তো তাদের মা-বাবা যে আদর্শে আগে ভোট দিয়েছেন, তার থেকে ভিন্নভাবে তারা দিতে চায়।

কেয়ার এবং যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম সংগঠনগুলোর কাউন্সিলের অন্য সদস্যরা সম্প্রতি ওয়ান আমেরিকা নামে একটি প্রচার অভিযান শুরু করেছে। তারা আশা করছে, ১০ লাখ নতুন ভোটদাতার নিবন্ধন তারা সম্পন্ন করবে, ২০১২ সালের নির্বাচনের সময়কার চেয়ে এটি হবে তিন লাখ বেশি।

রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কিছু বিষয়ে তাঁর অভিমতে পরিবর্তন আনছেন। আফ্রিকান আমেরিকান এবং মেক্সিকানদের ব্যাপারেও তিনি খানিকটা নমনীয় হয়েছেন। মুসলমানদের ভোট পাওয়ার কৌশল হিসেবে মুসলমানদের প্রতিও তাঁর আগেকার বক্তব্য থেকে সরে আসার সম্ভাবনা আছে বলে আবু নাসের মনে করেন। তবে তিনি বলেন, এর ফলে এবারে মুসলিম ভোটাররা রিপাবলিকান পার্টির দিকে ঝুঁকবে বলে মনে হয় না।

মুসলিম আমেরিকান ভোট হয়তো তুলনামূলকভাবে এখনো কম, তবে ফ্লোরিডা, ওহাইয়ো, ভার্জিনিয়া, মিশিগান ও পেনসিলভানিয়ায় বিরাট মুসলিম সম্প্রদায় রয়েছে এবং ভোটে তাদের অংশগ্রহণ যদি বিপুলসংখ্যায় হয় তা হলে তাদের ভোটপ্রার্থীদের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সূত্র : ভিওএ।


মন্তব্য