kalerkantho


আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদনের পথে

পার্থ সারথি দাস   

২২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদনের পথে

রাজধানীর একটি বাসে গন্তব্যের পথে যাত্রীরা। ছবি : সংগৃহীত

সম্প্রতি উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। এ অবস্থানে আসার পেছনে ভূমিকা আছে যোগাযোগব্যবস্থারও। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে উন্নতি করছে বাণিজ্যিক পরিবহনব্যবস্থাও। গুরুত্বপূর্ণ এই খাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে চার পৃষ্ঠার বিশেষ আয়োজন

 

পরিবহন অর্থনীতির বিষয়টি সামনে এসেছে ১৯৫৯ সাল থেকে। মার্কিন অর্থনীতিবিদ জন আর মেয়ার অর্থনীতির শাখা হিসেবে পরিবহন অর্থনীতির বিষয়টিকে সামনে তুলে আনেন। যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহন চলাচলের বিষয়টি পুরোপুরি অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে। বিংশ শতকে সড়কের ওপর গুরুত্ব বাড়তে থাকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্যক্তিমালিকানায় গাড়ি বাড়তে থাকে লাফিয়ে লাফিয়ে। পরিবহন খাত অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে সরাসরি পাঁচটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। এর মধ্যে নেটওয়ার্ক বিস্তৃতি ঘটায়, দক্ষতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও উৎপাদন বাড়ায় এবং বৃহত্তর বাজার খুলে দেয়। বছর কয়েক আগের একটি হিসাবে দেখা গেছে, জিডিপিতে পরিবহন খাতের অবদান সড়ক (যান্ত্রিক) ৫.২৮, সড়ক (অযান্ত্রিক) ২.১৭, রেলওয়ে ০.০৮, জলপথ ০.৬৪ এবং আকাশপথ ০.১০ শতাংশ।

দেশের জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে। বর্ধিত জনসংখ্যার অনুপাতে বাড়ছে যাত্রী। বাড়ছে পণ্য পরিবহন। দেশে নৌপথ ও রেলপথ কম থাকায় সড়কপথে নির্ভরতা বাড়ছে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে। বাস ও ট্রাক তাই পরিবহন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলেছে। দেশের সড়ক ও মহাসড়কে কমপক্ষে পাঁচ লাখ বাস-ট্রাক চলাচল করছে।

রাজধানী ঢাকা গাড়িতে ঠাসা, স্থবির হয়ে পড়ছে যানজটে। দিনে যানজটে নষ্ট হচ্ছে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা। অথচ বিশ শতকের গোড়ার দিকে পুরান ঢাকায় কিছু ঘোড়া অসুস্থ হয়ে পড়লে নগরবিদরা ঘোড়াগুলো সুস্থ না হয়ে উঠলে শহরের পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে বলে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। সেই ঢাকায় আজ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ১১ লাখ গাড়ি। সাত বছরে এখানে গাড়ি বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।

বিআরটিসির একতলা-দোতলা বাস, বেসরকারি বিভিন্ন পরিবহন প্রতিষ্ঠানের নতুন নতুন বাস নামছে যাত্রী পরিবহনের জন্য। ছুটে চলছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস।

১৯১৭ সালে ঢাকার রাস্তায় এত কম গাড়ি ছিল যে মনে হতো রাস্তা বেশি নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকার ধোলাইখাল ছিল নদীর মতো বহমান। ছুটত লঞ্চ ও নৌকা। এখন নদীপথে চলাচলের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সড়কপথ।

একসময় ঢাকা-টঙ্গী, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়ক ছিল। এখন ঢাকার চারদিকে দুই লেন, চার লেনের মহাসড়ক, নির্মাণ হচ্ছে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা ছয় লেনের একপ্রেসওয়ে। 

