kalerkantho


পানামার পর প্যারাডাইস

তামান্না মিনহাজ   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



পানামা পেপারসের পর এবার বিশ্বের বহু ক্ষমতাধর ব্যক্তির নামে-বেনামে কম্পানি খুলে টাকা জমানোর তথ্য প্রকাশ করে হৈচৈ ফেলে দিয়েছে ‘প্যারাডাইস পেপারস’। জার্মানির দৈনিক পত্রিকা ‘জুডডয়েচে জাইটুং’ (পানামা পেপারসও এরাই প্রথম প্রকাশ করে) এ কেলেঙ্কারির কথা প্রথম ফাঁস করে।

এতে বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা ও নামি-দামি ব্যক্তিদের কর ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন দেশে কম্পানি গঠনের খবর উঠে এসেছে। ‘প্যারাডাইস পেপারস’ নামটি এসেছে মূলত ফরাসি শব্দ ‘প্যারাডিজ ফিসকেল’ থেকে, যার অর্থ করস্বর্গ। মূলত অফশোর আইনি সহায়তাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের অর্থ বিদেশে বিনিয়োগ করে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে কর ফাঁকির সুযোগ করে দেয়।

 

যেভাবে ফাঁস

ফাঁস হয়েছে প্রায় এক হাজার ৪০০ জিবি তথ্য। এতে প্রায় এক কোটি ৩৪ লাখ নথি রয়েছে। এর মধ্যে ৬৮ লাখ নথি এসেছে বারমুডাভিত্তিক অফশোর আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠান অ্যাপলবি এবং করপোরেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এস্টেরা থেকে। ২০১৬ সালে এস্টেরা পৃথক হওয়ার আগ পর্যন্ত এ দুটি প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করত। আরো ৬০ লাখ নথি এসেছে করপোরেট জগতের ১৯টি আইনগত সহায়তাদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে, যাদের বেশির ভাগই ক্যারিবীয় অঞ্চলের। আরো কিছু তথ্য এসেছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ট্রাস্ট ও করপোরেশন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এশিয়াসিটি ট্রাস্ট থেকে।

ফাঁস হওয়া নথিগুলোতে ১৯৫০ থেকে ২০১৬ সালের তথ্য-উপাত্ত আছে। এসব গোপন নথি জোগাড় করে দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসকে (আইসিআইজে)। প্রায় ১০০ সংবাদমাধ্যমের সমন্বয়ে গঠিত আইসিআইজে গত বছর পানামা পেপারস ফাঁস করার পেছনেও ভূমিকা রেখেছিল। এরা এবারও প্রাপ্ত নথি পর্যালোচনা করে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের কর থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন করস্বর্গে (কর দিতে হয় না কিংবা খুবই নিম্ন হারে কর দেওয়া যায় এমন দেশ) বিনিয়োগ করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার তথ্য প্রকাশ করে।

 

কী আছে এসব নথিতে

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কয়েক শ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি ও গোপন আর্থিক লেনদেনের তথ্য উঠে এসেছে ফাঁস হওয়া নথিতে। নথিগুলো ৬৭টি দেশের ৩৮০ জন সাংবাদিক যাচাই-বাছাই করে দেখছেন। এখন পর্যন্ত ১৮০টি দেশের নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। তবে আইসিআইজে তাদের ওয়েবসাইটে বলেছে, তদন্ত শুরু মাত্র, ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করবে তারা।

 

ট্রাম্পের মন্ত্রিসভা

নব্বইয়ের দশকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন উইলবার রস। প্রেসিডেন্ট হয়ে তাঁকে বাণিজ্যমন্ত্রী করেন ট্রাম্প। ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা গেছে, রস একটি শিপিং কম্পানি থেকে লাভের অর্থ নেন। কম্পানিটি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জামাতা ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় থাকা দুই রুশের মালিকানাধীন জ্বালানি কম্পানিকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ করে বছরে কয়েক মিলিয়ন ডলার আয় করছে। নাম এসেছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ডের সদস্য র‌্যান্ডর কুয়ার্লসসহ যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির বহু সদস্যের।

 

