kalerkantho


নাফিসের খেলার ভুবন

নাফিস ফুয়াদ বসুনিয়ার জীবনে খেলাধুলাটা অন্য রকম একটা জায়গা দখল করে আছে। খেলাধুলার অনেক বিভাগেই তার আছে পুরস্কার। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আফরা নাওমী

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



নাফিসের খেলার ভুবন

একাদশ শ্রেণিতে পড়ে হাসিখুশি চঞ্চল ছেলে নাফিস। সব সময় কথা বলে হেসে হেসে। স্কুলে প্রথম ভর্তির পরও তাই কোনো ভয়ডর ছিল না, কান্নাকাটিও করত না। হাস্যোজ্জ্বল নাফিস চিলড্রেন্স গার্ডেন স্কুলে কেজিতে দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে নিল। যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতায় ‘বন্যা দুর্গত দুস্থ’র বেশে সেজে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এভাবে কিন্ডারগার্টেনের জীবনেই ছোট্ট নাফিসের বিজয়ের গল্প শুরু। এর পর ঢাকার স্বনামধন্য বিদ্যালয় সেন্ট যোসেফ হাইয়ার সেকেন্ডারি স্কুলে ভর্তি হলো তৃতীয় শ্রেণিতে।

শৈশবে এলাকায়, রাস্তায় বিকেল হলেই নেমে পড়ত বন্ধু ও বড় ভাইয়াদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে। নাফিস সেন্ট যোসেফে তাই প্রথমেই যুক্ত হলো ক্রিকেটের সঙ্গে। সে ছিল তার টিমের সেরা খেলোয়াড়। সে একজন অলরাউন্ডার। নেহাতই শিশু অবস্থায় খেলেছিল বলেই হয়তো সেবার ফাইনালে চতুর্থ শ্রেণির টিমের সঙ্গে হেরে গেল। প্রথমবার হেরে গিয়ে শোধ নিল, পরপর দুই বছর চ্যাম্পিয়ন হয়ে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে স্কুল টুর্নামেন্টে হয়েছিল রানার-আপ। সেবার মা ও মামার উৎসাহে ভর্তি হয়েছিল একটি ক্রিকেট একাডেমিতে, ডিসকভারি ক্রিকেট ক্লাবে। নিয়মিত ক্রিকেট প্র্যাকটিস করত সেখানে। সপ্তম শ্রেণিতে স্কুলের মূল ক্রিকেট টিমে যোগ দিল। এদিকে নিজস্ব ক্লাস টিমকে নিয়ে চ্যাম্পিয়নও হলো। সে বছর স্কুল টিমের সঙ্গে নাফিস অংশ নিয়েছিল স্ট্যান্ডার্ড চ্যার্টার্ড নিবেদিত ইয়াং টাইগার্স আন্ডার ১৮ ন্যাশনাল স্কুল ক্রিকেট টিম টুর্নামেন্টে। মোহাম্মদপুর থানা পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে ছিল। অষ্টম শ্রেণিতে আবার চ্যাম্পিয়ন স্কুলে। স্ট্যান্ডার্ড চ্যার্টার্ড নিবেদিত ইয়াং টাইগার্স ন্যাশনাল স্কুল ক্রিকেট টিম টুর্নামেন্টে সেবারও চ্যাম্পিয়ন হওয়া হয়নি। থানা পর্যায় পর্যন্তই ছিল যাত্রাটা। নবম শ্রেণিতে স্কুলে আর অংশ নেয়নি। ইয়াং টাইগার্স ন্যাশনাল স্কুল ক্রিকেট টিম টুর্নামেন্টে যখন অংশ নেবে সব রেডি, হঠাৎ জন্ডিস ধরা পড়ায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। পড়াশোনার চাপে দশম শ্রেণিতেও সেভাবে অংশ নেওয়া হয়নি ক্রিকেটে।

ক্রিকেট একাডেমিতে যেদিন ভর্তি হতে গেল সেদিনই ডিসকভারি ক্রিকেট ক্লাবের কোচ সাজু স্যার ওর বোলিং দেখে মুগ্ধ। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়েই কলেজ টিমে তাকে নেওয়া হয়েছিল একটি টুর্নামেন্টে। সাধারণত স্কুলের কাউকে নেওয়া হয় না কলেজ টিমে। কিন্তু নাফিস নিজের যোগ্যতায় সেখানেও জায়গা করে নিয়েছিল।

ফুটবলেও পিছিয়ে ছিল না নাফিস। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া নাফিস মামার হাত ধরে এয়ারটেল রাইজিং স্টারে অংশ নিতে গিয়েছিল। কোয়ালিফাইও হয়েছিল। কিন্তু বয়সে বেশি ছোট হওয়ায় তার এখানে আর এগোনো হলো না। এর পর স্কুলে বেশ কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ফুটবলে তার দল। তাদের স্পোর্টস ক্লাব, ইন্টারেক্ট ক্লাব অষ্টম শ্রেণিতে ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। নবম শ্রেণিতে স্কুলের প্রধান ফুটবল টিমে যুক্ত হয়েছিল। খেলেছিল ‘জাতীয় স্কুল ও মাদরাসা ক্রীড়া প্রতিযোগিতা’র ফুটবল বিভাগে। সেখানে ক্যাপ্টেন নাফিস তার স্কুল টিম নিয়ে মোহাম্মদপুর থানা পর্যায়ে রানার্স-আপ হয়েছিল। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়ও রানার্স-আপ হয়েছিল থানা পর্যায়ে গিয়ে। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের আয়োজনে ‘জাতীয় স্কুল ন্যাশনাল ফুটবল ফিয়েস্তা’-তে রানার্স-আপ হয়েছে তার দল। এ ছাড়া খেলেছিল অনেক আন্ডারগ্রাউন্ড ফুটবল টুর্নামেন্টেও। একবার আবার স্কুলের এক টুর্নামেন্টে দারুণ এক ঘটনা ঘটে। ফুটবল টিমে একজন টিমমেটের সঙ্গে ছোটখাটো কিছু সমস্যার কারণে নাফিস নিজের টিম বদলে অন্য একটি টিমের হয়ে খেলে। আর ওই টিমের হয়েই যখন টপ স্কোরার হয়ে গেল, তখন তার পুরনো দলের খেলোয়াড়রা রীতিমতো হতবাক! এত গোল দেবে ভাবতে পারেনি নিজেও। তাই এটা তার একটা বড় অর্জন বলে মনে করে নাফিস।   

