kalerkantho


চৌকস

সানজাদের ইচ্ছাগুলো

১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



সানজাদের ইচ্ছাগুলো

এ বছর সৃজনশীল মেধা অন্বেষণে জাতীয় পর্যায়ে মাধ্যমিক বিভাগে বিজ্ঞানে সেরা হয়েছে মো. সানজাদ হোসেন। এ ছাড়া বিজ্ঞান প্রজেক্ট, বিতর্ক, বিজনেস আইডিয়া, অলিম্পিয়াডে তার অর্জনের তালিকা বেশ লম্বা। মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর গল্প শোনাচ্ছেন অনয় আহম্মেদ

 

ছোটবেলায় মিরপুরে থাকত সানজাদরা। তখন খেলার প্রতি ভীষণ আগ্রহ ছিল, ইচ্ছা ছিল ক্রিকেটার হবে। সময় পেলেই দুপুর হোক কিংবা বিকেল, মাঠে খেলতে চলে যেত। সানজাদের আপুর আবার খেলাতে শোকেস ভরা পুরস্কার রয়েছে, বিশেষ করে দৌড় প্রতিযোগিতায় তার আপু বিভিন্ন ইভেন্টে চ্যাম্পিয়ন হতো। সানজাদও মনে মনে ভাবত, একদিন খেলাধুলায় তারও অনেক পুরস্কার থাকবে। তবে লিকলিকে শরীরের কারণে স্কুলের বার্ষিক কোনো খেলায়ই ভালো করা তো দূরে থাক, দৌড়াতে গেলেই পড়ে যেত। সানজাদ বলে, ‘প্রাথমিকে পড়ার সময় কোনো কিছুতেই সফল হইনি। এমনকি পড়ালেখায়ও না।’ ২০১৩ সালে মিরপুর ছেড়ে মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনিতে চলে আসে তারা। হঠাৎ করেই পরিচিত হতে হয় নতুন পরিবেশের সঙ্গে। অবশ্য স্বভাবে মিশুক হওয়ায় তাড়াতাড়িই নতুন মানুষজনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছিল সানজাদ। পঞ্চম শ্রেণিতে ভালো ফলও করে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয় মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে। তখনই পরিচিত হয় বিভিন্ন সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে। নোটিশ শুনে দল গঠন করেই প্রথম আন্তঃশ্রেণি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ বক্তা নির্বাচিত হয়। ‘এই খুশি আর থামায় কে? বাসার সবার কাছে সেদিন শুধু নিজের গুণগানই করেছি।’ বলল সানজাদ। কিছুদিন পর বন্ধুদের কাছে জানতে পারে, স্কুলে নাকি বিজ্ঞান মেলা হয়; যেখানে সবাই নতুন নতুন আবিষ্কার নিয়ে যায়। ইচ্ছা থাকলেও ওই মেলায় আর অংশগ্রহণ করা হয়নি সানজাদের। তবে ২০১৫ সালে একদিন এক বড় ভাইয়ের কাছে জানতে পারে, শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজে নাকি একটি সায়েন্স ফেস্ট আছে। এবার সানজাদের মাথায় প্রজেক্ট বানানোর ভূত চেপে বসে। একটি ওয়াল ম্যাগাজিন আর একটি প্রজেক্ট নিয়ে অংশগ্রহণ করে ফেস্টে। পুরস্কার বিতরণের দিন একেবারে পেছনের সারিতে গিয়ে বসেছিল। ‘হঠাৎ করেই এক ভাইয়া এসে বলল, আমার নাম ডাকছে। আমি নিজেও জানি না কিসের জন্য পুরস্কার পেয়েছি! পরে জানলাম, ওয়াল ম্যাগাজিনে প্রথম হয়েছি আর মেকানিক্যাল প্রজেক্টে দ্বিতীয়। আমি তো অবাক! বলে কী! এক দৌড়ে মঞ্চে উঠে পুরস্কার নিয়েছি।’ বলল সানজাদ। আর নিজের স্কুলের বাইরে প্রথম বিতর্কে পুরস্কার পায় ২০১৬ সালে ভিকারুননিসার ডিবেট ফেস্টে।

