kalerkantho


প্রকৌশলবিদ্যায় আমাদের মেয়েরা

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



প্রকৌশলবিদ্যায় আমাদের মেয়েরা

একটা সময় মনে করা হতো, ভালো শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ছেলেদের প্রকৌশলী, আর মেয়ে ডাক্তার হওয়াই মানায়। কোনো মেয়ে প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখলে তাঁর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাত অনেকেই। আশার ব্যাপার, বহু দিনের প্রচলিত এই ধারণা এখন পাল্টাতে শুরু করেছে। তাই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রীসংখ্যা আগের তুলনায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা সামনেই। প্রকৌশলবিদ্যায় পড়ার স্বপ্ন দেখা ছাত্রীদের প্রেরণা জোগাতে চার প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের চার মেধাবী শিক্ষার্থীর গল্প শোনাচ্ছেন মেহেদী হাসান গালিব

 

বিজ্ঞানী হতে চেয়ে

তামান্না মাহজাবিন মৌমিতা

প্রথম বর্ষ, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

অজানা কিছু আবিষ্কারের প্রতি এক ধরনের টান অনুভব করতেন ছোট্ট মৌমিতা। বিজ্ঞানীদের জীবনকাহিনি পড়ে কল্পনার ক্যানভাসে নিজেকে আঁকতেন তাঁদের রূপে। সেই থেকে তাঁর স্বপ্ন দেখার শুরু। ঢাকার এই মেয়েটি মাধ্যমিকে পড়েছেন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। আর উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়েছেন রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ থেকে। এর পর যেন তাঁর ডানা মেলার পালা! তাতে সামনে থেকে প্রেরণা জুগিয়েছেন মা-বাবা। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিযুদ্ধে মৌমিতা জায়গা করে নিয়েছেন স্বপ্নের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কাঙ্ক্ষিত আসনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠে পা রেখে তিনি পেয়ে যান শেখার জন্য মনের মতো পরিবেশ। বেড়ে যায় তাঁর বিচরণের সীমানা। বুয়েটের গণিত ক্লাব ‘অনুরণন’ ও ‘বুয়েট রোবটিকস সোসাইটি’র নিয়মিত সদস্য তিনি। পাশাপাশি প্রগ্রামিংয়ের প্রতিও রয়েছে তাঁর সমান আগ্রহ। এসবের পাশাপাশি এতটুকু অবসর পেলে গল্পের বই পড়তে কিংবা সিনেমা দেখতে ভালো লাগে তাঁর। প্রকৌশলবিদ্যায় মেয়েদের অধ্যয়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে মৌমিতার ভাষ্য, ‘আগের তুলনায় আমাদের দেশে এ বিদ্যায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। সংখ্যাটা এখনো ছেলেদের সমান না হলেও, মেয়েরা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে এটি বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’

 

ইচ্ছার দাম

মাহমুদা আকতার

প্রথম বর্ষ, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

মা-বাবার ইচ্ছায় ডাক্তার হওয়ার কথা ভেবেছিলেন মেয়েটি। কিন্তু নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর মনে হলো, প্রকৌশলবিদ্যাই হতে পারে উপযুক্ত রাস্তা। কেননা জীববিজ্ঞানের চেয়ে পদার্থবিদ্যা ও গণিত বেশি ভালো লাগে তাঁর। মা-বাবাকে সিদ্ধান্তটি জানানোর আগে মাহমুদার মধ্যে অবশ্য দ্বিধা কাজ করেছিল। বাবা হাসিমুখে সম্মতি দিলেও বাদ সেধেছিলেন মা! তবে পরে মাহমুদার শিক্ষকদের পরামর্শে নরম হয় মায়ের মন। বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং সরকারি আজিজুুল হক কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ সারেন মাহমুদা। কিন্তু এইচএসসিতে বাংলায় ‘এ+’ মিস করেন তিনি। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও গণিত মিলিয়ে তাঁর মোট নম্বর দাঁড়ায় ৫২৩। বন্ধুবান্ধবসহ অনেকেই তখন বলতে থাকেন, এই নম্বর দিয়ে বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে না। এ আশঙ্কায় ভেঙে পড়েন তিনি। তবে কলেজের পদার্থবিদ্যার শিক্ষক আশরাফ স্যারের অনুপ্রেরণায় ধীরে ধীরে সামলে নেন দুঃসময়। ঘটনা হলো, বুয়েটে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং মেধাতালিকায় স্থান অর্জন করতেও সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। তবে সেখানে পছন্দের বিষয় না পাওয়ায় ভর্তি হন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট)। অতীতের ভুলভ্রান্তি ও হতাশা দূরে ঠেলে তিনি আবার স্বপ্ন দেখছেন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের। নিজেকে একজন দক্ষ প্রগ্রামার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি।

