kalerkantho


‘হাসুক প্রাণ, বাঁচুক আশা’

তিন বছর ধরে ঈদের পোশাক বিলিয়ে চলেছে ‘ফেডো’। কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের সামাজিক এই সংগঠন আরো নানা কাজ করে। তাঁদের নিয়ে লিখেছেন আলী ইউনুস হৃদয়

১৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



‘হাসুক প্রাণ, বাঁচুক আশা’

এই আয়োজনের শুরুটি হয়েছিল ১৮ মে। সেদিন ছিল প্রথম রমজান। বরাবরের মতো সেদিন ইফতার করে, নামাজ পড়ে ফেসবুকে একটি ইভেন্ট পেজ খুলে ফেললেন আহসান শাহরিয়ার ইমন। নাম দিলেন ‘অসহায়, গৃহহীন ও এতিমদের সঙ্গে ঈদ আনন্দ।’ এরপর তাঁর সঙ্গীরা একে একে তাঁদের টাইমলাইনে ইভেন্টটি শেয়ার করলেন। সঙ্গে নিজেদের মনের কথাগুলো লিখে এসব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আবেদন জানালেন। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও অন্যতম সংগঠক সানিউল ইসলাম যেমন লিখলেন—“প্রতিদিন আমরা নানা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে কত টাকাই না খরচ করে ফেলি। সেই হিসাবের ফর্দটাও হাতে গোনা কয়জনই বা রাখি! এক দিনের হিসাবের তালিকা করলে অনেক সময় দেখা যায়, বাজেটের তুলনায় অতিরিক্ত খরচ হয়ে যায়, তাতে কি আফসোস হয় আমাদের? খরচের আগে কতটা খরচ করব, সেই সীমা রেখে খরচের কথা কখনো ভাবি? আচ্ছা, আমরা কি পারি না একটি দিনের খরচ সামান্য কমিয়ে কিছু টাকা অসহায়, গরিব ও পথশিশুদের ঈদের আনন্দের জন্য ব্যয় করতে? যদি পারেন, অনুগ্রহ করে আপনার ভালোবাসা বা অনুদানের হাতটি প্রসারিত করুন। ভালোবাসা, অনুদান কখনো বৃথা যায় না। সেটি কখনো ‘ফেডো’ বৃথা হতে দেবে না।” তাঁদের এই সংগঠন ‘ফেডো’ হলো কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের সংগঠন। তাঁরা সবাই ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েছিলেন। বিভাগের নাম অনুসারে তাঁরা সংগঠনের নামটি দিয়েছেন ‘ফ্রেন্ডশিপ অব অ্যাকাউন্টিং ডিপার্টমেন্ট অর্গানাইজেশন (ফেডো)’। কিভাবে এর শুরুটি হলো, সেই গল্প শোনালেন অন্যতম সংগঠক ইমন, “তখন আমরা শুধু অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ি। ক্লাস শেষে কলেজের শহীদ মিনার চত্বরে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ এক বান্ধবীর ফোনে কল এলো। কথা শেষে সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। ‘কী হয়েছে রে’—জিজ্ঞেস করার পর সে বলল, ‘আমার ফুফু হাসপাতালে ভর্তি আছেন। কিন্তু কোথাও থেকে রক্ত জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। অথচ আর কিছুক্ষণের মধ্যে রক্ত না পেলে তাঁকে বাঁচানো যাবে না। কারণ অপারেশন করা সম্ভব হবে না।’ সঙ্গে সঙ্গে আমরাও কয়েক জায়গায় ফোন করলাম। কিন্তু রক্ত ম্যানেজ করতে পারলাম না। এরপর দেরি না করে এক বন্ধুর পাশে দাঁড়ানোর জন্য, অসহায় একটি প্রাণকে বাঁচানোর জন্য নিজেরাই রক্ত দেব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। রক্ত পরীক্ষা করতে হাসপাতালে ছুটে গেলাম। ‘ও পজিটিভ’ রক্ত আমাদের মধ্যেই পেয়ে আমরাই সেদিন রক্ত দিয়েছিলাম।”

এই একটি কাজই বদলে দিল বন্ধুদের মন। এরপর আজহারুল ইসলাম শিপন নামের সেই দলের এক বন্ধু এ ধরনের সমাজসেবামূলক কাজের জন্য একটি সংগঠনই গড়ে তোলার প্রস্তাব করলেন। এভাবেই জন্ম নিল ‘ফেডো।’ কী কী কাজ করেছেন আপনারা—এই প্রশ্নের জবাবে সানি বললেন, “২০১৫ সালে আমরা প্রথম কুষ্টিয়ায়ই বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কলেজের অনার্সের ছাত্র-ছাত্রীদের রক্তদানে আরো আগ্রহী করতে ও তাদের নিজেদের রক্তের গ্রুপ জানাতে ‘রক্তদান কর্মসূচি’র আয়োজন করেছি। স্কুলের গরিব, অসহায় ছাত্র-ছাত্রীদের নিজেদের তোলা চাঁদা ও ফেসবুক ইভেন্টের মাধ্যমে টাকা-পয়সা জোগাড় করে বই-খাতা কিনে দিয়েছি, যাতে তারা ভালোভাবে লেখাপড়া করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তা ছাড়া কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রাবাসের গরিব ছাত্রদের চলাফেরা ও লেখাপড়ার জন্য আর্থিক অনুদান দিয়েছি। সে জন্য আমরা প্রত্যেকে ১০০ টাকা করে দিয়েছি। কলেজের শিক্ষকদের কাছ থেকে অনুদান নিয়েছি। পরের বছর আমাদের অন্যতম ইভেন্ট ছিল ঈদ পোশাক বিতরণ। ২০১৬ সালে আমরা ঈদুল ফিতরে ৬০ জন পথশিশু ও ছিন্নমূল মানুষের মধ্যে ঈদের পোশাক বিলিয়েছি। এর পর থেকে প্রতিবছরই এই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।”

