kalerkantho


ঐতিহ্যের আয়নায় স্বদেশ দেখা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কাজলার অকট্রয় মোড়। এখানেই হেরিটেজ আর্কাইভসের অবস্থান। দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের উপকরণ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ২০০২ সালের মার্চ মাসে শুরু হওয়া এই সংগ্রহশালা ঘুরে এসে লিখেছেন আলী ইউনুস হূদয়। ছবি তুলেছেন অন্তর রায়

৮ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



ঐতিহ্যের আয়নায় স্বদেশ দেখা

শ্রাবণের বিকেল। তামান্না, লিনতা ও রায়হানের সঙ্গে দেখা হলো হেরিটেজ আর্কাইভসের প্রধান ফটকে। ওরা রাজশাহী কলেজের ইতিহাস বিভাগে প্রথম বর্ষে পড়েন। শিক্ষকের পরামর্শে এসেছেন এখানে। অ্যাসাইনমেন্টের তথ্য সংগ্রহ করবেন।

ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। পাঁচতলা ভবনের চার হাজার বর্গফুটজুড়ে এই সংগ্রহশালা। নিচতলায় কার্যালয়। ঢুকতেই বাঁ পাশে দর্শনার্থীদের বসার জায়গা। দেয়ালে ব্যানার। বই-পুস্তক, সাময়িকী, ছোট কাগজ, গবেষণা জার্নাল, এমফিল পিএইচডি গবেষণা, আত্মজীবনী ও জীবনী গ্রন্থের এ এক বিপুল সংগ্রহভাণ্ডার।

কথা হলো সংগ্রহশালাটির প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে। তিনি অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। ১৯৮১ সালে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। এর আগে ছিলেন এ বিভাগেরই শিক্ষার্থী। পিএইচডি গবেষণা করেছেন রংপুর জেলার ইতিহাস নিয়ে। গবেষণার সময় উপাদানের সংকটে পড়েন। তাঁকে নিরন্তর ছুটতে হয় ঢাকা, রংপুর ও কলকাতায়। ১৯৯৮ সালে নেদারল্যান্ডসে গিয়ে যেন নতুন আলোর দেখা পান তিনি। ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল হিস্ট্রি আর্কাইভস’ তাঁকে প্রেরণা জোগায়। দেশে ফিরে বিভাগের ছাত্র-শিক্ষকদের নিয়ে নিজ বাড়িতেই শুরু করেন হেরিটেজ আর্কাইভসের যাত্রা। নিজের টাকাই সম্বল। সেটি ২০০২ সালের কথা। ২০০৭ সালের ৭ ডিসেম্বর একতলাবিশিষ্ট একটি ভবনে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় সংগ্রহশালাটির।

তখন থেকে এখানে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করছেন এ কে এম কায়সারুজ্জামান। তিনি রাজশাহীর দুর্গাপুর ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। কায়সারুজ্জামান বলেন, ‘ঐতিহ্য রক্ষার এমন উদ্যোগ দেখে শুরু থেকেই মাহবুব স্যারের সঙ্গে আছি। প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে এটি। শুধু রাষ্ট্রীয় ছুটির দিনগুলোতে বন্ধ। এখানে একসঙ্গে চারজন গবেষক কাজ করতে পারেন। দূর থেকে আসা গবেষকদের থাকার জন্য রয়েছে দুটি বিশেষ কক্ষ। তার জন্য দিনপ্রতি ১৫০ টাকা ভাড়া পরিশোধ করতে হয় তাঁদের।’ আরো জানা গেল, একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ করে হেরিটেজ আর্কাইভ। নাম—‘স্থানীয় ইতিহাস’। এরই মধ্যে ১৮টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে।

সংগ্রহশালা পরিচালনায় ‘আর্কাইভস অব বাংলাদেশ হিস্ট্রি’ ট্রাস্ট গঠন করা হয় ২০০৭ সালে। সাত সদস্যের ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে থাকে গুরুত্বপূর্ণ যত সিদ্ধান্ত। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রয়েছেন আটজন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক। তাঁদের নামমাত্র সম্মানী ও আনুষঙ্গিক খরচ দেওয়া হয়। ট্রাস্টিদের তোলা চাঁদা ও দানে পাওয়া অর্থ থেকেই মেটানো হয় সব খরচ।

সংগ্রহশালার সভাপতি সোহরাব হোসেন জানান, আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর পর দেশ-বিদেশের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি ও গবেষক এখানে এসেছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা প্রায় ৩৪০টি আত্মজীবনী ও জীবনীগ্রন্থ আছে এখানে। স্থানীয় ইতিহাস কর্নারে রয়েছে দেশের সব জেলাসম্পর্কিত বইপত্র। এ কর্নারে আরো রয়েছে অধ্যাপক খন্দকার সিরাজুল হক, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, অধ্যাপক তহমিনা আলম, কবি আবু বকর সিদ্দিক, রাজশাহীর সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা ও নিবেদিতা রায়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহের বই।

