kalerkantho


ইশকুলের নাম বিদ্যানন্দ

পড়ালেখার জন্য ফি গুনতে হয় না। উপরন্তু মেলে শিক্ষা    

৭ জানুয়ারি, ২০১৫ ০০:০০



ইশকুলের নাম বিদ্যানন্দ

বিনা পয়সায় পড়ার সুযোগ মেলে বিদ্যানন্দ স্কুলে। ছবি : নাভিদ ইশতিয়াক তরু

বাবা ছিলেন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। পাঁচ সন্তান নিয়ে সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়েছিল তাঁর জন্য।

ছোটবেলায় একবার টাইফয়েডে আক্রান্ত হন কিশোর। একটা সময় সেরে উঠলেও কানে ও চোখে কিছু সমস্যা থেকেই গেল। স্মৃতিশক্তিও ছিল অন্যদের তুলনায় 'দুর্বল'। এসবের মিলিত ফল 'অমনোযোগী ছাত্র'র তকমা জোটে তাঁর কপালে। স্কুল পরীক্ষায় বেশির ভাগ সময় ফেল করতেন। সবাই তাঁকে বলত 'হাঁদারাম, একে দিয়ে কিছু হবে না। ' অর্থকষ্টে লেখাপড়ায় ছেদ ঘটে মাধ্যমিকের পর। মাঝখানে বছর দুয়েকের বিরতি। পরে এক বড় ভাইয়ের পরামর্শে ভর্তি হন চট্টগ্রামের একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। সেখান থেকে এইচএসসি শেষ করে ভর্তি হন চুয়েটে। টিউশনি করে এবং বন্ধুদের সহায়তায় লেখাপড়া চালাতেন কিশোর। পাস করে বের হন ২০০৬ সালে। যোগ দেন টেলিকম কম্পানি এয়ারটেলে। এখন ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান 'ওলো'র হেড অব মার্কেটিং পদে কর্মরত আছেন পেরুতে। নিজের সঞ্চয়ের টাকায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'বিদ্যানন্দ'। সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা বিনা মূল্যে পড়ালেখার সুযোগ পায় এখানে। কিশোর বলেন, 'আমি বুঝেছি অভাব কী জিনিস। যেসব শিশু অর্থাভাবে পড়াশোনা করতে পারে না, তাদের জন্য কিছু করার তাড়না থেকেই বিদ্যানন্দের ভাবনা মাথায় আসে। '

কিশোর কুমার দাশের এ উদ্যোগে হাত বাড়িয়েছেন বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের সাব্দি গ্রামে ২২ জন ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করে বিদ্যানন্দ। 'পড়ব, খেলব, শিখব'-এ প্রতিপাদ্য নিয়ে আনন্দদায়ক উপকরণের মাধ্যমে শিশুদের লেখাপড়ায় আগ্রহী করে তোলে প্রতিষ্ঠানটি। বিদ্যানন্দে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিশুদের পড়ানো হয়ে থাকে। সপ্তাহের সাত দিনই পড়ানো হয় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। কিশোর বলেন, 'বিদ্যানন্দ স্কুলসহায়ক একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান, যেখানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা লাভ করে। '

বিদ্যানন্দের শাখা তিনটি। ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং নারায়ণগঞ্জের এই শাখাগুলোতে বিনা মূল্যে শিক্ষা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সর্বসাধারণের জন্য পাঠাগার সুবিধা দিয়ে আসছে বিদ্যানন্দ। নারায়াণগঞ্জ শাখা ব্যবস্থাপক শিপ্রা দাস বলেন, 'এখানে আমরা মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ুয়াদের ফ্রি টিচিং দিয়ে থাকি। শিক্ষার্থীদের সংখ্যা প্রায় ২৩০ জন। এ শাখায় আছে এক হাজার বইয়ের উন্মুক্ত লাইব্রেরি। '

বিদ্যানন্দের চট্টগ্রাম শাখা চালু হয় এ বছরের এপ্রিল মাসে। এখানে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ১২০। তিন হাজার বই নিয়ে আছে লাইব্রেরি। এ শাখার দায়িত্বে আছেন সৌরভ দেবনাথ। তিনি বলেন, 'গত জুলাই মাসে আমরা চালু করেছি মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা মূল্যে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং। '

মিরপুর শাখার কার্যক্রম শুরু হয় এ বছরের ৪ জুলাই। এখানে শিক্ষার্থী আছে ২৪২ জন। আছে চার হাজার বইয়ের বিশাল লাইব্রেরি। বিদ্যানন্দের সহসভাপতি ফারুক আহমেদ বলেন, 'গ্রন্থাগার সবার জন্য উন্মুক্ত। গ্রন্থাগার ব্যবহারের জন্য কোনো ফি নিই না আমরা। দরকার হয় না কোনো রেজিস্ট্রেশনেরও। '

তিন শাখা মিলিয়ে শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন বিদ্যানন্দে। সবাই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ২৭ ডিসেম্বর মিরপুর শাখায় গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের স্কুলের পড়া দেখিয়ে দিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষকরা। এখানে নিয়মিত পড়তে আসে মিরপুরের এসডিসি মডেল স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শাহীনুরের এখন আর প্রাইভেট পড়া লাগে না। মিরপুরের নাহার একাডেমির নবম শ্রেণির ছাত্র ইমরান হাসান। সে বলে, 'সৃজনশীল অঙ্ক খুব একটা বুঝতাম না। এখন সে সমস্যা কেটে গেছে। '

বিদ্যানন্দে পড়াতে আসেন গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী রূপা আহমেদ। তিনি জানান, সপ্তাহে তিন দিন পড়াতে আসেন। ভালো লাগা থেকেই এখানে আসা। ১০ হাজার সুবিধাবঞ্চিত শিশুর ছবি তুলে প্রিন্ট এবং লেমিনেটিং করে তা অভিভাবকদের মধ্যে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে 'বিদ্যানন্দ'। 'ফ্রেমে বাঁধা শৈশব' শিরোনামের এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ১০ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তোলা হচ্ছিল পথশিশুর ছবি। স্বেচ্ছাসেবকদের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিংয়ের ছাত্র শিহাব। তিনি বলেন, 'দেশের বেশির ভাগ গরিব শিশু নিজের কোনো ছবি সংরক্ষণ করতে পারে না। বিদ্যানন্দ এগিয়ে এসেছে এসব শিশুর প্রাণবন্ত শৈশব ফ্রেমবন্দি করতে। এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিশুর ছবি দেওয়া হয়েছে। '

'শিক্ষক.কম'-এর সহায়তায় ভিডিও এপ্রিল থেকে টিউটোরিয়াল তৈরির কাজ করছে বিদ্যানন্দ, যা সিডি আকারে বিনা মূল্যে বিতরণ করা হবে গ্রামাঞ্চলে। এ পর্যন্ত মাধ্যমিক জ্যামিতি ও ত্রিকোণমিতির ২০টি লেকচারের কাজ শেষ হয়েছে। ফারুক আহমেদ জানান, বিদ্যানন্দের সিংহভাগ ব্যয়ভার বহন করেন প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাস। কিছু অর্থ আসে শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে।

যোগাযোগ : বিদ্যানন্দ, ১২/এ পল্লবী, মিরপুর, ঢাকা।

 


মন্তব্য