তাদের জন্য অনুদান কিভাবে জোগাড় করেন—এ প্রশ্নের জবাব দিলেন অন্যতম সদস্য রেহেনা আফরোজ রুম্পা—‘আমরা নিজেরা সাধ্য অনুযায়ী টাকা দিই। তা ছাড়া অনুদান সংগ্রহের জন্য ফান্ড তৈরি করি। কুষ্টিয়ার সরকারি কলেজ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিতদের মাধ্যমে যোগাযোগ করি। তা ছাড়া স্থানীয় চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও প্রবাসী ব্যক্তিদেরও আমরা এখানে সাহায্য করতে অনুরোধ করি। সেই টাকা দিয়েই অসহায়, ঘরহারা পথের মানুষ ও এতিমদের ঈদের পোশাক কিনে দেওয়া হয়।’

‘ফেডো’র এবারের আয়োজনের স্লোগান—‘হাসুক প্রাণ, বাঁচুক আশা।’ টানা ২০ দিন ফোন, ফেসবুক শেয়ারিং, টাইমলাইনে আবেদন ও মানুষের কাছে গিয়ে সাহায্যের জন্য আবেদন করেছেন তাঁরা। সেভাবেই জোগাড় হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। মোট ৩৫ জন মানুষ তাঁদের সাহায্য করেছেন। এই কাজের বিরতিতে ফেডোর বন্ধুরা ছোট ছোট দলে গিয়েছেন কুষ্টিয়ার পোড়াদহ, জাগতি, পূর্ব মাজমপুর রেলগেট, কুমারখালী, বড় স্টেশনবাজার, চর মিলপাড়া, জোতপাড়া ও হাউজিংয়ের সি ব্লক এলাকায়। সেখানে ঘুরে ঘুরে তাঁরা গরিব, ছিন্নমূল মানুষদের তালিকা করেছেন। মোট ৬০ জনকে তাঁরা চূড়ান্তভাবে বাছাই করেছেন ও টোকেন দিয়েছেন। এরপর কুষ্টিয়ার সবচেয়ে বড় পাইকারি কাপড়ের হাট পোড়াদহে গিয়েছেন তাঁরা। সেখান থেকে কিনেছেন বয়স্ক ও বৃদ্ধ নারীদের জন্য শাড়ি আর বয়স্ক পুরুষের জন্য পাঞ্জাবি-লুঙ্গি। ছোট শিশুদের জন্য কেনা হয়েছে ফ্রক ও টি-শার্ট। সংগঠনের রায়হান তপু বললেন, ‘আমাদের ফেসবুক ইভেন্ট পেজ দেখে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিচিত এক বড় ভাই পথশিশুদের জন্য ১৭টি টি-শার্ট দান করেছেন। ১০০ থেকে হাজার টাকাও অনুদান হিসেবে পেয়েছি। বিকাশেও আমাদের কাছে কেউ কেউ টাকা দিয়েছেন।’ তিনি বললেন, ‘কার্যক্রমটির স্বচ্ছতা রাখতে আমরা প্রত্যেকের দানের টাকার পরিমাণ, দানসামগ্রী ইভেন্ট পেজে নিয়মিত আপডেট দিয়েছি।’

ফেডোর সব ধরনের কার্যক্রমে নিয়মিত আর্থিক সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে চলেছেন আনজুম তাসনুভা। তিনি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের সহকারী অধ্যাপক। তাসনুভা বললেন, ‘এক আত্মীয়ের মাধ্যমে আমার ফেডোর অন্যতম সদস্য সানির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তাঁরা এসব কার্যক্রমের পাশাপাশি বন্যার্ত ও শীতার্ত মানুষদের সাহায্য করেন। মানবতা ও সামাজিক জাগরণের কথা বলেন। এসব কারণে আত্মিক মিল পেয়ে আমি তাঁদের নিয়মিত সাহায্য করি।’

ফেডোতে এখন ৪০ জন সদস্য আছেন। তাঁদের ফেসবুক লিংক—Unofficial: FADO- Friendship of Accounting Department Organization। চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন এই নম্বরে—০১৯২২১৪৫৭৪০।



মন্তব্য