 

হাসিমুখে দিনযাপন

রিফাত সুলতানা স্বর্ণ

প্রথম বর্ষ, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

স্বর্ণর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বগুড়ায়। মা-বাবা স্বপ্ন দেখতেন, তাঁদের এই আদুরে মেয়েটি বড় হয়ে একদিন নামকরা ডাক্তার হবে। মা-বাবার সেই ইচ্ছা পূরণে অবশ্য আপত্তি ছিল না স্বর্ণর। তাই ছোটবেলায় কেউ আদর করে যখন জিজ্ঞেস করত, ‘বড় হয়ে কী হতে চাও?’ ঝটপট উত্তর দিতেন তিনি, ‘ডাক্তার!’ কিন্তু বড় হতে হতে খেয়াল করলেন, জীববিজ্ঞানের চেয়ে পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা ও গণিতের প্রতিই তাঁর আগ্রহ ও ভালোলাগা বেশি। উপলব্ধি করতে পারলেন, ডাক্তারির পড়াশোনা তাঁর জন্য নয়! বরং প্রকৌশলবিদ্যাই শ্রেয়। মেয়ের এ ভাবনা জেনে মা-বাবা অবশ্য আপত্তি করেননি; বরং উৎসাহ জুগিয়েছেন। উচ্চ মাধ্যমিক শেষে ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে থাকেন স্বর্ণ। সফলও হন। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) ১৫২ একর প্রাঙ্গণে শুরু হয় তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়। সার্কিট ও ইলেকট্রনিকসের বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি আগে থেকেই তাঁর আগ্রহ ছিল। তাই বিভাগ হিসেবে বেছে নেন ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিংকে। প্রকৌশলবিদ্যায় পড়াশোনার চাপ ও ব্যস্ততা থাকলেও পছন্দের বিষয়ে পড়তে পেরে হাসিমুখেই সেসব সামলান তিনি। অবসর পেলে সময় কাটান সিনেমা দেখে, গান শুনে ও ঘোরাঘুরি করে। ছবি তুলতেও ভালো লাগে তাঁর। ভবিষ্যতে নিজেকে দক্ষ প্রকৌশলীর পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান।

 

সময়ের বোঝাপড়া

সুপ্তা দাস

প্রথম বর্ষ, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

মা ও বড় বোন শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকায় ছোটবেলায় সুপ্তা স্বপ্ন দেখতেন, বড় হয়ে তিনিও হবেন মানুষ গড়ার কারিগর। কিন্তু অষ্টম শ্রেণিতে ওঠার পর হঠাৎ করেই তাঁর সেই স্বপ্নের বাঁক বদল ঘটে গেল। ইচ্ছা জাগল প্রকৌশলী হওয়ার। নবম শ্রেণিতে পদার্থবিদ্যা ও গণিতের প্রতি অনুভব করলেন অদ্ভুত ভালোলাগা। এটাই তাঁকে সাহস জোগাল নতুন স্বপ্নের পথে হাঁটতে। মুন্সীগঞ্জের এভিজেএম সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে কেটেছে তাঁর মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন। এর পর ভর্তি হন ঢাকার হলিক্রস কলেজে। হঠাৎ এসে রাজধানীর পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে শুরুতে বেগ পোহাতে হয় তাঁকে। এইচএসসির পাঠ চুকিয়ে প্রস্তুতি শুরু করেন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার। তার ফল হিসেবে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের [কুয়েট] কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পান ভর্তির সুযোগ।

প্রগ্রামিং ও কোডিং করতে খুব ভালো লাগে সুপ্তার। অবসর পেলে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসেন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ক্লাব—‘হার্ডওয়্যার এক্সেলারেটিং ক্লাব অব কুয়েট’ ও ‘স্পেশাল গ্রুপ ইন্টারেস্টেড ইন প্রগ্রামিং কনটেস্ট’-এর সদস্য হিসেবে নিজেকে উজাড় করে দেন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে সুপ্তা বলেন, ‘বর্তমানকে পুরোপুরি উপভোগ করতে চাই। কেননা বর্তমানের কাজগুলো ঠিকমতো করতে পারলে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অর্জনে খুব বেশি বেগ পোহাতে হবে না।’



মন্তব্য