kalerkantho


টিফিন আওয়ার

মকপানগুমের স্কুল

আফ্রিকা মহাদেশের সিয়েরা লিওনের প্রত্যন্ত এলাকায় এক স্কুল ও এর প্রধান শিক্ষকের গল্প শোনাচ্ছেন অমর্ত্য গালিব চৌধুরী

২৯ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



মকপানগুমের স্কুল

মকপানগুম গ্রামখানির অবস্থান পশ্চিম আফ্রিকার সিয়েরা লিওনে। চিলড্রেন অব নেশন বছর দশেক আগে পাশের গ্রাম এনগোলালাতে একটা স্কুল খুললে দেখা গেল, ঝাড়া পাঁচ মাইল রাস্তা পাড়ি দিয়ে মকপানগুমার বাচ্চারা সেখানে পড়তে আসছে। সিয়েরা লিওনের গৃহযুদ্ধে তাদের গ্রামের নিজস্ব স্কুলখানি গুঁড়িয়ে গিয়েছে বলেই এই পরিশ্রম।

এনগোলালা স্কুলের এক শিক্ষক, মিস্টার ফোডে এই শিশুদের দেখে খুব অনুপ্রাণিত হন। তিনি ২০০৭ সালে নিজের গোটা পরিবার নিয়ে চলে গেলেন মকপানগুম গ্রামে। সেখানেই ওই গ্রামের বাচ্চাদের পড়ানো শুরু করলেন। নিছক স্কুলে পড়ার জন্য যেসব বাচ্চা পাঁচ মাইল রাস্তা, নদী, জঙ্গল পার হয়ে যেতে পারে, তাদের জন্য উঠেপড়ে লাগলেন মিস্টার ফোডে। শুরুতে খোলা মাঠে, গাছতলায় পড়ালেখার কাজটা চলত। চার বছর এভাবে চলার পরে চিলড্রেন অব নেশনের কর্তাদের নজর পড়ে এদিকে। বিশ্বে শিশুদের খেয়াল করার জন্য অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আছে। চিলড্রেন অব দ্য নেশন তেমনই একটি সংগঠন। মূলত আফ্রিকা আর ক্যারিবীয় অঞ্চলের চরম দরিদ্র শিশুদের সাহায্য করে থাকে এই সংগঠনটি। শুধু সাহায্য বা রিলিফ দিলেই যে শিশুদের অবস্থার উন্নতি হবে—এমন কোনো কথা নেই। বেশির ভাগ দেশেই লম্বা সময়ের জন্য দুস্থ শিশুদের শারীরিক, মানসিক ব্যাপারগুলোকে পর্যবেক্ষণ এবং সে অনুযায়ী সাহায্য করার কাজটি করে এই চিলড্রেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড। এবার তাঁরা টাকা তুলতে আরম্ভ করলেন মকপানগুমে স্কুল ঘর বানানোর জন্য। কিন্তু একটা সমস্যা দেখা গেল। টাকা দেওয়ার মতো হিতৈষী প্রচুর আছে। দুর্গম জায়গায় স্কুল বানানোর মালামাল পরিবহন করা দেখা গেল প্রায় অসম্ভব।

অতএব এগিয়ে এলো শিক্ষার্থীরা। গ্রামের লোক আর শিশুরা মিলেমিশে রাস্তা বানাল, জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করল, তারপর শুরু করল স্কুলঘর বানানো। মানুষের টাকা আর স্বেচ্ছাশ্রম—এই হলো পাথেয়। মিস্টার ফোডে হলেন প্রধান শিক্ষক। বর্তমানে তাঁর অধীনে ছাত্র-ছাত্রী আছে ৯৮ জন। আর এখন নতুন স্কুল ঘরে তাদের বসবারও কোনো সমস্যা নেই।

মিস্টার ফোডের জীবনের লক্ষ্য ছিল নার্স হওয়া। কিন্তু ওই বিষয়ে প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার আগেই সিয়েরা লিওনে বেঁধে গেল গৃহযুদ্ধ। ফলে পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। পরে সিয়েরা লিওনের রাজধানী ফ্রিটাউনে এসে এক আত্মীয়ের টাকায় পাদ্রি হওয়ার জন্য পড়াশোনা শুরু করেন। সেই আত্মীয় মারা গেলে এই পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যায়। তবে মিস্টার ফোডের ভাগ্য খুলে গেল কয়েক বছর পড়ে। চিলড্রেন অব দ্য নেশনের একটা স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। যদিও শিক্ষক হওয়ার জন্য দরকারি ট্রেনিং তাঁর ছিল না; কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর বাচ্চাদের জন্য কিছু করার মনোভাবের জন্যই তাঁকে বেছে নেয় কর্তৃপক্ষ। পড়ে মকপানগুমের নতুন স্কুলের প্রধান শিক্ষক হয়ে তিনি প্রমাণ করেন যে তাঁকে বেছে নেওয়া ঠিক সিদ্ধান্তই ছিল। সেই যে শুরু, দশ বছরে স্কুলের ছাত্রসংখ্য ২৫ থেকে বেড়ে ৯৮-তে পৌঁছেছে। ছয়টি শ্রেণিতে পড়াশোনা চলছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশেও সৎ ইচ্ছা আর আগ্রহ থাকলেই যেকোনো সমস্যার মোকাবেলা করা যায়—তার চমত্কার উদাহরণ হচ্ছে এই স্কুল ও এর প্রধান শিক্ষক।

স্কুলঘরের বারান্দায় ক্লাস নিচ্ছেন মিস্টার ফোডে



মন্তব্য