kalerkantho


বিজ্ঞানী হতে চায় সায়মা

হ্যান্ডবল, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন আর ক্যারমে সমান পারদর্শী সায়মা। আবৃত্তি, সংগীত আর নাটকেও কম যায় না। এ ছাড়া বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা আর বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায়ও আছে অনেক পুরস্কার। বারিধারা স্কলার্স ইনস্টিটিউশনের নবম শ্রেণিপড়ুয়া ফারজিয়া আলম সায়মার গল্পটা বলছেন শিশির মনির

৮ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



বিজ্ঞানী হতে চায় সায়মা

সময়টা ২০১৭। স্কুল হ্যান্ডবলের ফাইনাল খেলা চলছে। শেষ বাঁশি বাজতে তখনো ২০ মিনিট বাকি। বল লেগে মারাত্মক আহত গোলরক্ষক সায়মা। নাক ফেটে অনবরত রক্ত ঝরছে। সবাই অনুরোধ করছে মাঠ ছেড়ে যেতে; কিন্তু দমবার পাত্র নয় সায়মা। শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত খেলা চালিয়ে গেল। সেবার তার দল স্কুল হ্যান্ডবলে চ্যাম্পিয়ন হয়। তার এই অদম্য মনোভাব তার দলকে চ্যাম্পিয়ন হতে সাহায্য করে সন্দেহ নেই। হ্যান্ডবলের সঙ্গে সায়মার সখ্য বহু পুরনো। ২০১৪ সালেও হ্যান্ডবলে তার দল স্কুলসেরা হয়।

ফুটবল আর ক্যারমেও তুখোড় সায়মা। সায়মার দল ২০১৬ সালে স্কুল ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়। একই বছর স্কুল ক্যারমেও চ্যাম্পিয়ন হয় সে। স্কুল ক্যারমে অংশ নেওয়ার জন্য অনুশীলনের প্রয়োজন ছিল সায়মার। মেয়েকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেন সায়মার বাবা। বাসায় বাবার সঙ্গে ক্যারমের প্রস্তুতিটা সেরে নেয়। সে যাত্রায় সায়মা ক্যারম প্রতিযোগিতায় স্কুলসেরার খেতাব পায়।

নাটক, সংগীত আর আবৃত্তিচর্চাও বেশ উপভোগ করে সায়মা। বাংলা ও ইংরেজি কবিতা আবৃত্তিতে সায়মা ২০১৩ সাল থেকে পুরস্কার পেয়ে আসছে। সবশেষ ২০১৮ সালে বাংলা কবিতা আবৃত্তিতে প্রথম ও ইংরেজি কবিতায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করে। ২০১৬ সালে স্কুল নাটকে প্রথম এবং ২০১৭ সালে সংগীত প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয় সায়মা। চিত্রাঙ্কনেও সায়মার হাত বেশ পাকা। ছবি এঁকেও অনেক পুরস্কার জিতেছে।

যুক্তিতর্কের খেলা বিতর্কেও সায়মার অর্জন চোখে পড়ার মতো। ২০১৫ সাল থেকে স্কুল বিতর্কে সায়মার দল নিয়মিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে আসছে। যার মধ্যে ২০১৫ সালে সায়মা বিজয়ী দলের সদস্য ছিল শুধু; কিন্তু ২০১৬ সাল থেকে ডিবেট টিমের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে সে। এমনকি টানা তিন বছর ধরে বিতর্কে সেরা বক্তার পুরস্কারও জিতে চলছে। যদিও বিতর্ক আর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে কোনটি বেশি উপভোগ করে জানতে চাইলে সায়মা জানায় বিতর্কেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তার মতে, একমাত্র বিতর্কের মাধ্যমেই নিজের শাণিত মেধাকে কাজে লাগানোর সুযোগ বেশি থাকে।

সায়মার কয়েকটি অর্জনের পেছনে অবিশ্বাস্য একটি গল্পও আছে। চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি সায়মা তার এক বন্ধুর সঙ্গে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজে ঘুরতে গিয়েছিল। গিয়ে দেখল সেখানে ন্যাশনাল কার্নিভাল ফেস্ট চলছে। পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই সায়মা তিনটি ইভেন্টে অংশ নিয়ে পুরস্কার জেতে। উপস্থিত বক্তব্যে তৃতীয় হয়। তার বক্তব্যের বিষয় ছিল ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক। ইংরেজি বানান প্রতিযোগিতায় তৃতীয় ও কনফ্যাব সেমিনারে হয় রানার-আপ।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশন আয়োজিত কুইজ প্রতিযোগিতায়ও অংশ নেয় সায়মা। একাডেমিক ফলাফলেও তার মেধার পরিচয় মেলে। পিইসি ও জেএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়েছে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ছিল ক্লাস টপার। এত কিছুর পাশাপাশি মার্শাল আর্টও শিখছে। শারীরিক ফিটনেস না থাকায় একসময় তাকে মার্শাল আর্ট টিমে নিতে চায়নি কর্তৃপক্ষ। অথচ সায়মা আজ মার্শাল আর্ট টিমের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

গতবছর সায়মা তিনটি মডেল ইউনাইটেড নেশন—মুনে অংশ নেয়। তিনটি মডেলে সিঙ্গাপুর, মিসর ও সুইডেনের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয় তাকে। সায়মার ভাষায়—‘এটা ছিল আমার জন্য দারুণ অভিজ্ঞতা। আমি এই সময়গুলো দারুণ উপভোগ করেছি এবং অনেক কিছু শিখেছি।’ মডেল ইউনাইটেড নেশনকে মূল্যায়ন করা হয় হবু কূটনীতিক সম্মেলন বা ছায়া জাতিসংঘ সম্মেলন হিসেবে। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি হয়ে আমাদের দেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাই অংশ নেয় এবং নির্ধারিত দেশের সমস্যা, সম্ভাবনা পর্যালোচনা করে দাবিদাওয়া পেশ করে। পুরো আয়োজনটা হয় জাতিসংঘের সদস্য সম্মেলনের আদলে।

নাসায় বিজ্ঞানী হয়ে কাজ করার স্বপ্ন সায়মার। এ জন্য বিজ্ঞানচর্চায় সময় দিচ্ছে। ২০১২ সাল থেকে স্কুল বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নিতে থাকে। প্রতিবারই পুরস্কার জিতেছে তার দল। ২০১৫ ও ২০১৭ সালে বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় তার দলের নেতৃত্ব দেয় সায়মা। দুইবার সায়মার দল যথাক্রমে তৃতীয় ও প্রথম স্থান অধিকার করে অনেক স্কুলের মধ্যে। সায়মার ইচ্ছার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য হওয়া। সায়মা জানায়, সেনাবাহিনীতে কাজ করার জন্যও নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলছে। এ জন্য নিয়মিত শরীরচর্চা ও খেলাধুলার মাধ্যমে নিজেকে ফিট রাখছে।



মন্তব্য