পরিবহনব্যবস্থা দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাংলাদেশ স্বাধীনের পর থেকে দেশের মধ্যকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। ভূমি, জল ও আকাশপথে যোগাযোগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অতীতে পরিবহনের প্রধান মাধ্যম ছিল নদীপথ ও সড়কপথ। দেশের রেল পরিবহনব্যবস্থা মূলত এসেছে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ পরিচালিত ‘আসাম-বাংলা’ রেল পরিবহন থেকে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে রেল পরিবহন ক্রমে বাড়তে থাকে।

রেলপথের চেয়ে সড়কপথ বেশি। রেলপথ প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার। সেখানে শুধু সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীন সড়কই আছে প্রায় ২১ হাজার কিলোমিটার। দেশের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে খাদ্য, পোশাক, নির্মাণসহ বিভিন্ন সামগ্রী পরিবহনে তাই সড়কপথের ওপরই নির্ভরতা বেশি। রেলপথে পণ্য পরিবহনে বেশি সময় লাগে। ফলে সড়কপথ ব্যবহার করে ট্রাকে পণ্য পরিবহনের নির্ভরতার মাত্রা বাড়ছেই। সড়কপথে পণ্য পরিবহনে ব্যয় রেলপথের চেয়ে বেশি, তবে সময় লাগে কম। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পণ্য পরিবহন হচ্ছে বেশি। বাংলাদেশ রেলওয়ে যাত্রী পরিবহনে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। নাব্যতা কমে যাওয়ায় নৌপথে পণ্য পরিবহনও কমছে। দেশে এক লাখ কিলোমিটারের বেশি সড়কপথ রয়েছে, যার মধ্যে ২১ হাজার কিলোমিটারের বেশি মহাসড়ক। রেলপথ রয়েছে দুই হাজার ৮৩৪ ও নদীপথ ২৪ হাজার কিলোমিটার। এ তিন পথের মধ্যে সড়কপথেই ৮০ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএর তথ্যানুসারে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে ট্রাক ছিল ৬২ হাজার। ২০১১-১২ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৮৭ হাজার।

পণ্য পরিবহনের জন্য শুধু ট্রাকই ব্যবহার হচ্ছে না—আছে কার্গো ভ্যান, কাভার্ড ভ্যান, ডেলিভারি ভ্যান, পিকআপ, ট্রাক্টর। গত বছর বিআরটিএতে নিবন্ধিত হয়েছে এক হাজার ৪০৯টি কার্গো ভ্যান, পাঁচ হাজার ১৬৫টি কাভার্ড ভ্যান, দুই হাজার তিনটি ডেলিভারি ভ্যান, ১৩ হাজার ৪৯৭টি পিকআপ, দুই হাজার ৭৭৭টি ট্রাক্টর ও ১১ হাজার ৩২৬টি ট্রাক। দেখা যাচ্ছে পণ্য পরিবহনে ট্রাক ও পিকআপের ওপর নির্ভরতা বেশি। 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের গবেষণা বলছে, এক টন পণ্য কিলোমিটারে পরিবহনে ট্রেনে ব্যয় হয় ১ টাকা ৪৯ পয়সা, নৌযানে ১ টাকা ৯৯ ও ট্রাকে ৩ টাকা ৪ পয়সা। আবার ২৫০ কিলোমিটার পথ পণ্য পরিবহনে ট্রাকে সময় লাগে ৮-১০ ঘণ্টা, নৌযানে ২০ ও ট্রেনে ২৬-৩০ ঘণ্টা (ওয়েটিং টাইমসহ)। রেলওয়ে ও বিবিএসের হিসাব মতে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ট্রেনে পণ্য পরিবহন হয় ৩২ লাখ ৮২ হাজার টন, ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২০ লাখ সাত হাজার টনে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে পরিবহন হয় ৩০ লাখ ১০ হাজার টন, ২০০৯-১০-এ ২৭ লাখ ১৪ হাজার, ২০১০-১১-তে ২৫ লাখ ৫৪ হাজার ও ২০১১-১২ অর্থবছরে ২১ লাখ ৯২ হাজার টন।