নাফিস তার মায়ের পছন্দে টেবিল টেনিসও খেলে। চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে রেগুলার খেলে সপ্তম শ্রেণিতে স্কুল টিম নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হলো। অষ্টম শ্রেণিতে ইন্টারেক্ট ক্লাবের টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতা বিভাগে হলো চ্যাম্পিয়ন। নবম শ্রেণিতে থাকাকালীন জাতীয় টেবিল টেনিস কম্পিটিশনে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গিয়েছিল। স্কুলেও দশম শ্রেণিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল নাফিস।

ব্যাডমিন্টন খেলাও বাদ যায়নি। দশম শ্রেণিতে প্রথম কোনো ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে রানার-আপ হয়েছিল। আর মোহাম্মদপুর থানায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল সিনান সাইফি অরিত্রকে সঙ্গে নিয়ে লালমাটিয়া বয়েজকে হারিয়ে।

বড় ভাইয়াদের বাস্কেটবল খেলা দেখে বাস্কেট বলেও আগ্রহ জাগে নাফিসের। স্কুলে আয়োজিত বাস্কেট বল টুর্নামেন্টে নবম ও দশম শ্রেণিতে রানার্স-আপ হয়েছিল তার দল।

দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় ১০০ মিটার, রিলে রেস ও শর্ট ফুট প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন এবং লং জাম্প ও ৪০০ মিটার দৌড়ে রানার-আপ হয়েছিল।

বিজ্ঞান মেলায় তৃতীয় শ্রেণিতে বায়োগ্যাস প্রজেক্ট নিয়ে অংশ নিয়েছিল নাফিস। পুরো প্রজেক্টটি যখন রেডি, তখন নাফিসের আম্মুর একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল প্রজেক্টটি। তাই তাড়াহুড়া করে মার্কেট থেকে কয়েকটি খেলনা গরু-ছাগল, গাছপালা কিনে সাজিয়ে দিলেন। আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠল নাফিসের বায়োগ্যাস প্রজেক্টটি আর জিতে নিল প্রথম পুরস্কার। বিভিন্ন সময়ে আরো দুবার অংশ নিয়ে প্রথম ও তৃতীয় হয়েছিল বিজ্ঞান মেলায় বিভিন্ন প্রজেক্ট নিয়ে।

এ ছাড়া তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলের সব রকম বার্ষিক প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নিয়েছে নাফিস; আর বছর বছর ঘরে তুলেছে অসংখ্য পুরস্কার। সব মিলিয়ে ৫০টির ওপরে ক্রেস্ট মেডেল ও সনদ রয়েছে নাফিসের ঝুলিতে।

ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত স্কাউটের সদস্যও ছিল। ঘরে বসে নিজে নিজেই ইউটিউব দেখে শিখছে গিটার বাজানো। আগ্রহ আছে ফটোগ্রাফিতেও। ভ্রমণের শখও রয়েছে। প্রথমবারের মতো পরিবার ছেড়ে এসএসসির পর তিন বন্ধু মিলে ঘুরে এলো মীরসরাইয়ের দুর্গম পাহাড়ে খৈয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া আর কক্সবাজারে।

এত কিছুতে পারদর্শিতা তার একার অর্জন নয়। এসবে প্রতিনিয়ত পাশে ছিলেন মা নূর পরী ইসলাম। মায়ের সঙ্গে নাফিসের বন্ধুর মতো সম্পর্ক। মাকে না জানিয়ে কিছুই করা হয় না। মা-ও ছেলের সব আবদার পূরণ করেন হাসিমুখে। বাবা ফয়জুল ইসলাম বসুনিয়া একটু শাসনে রাখেন বটে, তবে শাসনে ভালোবাসার কমতি নেই। মা-বাবার পাশাপাশি আরো দুজন ব্যক্তি আছেন, যাঁরা নাফিসকে তার গোটা জীবনে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন। তাঁরা হলেন মামা নুরুজ্জামান বাবু ও মামাতো ভাই বায়েজিদ আমিন। খেলাধুলায় পুরোটা সময়, সেই ছোট থেকে নাফিসকে তার মামা উৎসাহ জুগিয়ে গেছেন। বিশেষ করে ক্রিকেটে। ভাইয়া বায়েজিদ আমিনও ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত আছেন, তাই নাফিসকে সাহায্য করেছেন ক্রিকেট খেলায়। তাঁর ক্রিকেট কিটস, হেলমেট, প্যাড দিয়েই খেলা শুরু করেছিল নাফিস।

এত কিছুর মধ্যে পড়াশোনাও করেছে মন দিয়ে। এসএসসিতে জিপিএ ৫ নিয়ে এখন পড়ছে ঢাকার বিখ্যাত নটর ডেম কলেজে। টার্গেট করেছে আইএসএসবি দিয়ে আর্মিতে যাবে নয়তো বুয়েটে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে। সঙ্গে খেলাধুলা তো থাকবেই!



মন্তব্য