kalerkantho


প্রতিযোগিতা

আইওটি হ্যাকাথনে চ্যাম্পিয়ন

২৮ জুলাই ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় সিসকো আইওটি হ্যাকাথন ২০১৮। প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দলগুলোকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের (ডিআরএমসি) প্রজেক্ট ‘হিউম্যান ডিটেকটেবল রোবট’। ওই হ্যাকাথনে দলটির এবং তাদের প্রজেক্টের গল্পটা জানাচ্ছেন শিশির মনির

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



আইওটি হ্যাকাথনে চ্যাম্পিয়ন

প্রতিযোগিতায় মোট ৯৮টি দল তাদের উদ্ভাবনী ধারণা জমা দেয়। চূড়ান্ত পর্বে যায় ২০টি দল। রেসিডেনসিয়াল মডেলের পাঁচ সদস্যের দলটির দলনেতা সুদীপ্ত মণ্ডল। বাকি চার সদস্য—রাইয়ান আল নাহিয়ান, আব্দুল্লাহ আল মারুফ, মো. মুহাইমিনুল ও রাশিদ আরিফ হৃদয়। প্রত্যেকে পড়ছে দ্বাদশ শ্রেণিতে। পড়াশোনার পাশাপাশি দেড় বছর ধরে কাজ করছিল ‘হিউম্যান ডিটেকটেবল রোবট’ নিয়ে।

প্রজেক্ট টিমের সদস্য মো. মুহাইমুনিল ইসলাম গত ১০ জুলাই রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সিসকো আইওটি হ্যাকাথনের ইভেন্ট পেজ দেখতে পায়। তখনই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার ইচ্ছা জেগে ওঠে তার মনে। বাকি সদস্যদের জানালে তারা শুরুতে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছিল না। ১৮ জুলাই মধ্যরাত ছিল কনসেপ্ট পেপার জমা দেওয়ার শেষ সময়। মুহাইমিনের অতি আগ্রহ দেখে ডেটলাইনের ঠিক পাঁচ মিনিট আগে কনসেপ্ট পেপার সাবমিট করে দলনেতা সুদীপ্ত মণ্ডল। সুদীপ্ত জানাল, ‘আমি ভেবেছি কনসেপ্ট পেপার সাবমিটের মধ্য দিয়ে বিষয়টা চুকে যাবে। কারণ প্রতিযোগিতা ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। যেখানে বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অংশ নিচ্ছে, সেখানে আমাদের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা কম।’

২১ তারিখ রাতে ফিরতি মেইল পায় তারা। জানানো হয় তাদের উদ্ভাবনী ধারণাপত্র চূড়ান্ত পর্বের জন্য মনোনীত হয়েছে। এতে খুশি হলেও সামনে প্রিটেস্ট পরীক্ষা থাকায় খুব একটা সময় দিতে পারেনি প্রজেক্টে।

২৮ জুলাই, ২০১৮। সিসকো আইওটি হ্যাকাথনের চূড়ান্ত পর্ব। ভেন্যু আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বনানী ক্যাম্পাস। সব দলকে সকাল ৮টার মধ্যে উপস্থিত হতে বলা হয়েছিল। সুদীপ্ত মণ্ডল ও তার দল প্রজেক্ট নিয়ে যখন পৌঁছে, তখনো অন্য কোনো দল এসে পৌঁছায়নি। ধীরে ধীরে বাকিরা আসতে শুরু করে। চূড়ান্ত পর্বের জন্য নির্বাচিত ২০টি দলের মধ্যে ১৮টি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দল, কলেজভিত্তিক দল ছিল শুধু দুটি।

‘বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের টিম ও তাদের প্রেজেন্টেশনের প্রস্তুতি, স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করা দেখে আমরা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। কারণ আমরা খুব একটা প্রস্তুতি নিয়ে আসিনি। আমাদের জানানো হলো, পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে কনসেপ্ট প্রদর্শন করা যাবে। আমরা সেখানে বসেই পাওয়ার পয়েন্টের স্লাইড বানিয়েছি’ বলল মো. মুহাইমিনুল ইসলাম।

‘এক-এক করে প্রতিটি দলকে ডাকা হচ্ছে। তারা বিচারকের সামনে প্রজেক্ট উপস্থাপনের জন্য ১০ মিনিট করে সময় পাচ্ছে। এর পর বিচারকরা আরো ১০ মিনিট সময় নিচ্ছেন প্রজেক্ট সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন করার জন্য। তবে প্রজেক্টের বর্ণনা দেবার পর আমাদের শুধু একটি প্রশ্ন করেছেন বিচারকরা। তাঁরা জানতে চেয়েছেন কত দিনে আমরা প্রজেক্ট তৈরি করেছি?’ বলছিল সুদীপ্ত মণ্ডল।

হ্যাকাথনের বিচারক হিসেবে ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. আলী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. শামীম কায়সার ও এআইইউবির সহযোগী অধ্যাপক ড. তাবিন হাসান।

আব্দুল্লাহ আল মারুফ বলল, ‘আমাদের উপস্থাপন দেখে বিচারকরা খুশি হয়েছেন বলে মনে হলো। আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। কারণ প্রতিযোগিতার শুরু থেকে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দলগুলো আমাদের স্লেজিং করে আসছিল। এতে আমাদের আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরেছিল।’

