kalerkantho


শান্তি আনবে তালেবান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা চুক্তি?

তামান্না মিনহাজ   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



শান্তি আনবে তালেবান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা চুক্তি?

১৭ বছরের লড়াইয়ের পর আফগানিস্তানে শান্তির রেখা দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবান যোদ্ধারা অস্ত্র ত্যাগে সম্মত হয়েছে। এ মাসেই চুক্তি সই হবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এই চুক্তিকে একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আফগান যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে পারবে না এই চুক্তি।

 

চুক্তির প্রক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান আলোচক জালমে খলিলজাদ জানিয়েছেন, তিনি কাতারে ছয় দিনের আলোচনার পর তালেবানের সঙ্গে একটি চুক্তির রূপরেখা চূড়ান্ত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যখন আফগানিস্তানে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন, খলিলজাদ তখন তাঁর সহযোগী ছিলেন। কাতারে এই আলোচনা হওয়ার কথা ছিল দুই দিন। তবে তা শেষ পর্যন্ত ছয় দিনে গড়ায়। আলোচনায় আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের বিনিময়ে বিদেশি জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তালেবান। দুই পক্ষের মধ্যে আপাতত সমঝোতা হলেও তালেবান আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিনিময়ে ঠিক কতটা ছাড় দেবে তা নিশ্চিত নয়। তবে কয়েক বছর ধরেই তারা বলে আসছে, অন্য দেশে হামলা চালানোর জন্য তারা আফগান মাটিকে ব্যবহূত হতে দেবে না।

তালেবানের প্রধান দাবি—আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি মেনে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বহু বছর ধরেই তারা বলে আসছে, আলোচনা শুরুর প্রথম শর্ত মার্কিন দখলদারির অবসান। তবে কবে নাগাদ তা শুরু হবে অথবা কত সেনাকে আফগানিস্তানে রেখে দেওয়া হবে তা স্পষ্ট নয়। কাতারে আরো দুটি বিষয় নিয়ে আসা হয়েছে—অস্ত্রবিরতি এবং তালেবান ও আশরাফ ঘানির সরকারের সঙ্গে তালেবানের আলোচনা। এখন পর্যন্ত অস্ত্রবিরতিতে সম্মত হয়নি তালেবান। তালেবান কমান্ডারদের মধ্যে ভীতি আছে, যোদ্ধাদের অস্ত্র ছাড়তে রাজি করানোর পর আবার লড়াই শুরু করতে গেলে সমস্যায় পড়তে হবে তাদের। তারা আফগান সরকারের সঙ্গেও আলোচনায় বসতে রাজি নয়। তাদের দৃষ্টিতে আফগান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

সাফল্যের সম্ভাবনা

২০১৭ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান ও পাকিস্তানবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ প্রতিনিধি এবং ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এশিয়াবিষয়ক পরিচালক লরা মিলার বলেন, ‘বিষয়টি এমনও হতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের যুদ্ধ থেকে মুক্তি পেতে চাইছে। এই চুক্তিকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে আফগানিস্তান থেকে বের হয়ে আসতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।’

সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁর মেয়াদের শেষ দিকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ  ছিলেন। তবে তালেবানের শক্তিশালী হয়ে ওঠা এবং ইসলামিক স্টেটের উত্থানের প্রেক্ষাপটে দেশটিতে সেনাদের রেখে দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল হ্যানলন বলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, তালেবান ও সরকার কী করে ক্ষমতার ভাগাভাগি করবে—এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় কোনো অগ্রগতি নজরে পড়েনি।’ বিদেশি যোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়া হবে না বলে তালেবান যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি।

 

সংঘাতের সূচনা

যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলা চালানোর সময় আফগানিস্তানেই ছিলেন আল-কায়েদার মাস্টারমাইন্ড নামে পরিচিত ওসামা বিন লাদেন। তাঁকে সুরক্ষা দেওয়া তালেবানের সঙ্গে লড়াই এবং তাঁকে খুঁজে বের করার লক্ষ্যে ২০০১ সালে আফগানিস্তানে সেনা পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র। ওই মিশনেরই অংশ হিসেবে জঙ্গিদের খুঁজে বের করার প্রক্রিয়া এখনো চলছে। ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাসংখ্যা বৃদ্ধি করেন। বর্তমানে দেশটিতে ১৪ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে।

 

আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে

আফগানিস্তান গত চার দশক ধরেই যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। অনেকেরই উদ্বেগ, দেশটির ভঙ্গুর গণতন্ত্রে তালেবানের অংশগ্রহণ কেমন হবে? তারা নব্বইয়ের দশকে যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে সম্মত কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তারা কি ক্ষমতা দখল করতে চায়? তারা কি আবারও মানবাধিকারকে পদদলিত করবে, বিশেষ করে মেয়েদের? এ কারণেই তড়িঘড়ি করে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নেওয়া হলে ফল হিতে বিপরীত হবে বলে ধারণা অনেক বিশ্লেষকের।

 



মন্তব্য