ব্রিটেনের রানি ও প্রিন্স চার্লস

ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা গেছে, ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের ব্যক্তিগত অর্থের প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ ডলার অফশোর কম্পানিতে বিনিয়োগ হয়েছে। ডাচি অব ল্যাঙ্কাস্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব অর্থ গেছে কেম্যান আইল্যান্ড ও বারমুডায়। একই প্রতিষ্ঠান থেকে একইভাবে বিনিয়োগ করেছেন প্রিন্স চার্লসও। তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন অফশোর কম্পানি ও তহবিলে মিলিয়ন মিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করেছে। বিনিয়োগের মাধ্যমে কর ফাঁকি দিয়ে বিপুল অঙ্কের মুনাফা কামিয়েছে তাঁর প্রতিষ্ঠান।

 

জাস্টিন ট্রুডোর সহযোগী

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে নির্বাচনে আর্থিকভাবে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছেন স্টেফান ব্রনফম্যান। মাত্র দুই ঘণ্টায় ট্রুডোকে আড়াই লাখ ডলার তহবিল এনে দিয়েছিলেন ব্রনফম্যান। ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা যাচ্ছে, ব্রনফম্যান ও তাঁর প্রতিষ্ঠান প্রায় ছয় কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছেন কেম্যান আইল্যান্ডে। কর ফাঁকি ও অফশোর বিনিয়োগ বন্ধে সোচ্চার ট্রুডোর জন্য বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে এ ঘটনা।

 

আরো যাঁদের নাম

তালিকায় নাম রয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিমান পরিবহন প্রতিমন্ত্রী জয়ন্ত সিনহা, বিজেপির রাজ্যসভার সদস্য আর কে সিং, বিজয় মাল্য থেকে শুরু করে করপোরেট লবিস্ট নীরা রাডিয়ার। পানামা কেলেঙ্কারির পর প্যারাডাইস কেলেঙ্কারিতে জড়ালেন অমিতাভ বচ্চনও।

তালিকায় আরো আছে কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ব্রায়ান মুলরনি, জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউকিও হাতোয়ামা, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শওকত আজিজ, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান মানুয়েল সান্তোস, লাইবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট জনসন সারলিফ, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট মরিসিও মাকরি, জর্জিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিডজিনা ইভানিশভিলি, আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমুডুর ডেভিড গানলাগসন, ইরাকের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আয়াদ আওয়ালি, জর্দানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আলী আবু আল রাগিব, কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাম্মাদ বিন জসিম বিন জাবের আল থানি, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরোশেংকো, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল, ব্রিটিশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের বাবা ইয়ান ক্যামেরন, মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারকের ছেলে আলা মুবারক, পাকিস্তানের পদচ্যুত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ছেলে-মেয়ে হাসান, হুসেইন ও মরিয়ম, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের ছেলে নাফিজউদ্দিন, সৌদি আরবের সাবেক উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালেদ বিন সুলতান বিন আবদুল আজিজ, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের ছেলে কোজো আনান প্রমুখের নাম।

 

তালিকায় অনেক নামি প্রতিষ্ঠান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাঠিয়েছে তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপল। তারা কর এড়িয়ে যুক্তরাজ্যের জার্সি আইল্যান্ডে ২৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার অর্থ জমা করেছে। এই অর্থের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো দেশকে কর দিতে হয়নি। জার্সি আইল্যান্ডে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো কর দিতে হয় না। ফাইজার ১৭ হাজার ৮০০ কোটি ডলার, মাইক্রোসফট ১৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলার, জেনারেল ইলেকট্রনিক আট হাজার ২০০ কোটি ডলার, গুগল সাত হাজার ৮০০ কোটি ডলার, সিটি গ্রুপ চার হাজার ৭০০ কোটি ডলার, ইন্টেল চার হাজার ৬০০ কোটি ডলার, শেভরন চার হাজার ৬০০ কোটি ডলার ও এইচপি চার হাজার ১০০ কোটি ডলার অর্থ অফশোর কম্পানির মাধ্যমে সরিয়ে নিয়েছে কর ফাঁকি দিয়ে।

গত বছর পানামা পেপারস কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো বিশ্বকে। যার ফল ভোগ করতে হয়েছে নওয়াজ শরিফের মতো আরো অনেককেই। প্যারাডাইস পেপারস কতটা ঘূর্ণিঝড় তৈরি করে এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব।


মন্তব্য