kalerkantho

মেইড ইন বাংলাদেশ

অতীতে বাস ও ট্রাকের সম্পূর্ণটা বিদেশ থেকে আমদানি করা হলেও সম্প্রতি দেশে তৈরি হচ্ছে এগুলোর বডি। ঢাকার তেজগাঁও, মহাখালী, সায়েদাবাদ, আমিনবাজারসহ দেশের অনেক জায়গায় গড়ে উঠেছে বডি তৈরির কারখানা। বিলাসবহুল বাসের বডিও তৈরি করছে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আতিফ আতাউর

২২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মেইড ইন বাংলাদেশ

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

ট্রাকের বডি কোথায় বানায়? তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তায় গিয়ে স্থানীয় কাউকে বললেই দেখিয়ে দেবে জায়গাটা। একটু ভেতরে ঢুকলেই লোহালক্কড় আর হাতুড়ির টুংটাং শব্দই জানিয়ে দেবে ওয়ার্কশপগুলোর অস্তিত্ব। রাস্তার দুই পাশজুড়ে ছোট-বড় অনেক ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। কোনোটায় ঘষামাজা চলছে তো কোনোটার রং করা নিয়ে ব্যস্ত এখানকার বডিমিস্ত্রিরা। কোথাও বা দাঁড়িয়ে আছে বডি ছাড়া ট্রাকের কঙ্কাল! এলাকাটিতে বেশ কিছু ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান আছে যারা ট্রাকের বডি বানায়। এরই একটি শফি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস। ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা ব্যস্ত বডি বানানোর কাজে। অফিস ঘরে বসে আছেন প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এরই মধ্যে দুজন ক্রেতা এসে বসে আছেন মালিকের অপেক্ষায়। তাঁরা ট্রাকের বডি বানাতে চান। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ শফি জানালেন, ছোট, বড় ও মাঝারি সব ধরনের ট্রাকের বডি এখানে তৈরি করা হয়। ট্রাকের বডির মডেল ভেদে খরচটাও একেক রকম। ছোট একটি ট্রাকের বডি তৈরিতে খরচ পড়বে দুই লাখ বিশ হাজার টাকা। মাঝারি বডি বানানোর খরচ দুই লাখ সত্তর হাজার টাকা। আর কনটেইনারসহ কাভার বডির খরচ তিন লাখ ৪০ হাজার টাকা। একেকটি বডি বানাতে তিন থেকে চারজন মিস্ত্রির পাঁচ থেকে ছয় দিন লাগে।

কাভার বডিসহ ট্রাকের যাবতীয় কাঁচামাল, প্লেইন শিট আনা হয় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে। এখানে জাহাজের পাত নির্দিষ্ট আকারের সাইজ করে মেশিনে কেটে রাখা হয়। নির্দিষ্ট মডেলের কাভার বডিও চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে আসা হয়। কাভার বডির সুবিধা হচ্ছে, সরাসরি মূল ইঞ্জিনের চেসিসের ওপর বসিয়ে দিলেই হয়। বাড়তি ঝামেলা নেই। সঙ্গে সামনে একটি ক্যাপ বসিয়ে দেয় মিস্ত্রিরা। তাতে ট্রাকের সৌন্দর্য বাড়ে। শফি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসের বাইরেই রাস্তার ওপর ট্রাকের বডি তৈরি করছিলেন দুজন মিস্ত্রি। তাঁদের একজন হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘ইঞ্জিনসহ মূল চেসিস নিয়ে আসার পর প্রথমে ডিজাইন করা হয়। বডি খোলা থাকবে নাকি ঢাকনাসহ—জেনে শুরু হয় মূল কাজ। প্রথমে মূল চেসিসের ওপর আলাদা একটি চেসিস বসানো হয়। এরপর ডিজাইন অনুসারে বডি বানিয়ে চেসিসের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়। সর্বশেষ কাজ রং করা। মালিকের পছন্দমতো বডিতে নকশা এঁকে সে অনুযায়ী রং করা হয়।’

বডিমিস্ত্রি মনির হোসেন বলেন, ‘ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে স্থায়িত্ব। গাড়ি ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী ভালো একটি বডি ১০ বছরেরও বেশি সময় টেকে।’

মনির হোসেন জানান, ট্রাকের বডি তৈরিতে ইস্পাতের পাতই বেশি ব্যবহার হয়। খরচ কমাতে কেউ কেউ কাঠও ব্যবহার করে। এসব কাঠও আসে চট্টগ্রাম থেকে।

বডি বানানোর সবচেয়ে জটিল কাজ কোনটা? মনির এবং হেলাল দুজনেরই উত্তর—ইস্পাত বাঁকিয়ে ডিজাইনমতো আকৃতি দেওয়া। আবার নির্দিষ্ট মাপমতো একটির সঙ্গে অন্যটি না মিললে ঝামেলা হয়।

 

তৈরি হচ্ছে বাসের বডিও

ট্রাকের পাশাপাশি দেশে তৈরি হচ্ছে ছোট, বড় ও মাঝারি আকৃতির বাসের বডিও। বিলাসবহুল এসি বাসের বডিও তৈরি করছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে আছে নাভানা গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আফতাব অটোমোবাইলস ও ইফাদ অটোস। আগে বিলাসবহুল এসব বাসের একেকটির আমদানীকৃত বাজারমূল্য ছিল প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা। এখন দেশে বডি তৈরি হওয়ায় দাম কমে সোয়া এক কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বাসপ্রতি সাশ্রয় হচ্ছে প্রায় অর্ধকোটি টাকা। এ জন্য কাঁচামাল আলাদাভাবে আমদানি করা হয়। এরপর নিজস্ব কারখানায় তৈরি করা হয় বডি। সর্বশেষ ধাপ বাসের মূল চেসিসের সঙ্গে বডি সংযুক্ত করা। আগে সম্পূর্ণ বাসটাই আমদানি করতে হতো।

সাধারণ বাসের বডিও তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশে। ঢাকায় কয়েক বছর ধরে বাসের বডি বানান সোহেল আহমেদ। ছোট একটি ওয়ার্কশপও আছে তাঁর। তিনি বলেন, ‘বাসের মডেল ও আসনসংখ্যার ওপর নির্ভর করে খরচ। বেশির ভাগ খরচ হয় আসনের পেছনে। যত ভালো আসন তত বেশি খরচ। এরপর রয়েছে কাপড়, প্লেইন শিট, ইস্পাতের পাত, ফ্যান, লাইট, সুইচ ও অন্যান্য সামগ্রী। ৪০ সিটের একটি বাসের বডি বানাতে মানভেদে ছয় লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ হয়।’

বডি তৈরির প্রক্রিয়াটা কী—জানতে চাইলে সোহেল আহমেদ আরো বলেন, ‘আমরা ছোট কারখানাগুলোতে দেশীয় প্রযুক্তিতে বডি তৈরি করি। প্রথমে মডেল বানাতে হয়। পরে বানানো হয় ফ্রেম। এতে বাকি কাজগুলো সহজ হয়ে যায়। এরপর দেয়াল, জানালা, ছাদ ও সামনের অংশের কাজ করা হয়। সর্বশেষ ধাপ অঙ্গসজ্জা।’

ভালো একটি বডি বানাতে তিন থেকে চারজন মিস্ত্রির এক মাস লাগে বলে জানান সোহেল আহমেদ।



মন্তব্য