তামান্না বললেন, ‘এখানকার স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় অ্যাসাইনমেন্ট-সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু বই পেয়েছি। দেশ-বিদেশের ইতিহাস জানার অনেক বই রয়েছে এখানে। সুযোগ পেলেই আবারও আসতে চাই। পড়তে চাই বইগুলো।’ রায়হান বললেন, ‘শহরে থাকি বলে বইয়ের পাতায় মুদ্রিত ইতিহাসেই আমাদের জানার গণ্ডি সীমাবদ্ধ। কিন্তু এখানে এমন কিছু সংগ্রহ রয়েছে, যা দেখে খুব সহজেই ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব। যেমন—বরেন্দ্র অঞ্চলের বিলুপ্ত সব জাতের ধানের নমুনা সংগৃহীত রয়েছে এখানে। এ ছাড়া জেলা, উপজেলা, মহকুমা, এমনকি গ্রামেরও দুর্লভ ইতিহাসের বই রয়েছে।’

দোতলার সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠতেই চোখে পড়ে সেমিনারকক্ষ। তার পাশে ছোট কাগজ কর্নার। রোববার, বিচিত্রা, দেশ, বেগম, সন্ধানী, মহিলা, সমাচার, অগ্রপথিক, চতুরঙ্গ, উত্তরাধিকার, কালি ও কলমসহ জনপ্রিয় সাময়িকী ও পত্রিকার এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার এটি।

সেমিনারকক্ষের পাশে দেখা গেল, স্বেচ্ছাসেবক রুবিনা খাতুন ক্যাটালগ তৈরির কাজ করছেন। রাজশাহী কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী তিনি। তাঁর কাজ—ক্যাটালগ কল নম্বর ও সিরিয়াল নম্বর যুক্ত করে নতুন সংগ্রহগুলো নির্ধারিত শেলফে রাখা।

সিঁড়ি ধরে তিনতলায় উঠতেই মাথার ওপর প্রগতিশীল ছাত্রজোট, ওয়ার্ল্ভ্রব্যাংক প্রভৃতি পোস্টার চোখে পড়ে। আরো চোখে পড়ে ঘুরতে আসা একজন আলোকচিত্রী ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ছবি তুলেছেন। এখানে রয়েছে কবি আবু বকর সিদ্দিক ও ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের দেওয়া বই-পুস্তকের কর্নার। আর দুর্লভ পোস্টার ও লিফলেটের কর্নারটি রয়েছে দক্ষিণ পাশে। তাতে রয়েছে সাড়ে চার হাজারেরও বেশি পোস্টার। লিফলেট রয়েছে চার হাজার। আরো আছে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর তিন হাজারের বেশি স্মরণিকা।

তিনতলার অন্য এক কোণে চোখে পড়ল পারিবারিক সংগ্রহশালা। পরিবারে ব্যবহূত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সমাহার রয়েছে তাতে। আছে আসবাবপত্র, সরঞ্জাম, চিঠিপত্র, জন্ম সনদ, বিয়ের কার্ড ও চীনামাটির বাসনপত্র, তামা-কাঁসার পাত্র, হুঁকা, কলের গান, পানবাটা, সুরমাদানি, দোয়াত-কলম, অলংকার, ছড়ি, চশমা, বন্দুক—আরো কত কী! সংগ্রাহক মাহবুবর জানান, এই কর্নারটি মূল সংগ্রহশালার অংশ নয়। তবে এর প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে তিনি জানান, ‘বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় যদি এ ধরনের সংগ্রহশালা গড়ে তোলা যায়, তাহলে পারিবারিক ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এ জন্য প্রয়োজন সংরক্ষণের মানসিকতা।’

চোখে পড়ল, গবেষণার কাজে এখানে এসেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হোসনে আরা খানম। তিনি গবেষণা করছেন ‘একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন : জেলাভিত্তিক একটি সমীক্ষা’ বিষয়ে। তিনি বললেন, ‘এখানে গবেষণার প্রয়োজনে জেলাভিত্তিক যে তথ্য পেয়েছি, তা ৬৪টি জেলায় গিয়েও পাইনি। সুবিধার কথা হলো, প্রয়োজনীয় তথ্য ফটোকপি করে নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে এখানে।’

এই সংগ্রহশালাটি আরো সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করতে পারেন যে কেউ। চাইলে ‘হেরিটেজ আর্কাইভস, ৪৫৬/ক কাজলা, রাজশাহী’ ঠিকানায় কুরিয়ার করতে পারেন। এমনকি সরাসরি ০১৭১৬-৭৬০৪৮৫ নম্বরে যোগাযোগ করেও পাঠাতে পারেন। ওয়েবসাইটেও (www.heritage-archives.com) করতে পারেন ভিজিট। সময় পেলে নিজেই ঘুরে আসুন এ সংগ্রহশালায়। ঐতিহ্যের আয়নায় দেখতে পাবেন স্বদেশের ঋদ্ধ মুখ!



মন্তব্য