kalerkantho


নামই তার প্রাপ্তি

পুরো নাম সাজিয়া আফরিন প্রাপ্তি হলেও সবাই প্রাপ্তি নামেই চেনে তাকে। চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জেএসসি দেবে। এই বয়সেই পেয়েছে এত্ত এত্ত পুরস্কার। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আরাফাত বিন হাসান

২৯ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



নামই  তার প্রাপ্তি

প্রাপ্তি তখনো লিখতে জানত না। সাদা কাগজে চলত ইচ্ছামতো আঁকাআঁকি। এরই মধ্যে একদিন এঁকে ফেলে দুটি আস্ত মানুষের ছবি। অনেকের চোখে এটি সাধারণ মনে হলেও তার চিকিত্সক মায়ের চোখে মোটেও সাধারণ ছিল না। তিনি খেয়াল করলেন প্রাপ্তির আঁকা ছবির মানুষ দুটি প্রায় বড়দের আঁকার মতোই। ‘ও যখন ছোট ছিল, কোনো কিছু কথা বলে বোঝাতে না পারলে সেটা কাগজে এঁকে বোঝানোর চেষ্টা করত। তখন আমি সহজেই ও কী বলতে চাচ্ছে বুঝতে পারতাম।’ বললেন প্রাপ্তির মা। মাত্র ছয় বছর বয়সে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, চট্টগ্রামের একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হওয়ার মাধ্যমে পুরস্কারের খাতা খোলে তার।

সেই থেকে একের পর এক বিভিন্ন পুরস্কার জিতেই চলেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ইউনিসেফ-ইপিআই আয়োজিত ‘টিকা, শিশুর জীবন বাঁচায়’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে ‘খ’ বিভাগে প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত হয় তার আঁকা ছবি। সেবার তার আঁকা ছবি দিয়ে একটা বর্ষপঞ্জিকা তৈরি করেছিল কর্তৃপক্ষ। শুধু চিত্রাঙ্কনেই তার ঝুলিতে জমা হয়েছে শতাধিক পুরস্কার। আবৃত্তিতেও কম যায় না, খেলাঘর চট্টগ্রাম আয়োজিত আবৃত্তি প্রতিযোগিতা-২০১১-তে হয় প্রথম। জাতীয় শিশু পুরস্কার ২০১৭-তেও আবৃত্তিতে আঞ্চলিক পর্যায়ে তৃতীয় হয়।

প্রাপ্তি ছোট থেকে খুবই বইপ্রেমী। তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু এই বই-ই। প্রাপ্তির মা-বাবাও বইপোকা। একবার তো চট্টগ্রাম বিভাগীয় গণ-পাঠাগারে পাঠচক্রে প্রাপ্তি আর তার মা যৌথভাবে দ্বিতীয় হয়েছিল।

প্রাপ্তির নাম নিয়ে অনেকে মজা করে বলেন, নামই যার প্রাপ্তি, তার তো অনেক প্রাপ্তি থাকবেই। এ কথাটা আক্ষরিক অর্থেই সত্যি! এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে প্রাপ্তির ঝুলিতে জমা পুরস্কারের সংখ্যা ২৫০-এর বেশি।

২০১৬ সালে গণিত অলিম্পিয়াডের আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রাপ্তির পরীক্ষা মোটামুটি ভালোই হয়েছিল। ভেবেছিল কোনো না কোনো একটা পুরস্কার পাবে। কিন্তু ফল ঘোষণা করার সময় একে একে বেশির ভাগ বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হলেও তার নাম আর শোনা যাচ্ছিল না। হতাশই হয়ে পড়েছিল। ঠিক এমন সময় চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ঘোষণা করা হলো তার নাম। নিজের নাম শুনেই মঞ্চের দিকে ভোঁ  দৌড়। প্রাপ্তি জানায়, সেটা ছিল তার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। এ ছাড়া এইচএসবিসি-প্রথম আলো ভাষা প্রতিযোগ-২০১৬-এ আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রথম ও জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় হয়। উপস্থাপনায়ও বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ টেলিভিশন, চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে উপস্থাপনার জন্য ডাক আসে তার। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, চট্টগ্রামের নানা অনুষ্ঠানেও উপস্থাপক হিসেবে মাঝেমধ্যে দেখা মেলে তার। ছোটবেলায় গানের সঙ্গে গলাগলি থাকলেও এখন আর খুব একটা সময় দেওয়া হয় না তাতে। তবে প্লে থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দেশাত্মবোধক গানে প্রথম স্থানটি টানা তার দখলেই ছিল।

এর বাইরে রচনা লেখা, সুন্দর হাতের লেখা, শুদ্ধ বানান চর্চা—এসব বিষয়েও প্রাপ্তির রয়েছে ভূরিভূরি পুরস্কার। আগ্রহ আছে ক্যালিগ্রাফিতেও। সুযোগ পেলেই ক্যালিগ্রাফি নিয়ে বসে পড়ে। বিতর্কেও পিছিয়ে নেই, চট্টগ্রামে বিতর্কের অন্যতম বড় সংগঠন দৃষ্টি, চট্টগ্রামের সদস্য সে।

প্রাপ্তি জানায়, ছোট থেকে এসব সহ-শিক্ষামূলক কার্যক্রমে মা সব সময় তার পাশে থেকেছেন। এ ব্যাপারে প্রাপ্তির মা ডা. হুমায়রা তরফদার বলেন, ‘জীবনের শুরুটা যাতে সুন্দর কিছু দিয়ে হয় সেটাই চেষ্টা করেছি। এর পরের দায়িত্ব ওর। নামের সার্থকতা কাজের মাধ্যমে হবে—সেটাই চাই। এই ছোট বয়সে অনেক অর্জনই রয়েছে ওর ঝুলিতে। তবে সেটা যেন ওকে অহংকারী না করে তোলে।’ প্রাপ্তি বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ হলেও সবচেয়ে বেশি আগ্রহ চিত্রাঙ্কনেই। চকোলেট খুব পছন্দ তার। তাই ছোট বেলায় চকোলেটওয়ালা হওয়ার ইচ্ছা ছিল খুব। তবে এখন বড় হয়ে সত্যিকার অর্থে মানুষের মতো মানুষ হতে চায়। অবসরে সাধারণত বই পড়ে। বেড়াতেও ভালো লাগে।

 ছবি : খাইরুজ্জামান মাসুদ

 



মন্তব্য