kalerkantho

মুক্তমঞ্চে নাটক

তিন দিনের পথনাট্যোৎসব শেষ হলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেটি লিখেছেন আলী ইউনুস হৃদয়। ছবি তুলেছেন অন্তর রায়

১৬ মে, ২০১৮ ০০:০০



মুক্তমঞ্চে নাটক

বরেন্দ্র থিয়েটারের ‘চৌরাস্তা’ নাটকের শেষ দৃশ্য

২৭ এপ্রিল শুক্রবার। ক্লাস, পরীক্ষা নেই বলে শান্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ম্লান বিকেলে অল্প কিছু ছাত্র-ছাত্রী চায়ের দোকানে আড্ডা জমিয়েছেন। প্রায় জনশূন্য এই ক্যাম্পাসে অনেক নাট্যপ্রেমীর ভিড় জমেছে শহীদ স্মৃতি মুক্তমঞ্চে। সেখানে উৎসব হচ্ছে। তিন দিনের এই উৎসবের নাম ‘পথনাট্য উৎসব ২০১৮’। স্লোগান—‘আমরা চলেছি আলোর পথে, মানুষের কথা বলি নাটকের সাথে।’ উৎসবের উদ্বোধন করেছেন রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ড্রামা অ্যাসোসিয়েশনের (রুডা) সাবেক সহসভাপতি কামাল হোসেন। অতিথিদের মধ্যে ছিলেন স্বাধীনতা পদকজয়ী নৃত্যগুরু বজলুর রহমান বাদল, রুডার প্রতিষ্ঠাতা নাট্য সম্পাদক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক সাদেকুল আরেফিন মাতিন ও রাজশাহী থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলাম। উৎসব শুরুর পর অতিথি, নাট্যকর্মী ও দর্শকদের শোভাযাত্রাটি পুরো ক্যাম্পাস ঘুরল। রুডার সভাপতি আকাশ কুমার জানালেন, “আমরা ১৯৮৩ সাল থেকে পথনাট্য উৎসব করছি। ৩৫ বছর ধরে আয়োজিত এই উৎসবের একটিই লক্ষ্য—বাঙালি সংস্কৃতি ধারণ করে অপসংস্কৃতি, ধর্মীয় গোঁড়ামি, মূল্যবোধের অবক্ষয়, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দূর করা। সে জন্য আমাদের স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে, মানুষকে সচেতন করতে সামাজিক অসংগতি তুলে ধরতে হয়েছে। শুরু থেকে আজও আমাদের লক্ষ্য—‘গণমানুষের মুক্তি’। আমরা মানবমুক্তির এই আন্দোলন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেব।” ২৬ এপ্রিল শুরু হওয়া উৎসবে পাঁচটি নাট্যদল অংশ নিয়েছে—রাজশাহীর মহারানী হেমন্ত কুমারী হিন্দু ছাত্রাবাস, পদ্মা-বড়াল থিয়েটার, রাজশাহী কলেজের ‘বরেন্দ্র থিয়েটার’, রাজশাহী থিয়েটার ও রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ড্রামা অ্যাসোসিয়েশন (রুডা)। উৎসবের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার রুডা মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাটক ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ ও মহারানী হেমন্ত কুমারী হিন্দু ছাত্রাবাস ‘চোখে আঙুল দাদা’ প্রদর্শন করে। পরদিন শুক্রবার পদ্মা-বড়াল থিয়েটার ‘সংপাগল’, রুডা ‘মহাবিদ্যা’ ও বরেন্দ্র থিয়েটার ‘চৌরাস্তা’ নাটক নিয়ে হাজির হয়। শেষ দিন শনিবার রুডা ‘কাক চরিত্র’, রাজশাহী থিয়েটার ‘ধম্ম যখন ছোঁয়ালেন হুজুর’ ও রুডা ‘বৌ’ পরিবেশন করে। প্রতিটি নাটকই স্যাটায়ারধর্মী ছিল। দর্শকরা নাটকগুলো আগ্রহ নিয়ে দেখেছেন। বরেন্দ্র থিয়েটারের নাটক ‘চৌরাস্তা’র গল্পটি এমন—এক জেলা শহরের চৌরাস্তায় ‘পরান’ নামের এক ভিক্ষুক ভিক্ষা করেন। সে টাকায় তাঁর ও একমাত্র মেয়ের জীবন চলে। আবার এই চৌরাস্তায়ই সারা শহরের অধিকার আদায়ের আন্দোলন, রাজনৈতিক সমাবেশ, গুণ্ডামি—সব কিছু হয়। একদিন পরান ভিক্ষা করে বাড়ি ফিরছেন, সুধীসমাজের প্রতিনিধিরা তাঁকে তাঁদের সমাবেশে যেতে বললেন, কিন্তু সারা দিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত পরান তাঁদের সঙ্গে যাবেন না, বাড়ি ফিরবেন—এ কথা বলার পর তাঁরা তাঁদের একজনের কাছ থেকে ঋণের টাকা ফেরত দিতে তাঁকে চাপ দিতে লাগলেন। কোনোমতে হাতে-পায়ে ধরে ছাড়া পাওয়ার পর একদল সমাজবিরোধী এসে তাঁকে তাদের সঙ্গে যেতে বলে, কিন্তু তাতেও তিনি রাজি নন। দুই পক্ষের ঝগড়া শুরু হলো। তাদের কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ার পর প্রভাবশালী একজন টাকার লোভ দেখিয়ে তাঁকে দলে নেওয়ার চেষ্টা করে। পরান যাবেন না, মেয়ের কাছে ফিরবেন বলে অনেক কষ্টে ছাড়া পেলেন। পরানকে ধর্মান্ধরাও তাঁদের দলে নিতে চায়। বিভিন্ন দল ও মতের সঙ্গে তাঁর এই এই দ্বন্দ্বে পুলিশ পাশে দাঁড়িয়ে নির্বিকার থেকে শেষে কোনো প্রতিকার না করেই চলে যায়। শেষমেশ সহ্য করতে না পেরে পরান চিত্কার করে বলেন—‘কারো সঙ্গে আমি যাব না, স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই।’ সব পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির আগে ভয়ে সাধারণ মানুষ পরান মড়ার মতো পড়ে থাকেন। বাবার মৃত্যু হয়েছে—এই ভেবে মেয়ের কান্না শুরু হয়। তখন তিনি উঠে বলেন, ‘পরানদের মরলে চলে না রে মা, পরানদের মরার অভিনয় করে জীবন বাঁচাতে হয়।’ এরপর পুরো নাটকের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা একসঙ্গে বলে ওঠেন, ‘ওদের হাতেই নিয়ম-কানুন, ওদের হাতেই আইন; ওরাই করে প্রায়শ্চিত্ত, ওরা করে ফাইন!’ নাটকটির নাট্যকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের বিখ্যাত অধ্যাপক মলয় কুমার ভৌমিক। একই বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ইমরুল আসাদ তুহিন নির্দেশনা দিয়েছেন। মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন রাজশাহী কলেজের মনোবিজ্ঞানের মাস্টার্সের ছাত্র দুলাল সরকার। তিনি বললেন, “ছয় বছর ধরে বরেন্দ্র থিয়েটারে কাজ করি। মলয় স্যারের নাটকে অভিনয়ের অনেক দিনের স্বপ্ন আমার পূরণ হয়েছে। নাটকটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে ২১শে ফেব্রুয়ারি আমাদের কলেজে অভিনীত হয়েছে। সেখানেও ‘পরান’ চরিত্রে অভিনয় করেছি।”


মন্তব্য