রাত ৮টার পর ফলাফল ঘোষণা শুরু। সেকেন্ড রানার্স-আপ ও প্রথম রানার্স-আপ ঘোষণার পর সুদীপ্ত আর তার দল হতাশ হয়ে পড়ল। কারণ তারা ভাবতেও পারেনি এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়কে হারিয়ে তাদের পক্ষে চ্যাম্পিয়ন হওয়া সম্ভব। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে আয়োজক কর্তৃপক্ষ।

চ্যাম্পিয়ন দলের নাম ঘোষণার পর একজন বিচারক সদস্য বলে উঠলেন, ‘দে আর ফ্রম ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ অ্যান্ড দে হ্যাভ বিটেন অল ইউনিভার্সিটিস।’ কথাটা সবার মনে অন্য রকম এক ভালোলাগার জন্ম দেয়। রানার্স-আপ হয় রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) ‘আইকিউবাটর’ প্রজেক্ট। চ্যাম্পিয়নের পুরস্কার হিসেবে সনদ ও ৫০ হাজার টাকা জিতে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের দলটি।

 

হিউম্যান ডিটেকটেবল রোবট

হিউম্যান ডিটেকটেবল রোবট কী?

‘হিউম্যান ডিটেকটেবল রোবট’ প্রজেক্টটি যেকোনো মানবিক বিপর্যয় সংঘটিত হওয়ার পর উদ্ধারকাজে সহায়ক একটি নমুনা রোবট। দলনেতা সুদীপ্ত মণ্ডল জানায়, সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর উদ্ধারপ্রক্রিয়ায় প্রযুক্তি ব্যবহারের সংকট দৃশ্যমান হয়। এই অভিজ্ঞতা থেকে হিউম্যান ডিটেকটেবল রোবটের আইডিয়া মাথায় আসে।

 

হিউম্যান ডিটেকটেবল রোবট যেখানে কাজ করবে

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শত্রু হামলা কিংবা অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে কোনো ভবন বা স্থাপনা ভেঙে পড়লে মানব উদ্ধার অভিযানে কাজ করবে হিউম্যান ডিটেকটেবল রোবট।

 

হিউম্যান ডিটেকটেবল রোবট যেভাবে কাজ করবে

দুর্ঘটনাপতিত ভবনে হিউম্যান ডিটেকটেবল রোবট প্রবেশ করবে এবং সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে বাইরে তথ্য পাঠাবে।

আক্রান্ত ভবনে প্রবেশের পর হিউম্যান ডিটেকটেবল রোবটের প্রথম কাজ হবে ভবনের ভেতরে আটকে পড়া মানুষের সন্ধান করা। শুধু তা-ই নয়, আটকে পড়া মানুষ জীবিত নাকি মৃত, সে সংকেতও পাঠাতে পারবে রোবটটি। এ জন্য রোবটটিতে একাধিক সেন্সর ব্যবহার করা হয়েছে।

 

হিউম্যান ডিটেকটেবল রোবট যে তথ্য প্রেরণ করবে

প্রজেক্ট রাইয়ান আল নাহিয়ান জানায়, উদ্ধার অভিযান ও উদ্ধারকারী দলের সুবিধার্থে ভবনের ভেতরের পরিবেশ সম্পর্কে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানাবে হিউম্যান ডিটেকটেবল রোবট। যেমন—দুর্ঘটনাস্থলের পরিবেশের তাপমাত্রা, সেখানে বিষাক্ত গ্যাসের ঘনত্ব, রোবটের স্থান থেকে কত দূরত্বে আটকে পড়া মানুষ অবস্থান করছে ইত্যাদি।

 

হিউম্যান ডিটেকটেবল রোবটের অন্যান্য সুবিধা

রোবটটি ৩৬০ ডিগ্রি কোণে নিজ অবস্থান থেকে ঘুরতে পারবে। সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা যেকোনো উঁচু-নিচু বাধা পার হতে পারবে। বর্তমানে মডেল প্রজেক্টটি ৩০ ডিগ্রির যেকোনো প্রতিবান্ধকতা মাড়িয়ে যেতে পারে বলে জানায় প্রজেক্ট টিমের সদস্য আব্দুল্লাহ আল মারুফ। এ ছাড়া ভেতরের সরাসরি চিত্র লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে বাইরে পাঠানোর সুবিধা আছে রোবটটিতে। শব্দের মাধ্যমে যোগাযোগের সুযোগ আছে। এতে করে আটকে পড়া জীবিত মানুষের জন্য যেকোনো দিকনিদের্শনা পাঠাতে পারবে উদ্ধারকারী দল। মানুষটির কথাও শুনবে উদ্ধারকারী দল। শুধু তা-ই নয়, আক্রান্ত ব্যক্তি যদি শব্দ শুনতে ব্যর্থ হন, রোবটের গায়ে থাকা স্ক্রিন থেকেও নির্দেশনা নিতে পারবেন। স্ক্রিনে টেক্সট বা ভিডিওর মাধ্যমে নির্দেশনা প্রদর্শন করা হবে। জানাল প্রজেক্ট মেম্বার রাশিদ আরিফ হৃদয়।



মন্তব্য