সানজাদ ‘ক্লবো’ নামে নতুন ধরনের একটি হিউম্যানোইড রোবট বানিয়েছে। আর রোবট প্রজেক্টটি নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বাংলাদেশ রাউন্ডে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ভারতের আইআইটি কানপুরে অনুষ্ঠিত ‘টেককৃতি ২০১৮’-এর ইনোভেশন চ্যালেঞ্জে অংশগ্রহণ করে। সানজাদের মা-বাবার কাছ থেকেও অনুপ্রেরণা পায়। ‘আম্মু সব সময় পড়ালেখাকে প্রাধান্য দিলেও যখন বিভিন্ন প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে আম্মুর হাতে পুরস্কারটি তুলে দিতাম, তখন সামনে খুশির ভাব না দেখালেও আঁচলের পেছনে ঠিকই মুখ লুকিয়ে হাসতেন।’ স্কুলে একদিন এসে জানতে পারল, তার স্কুলের অনিক ভাইয়া ২০১৭ সালে গণিতে ও কম্পিউটারে জাতীয় পর্যায়ে মেধা অন্বেষণে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আর তাকে নাকি পিটিতে সবার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দিয়েছে। সানজাদেরও ইচ্ছা জাগে পিটিতে সবার সামনে কথা বলার। আর এই ইচ্ছাশক্তি তাকে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হতে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। ২০১৮ সালে সৃজনশীল মেধা অন্বেষণে বিজয়ী হওয়ায় তুরস্কে ভ্রমণের সুযোগ পায়। সানজাদের ইচ্ছা, বড় হয়ে ইলেকট্রনিকস ও রোবটিকস নিয়ে কাজ করার।

 

সানজাদের যত অর্জন

♦          ২০১৬ সালে ভিডিসি ন্যাশনাল ডিবেট ফেস্টিভালে বারোয়ারি চ্যাম্পিয়ন। 

♦          ২০১৭ সালে দশম ইউআইইউ ন্যাশনাল ডিবেট ফেস্টিভালে চ্যাম্পিয়ন।

♦          ২০১৭ সালে দ্বিতীয় ন্যাশনাল স্পেস কার্নিভালে অ্যাস্ট্রোনমি ডিবেটে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন ও শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক।

♦          ২০১৭ সালে ‘বুয়েট অটো ফেস্ট’ (বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে) পোস্টার প্রেজেন্টেশনে দ্বিতীয় রানার-আপ।

♦          ২০১৭ সালে জিএসসিডিসি ন্যাশনালসে বিতর্কে চ্যাম্পিয়ন।

♦          ২০১৭ সালে জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় উপস্থিত বক্তৃতায় থানা পর্যায়ে প্রথম।

♦          ২০১৭ সালে বিজনেস ফেস্ট বাংলাদেশ ৩.০-এ বিজনেস আইডিয়ায় রানার-আপ।

♦          ২০১৭ সালে প্রথম ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন অ্যান্ড কালচারাল ফেস্ট প্রজেক্টে চ্যাম্পিয়ন।

♦          ২০১৭ সালে জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াডে আঞ্চলিক পর্যায়ে বিজয়ী।

♦          ২০১৮ সালে ‘সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ’ প্রতিযোগিতায় মাধ্যমিক গ্রুপে বিজ্ঞানে জাতীয় পর্যায়ে সেরা মেধাবী।

♦          ২০১৮ সালে ‘টেককৃতি ১৮’ বাংলাদেশ জোনাল রাউন্ডে ইনোভেশন চ্যালেঞ্জে চ্যাম্পিয়ন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে ইন্ডিয়ার আইআইটি কানপুরে অনুষ্ঠিত ফাইনাল রাউন্ডে এশিয়ার সব দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে অবস্থান সেরা পাঁচে।

♦          ২০১৮ সালে ‘বাউয়েট টেক ফেয়ার’ (বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে)-হার্ডওয়্যার প্রজেক্টে প্রথম রানার-আপ।

♦          ২০১৮ সালে রাজউক ন্যাশনালে বিতর্কে রানার-আপ।

♦          ২০১৮ সালে তৃতীয় ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস জিনিয়াস বাংলাদেশে বিজনেস আইডিয়ায় রানার-আপ।

♦          ২০১৮ সালে ১৮তম ন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি কনফারেন্স ও গ্রিন এক্সপোতে রিনিউয়েবল এনার্জি অলিম্পিয়াডে প্রথম।

♦          ২০১৮ সালে ৩৯তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহে জেলা পর্যায়ের প্রজেক্টে দ্বিতীয় ও তৃতীয়।



মন্তব্য