বাণিজ্যিক বাস ও ট্রাকের চাহিদা বাড়ছে

দেশের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পণ্য পরিবহন ও এক প্রান্তের সঙ্গে অন্য প্রান্তের যোগাযোগ স্থাপনে বাণিজ্যিক বাস ও ট্রাকের চাহিদা বাড়ছে। দেশের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে উন্নয়ন প্রকল্প এগিয়ে নিতে মালপত্র পরিবহনে হালকা ও ভারী গাড়ির চাহিদা তৈরি হয়েছে। রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি মোটরসাইকেল, টায়ার, গ্লাস ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্য উৎপাদনের পথে বাংলাদেশ। উন্নয়নের পথে অনেক দূর এগোলেও বাণিজ্যিক বাস ও ট্রাকের ক্ষেত্রে এখনো আমদানিনির্ভরতা রয়েছে। পার্শ্ববর্তী কিংবা উন্নত দেশ থেকে বাণিজ্যিক গাড়ির পার্টস আমদানি করতে হচ্ছে। আমদানি কমিয়ে দেশেই বাণিজ্যিকভাবে বাস ও ট্রাক উৎপাদনে সরকারের সহযোগিতা ও নীতিমালার জোর তাগিদ এই খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের।

এগিয়ে বেসরকারি উদ্যোগ

বাংলাদেশে পিকআপ ও ট্রাকের বাজার আনুমানিক সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার। বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও আধুনিক প্রযুক্তির বাস-ট্রাক আমদানি করছে। তবে আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশেই কারখানা স্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে একাধিক প্রতিষ্ঠানের। এনার্জিপ্যাকের মোটর ভেহিকল বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার জসীম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অক্টোবর থেকে প্রতিবছর দুই হাজার করে পিকআপ ভ্যান সংযোজন করার টার্গেট নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। দেশে অনেক বেশি উন্নয়নকাজ চলছে। যে কারণে দিন দিন গাড়িগুলোর চাহিদাও ক্রমে বেড়ে যাচ্ছে। এ জন্যই আমরা নিজেদের কারখানায় গাড়ি সংযোজনে বেশি মনোযোগ দিচ্ছি।’

রানার্স মোটরস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিকুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা ট্রাক ও পিকআপ আমদানি করছি। তবে আগামী বছর থেকে গাড়ির সংযোজন শুরু করব। নিজেদের কারখানায় সংযোজন করলে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে আরো কম দামে গাড়ি বিক্রি সম্ভব হবে।’

সরকারি উদ্যোগ পিছিয়ে

২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন—বিআরটিসিকে বিভিন্ন ধরনের ৯৫৮টি বাস সংগ্রহ করে দেয় সরকার। নিম্নমানের এসব বাস-ট্রাক সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দ্রুতই নষ্ট হয়ে যায়। এখন সংস্থায় এক হাজার ৪০০ বাস রয়েছে। তার অর্ধেকের বেশি বিকল হয়ে পড়ে আছে বিভিন্ন ডিপোয়।

এ অবস্থায় বিআরটিসি ৬০০ নতুন বাস কিনবে। কেনা হবে ৫০০ ট্রাকও। দরপত্র চূড়ান্ত করা হয়েছে ২০১৬ সালে। ২০১৬ সালের আগস্টে ভারতের ঋণে ৬০০ বাস ও ৫০০ ট্রাক কেনার দুটি প্রকল্প অনুমোদন হয়। ব্যয় ধরা হয় যথাক্রমে ৫৮০ কোটি ৮৭ লাখ ও ২১৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। সীমিত দরপত্রের মাধ্যমে বাস ও ট্রাকগুলো কেনা হবে। ভারতের কম্পানিগুলোই তাতে অংশ নিতে পারবে। বাস কেনায় ভারত সরকার ঋণ দেবে ৪৩৪ কোটি ৩২ লাখ ও ট্রাকে ১৫৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। বাকি অর্থ সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করা হবে।


মন্তব্য