kalerkantho


ঘুরে দাঁড়িয়েছেন সাদবী

সাদবী বিন মোরশেদ ঢাকা বোর্ডে এইচএসসিতে সম্মিলিত মেধাতালিকায় ছিলেন ৫৪তম, কিন্তু সারা জীবনের স্বপ্ন আইবিএতে সুযোগ পেলেন না বলে ভর্তি হতে হলো প্রাইভেটে। ইউআইইউর আচার্য স্বর্ণপদকজয়ী ছাত্রটি এখন বিশ্বখ্যাত টয়োটা গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান টয়োটা-টুশো করপোরেশনের এক্সিকিউটিভ। তাঁর জীবনের গল্প লিখেছেন সাইফুল ইসলাম। - ছবি তুলেছেন ইয়ামিন মজুমদার

১৬ মে, ২০১৮ ০০:০০



ঘুরে দাঁড়িয়েছেন সাদবী

বই নিয়ে পড়ে থাকার অভ্যাস খুব একটা ছিল না তাঁর। ছেলেবেলার স্বপ্ন ছিল পাইলট হবেন, বিমান নিয়ে আকাশে উড়বেন। তবে বড় হওয়ার পর সে ইচ্ছা বদলে গেল। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার স্বপ্ন তাঁর ভেতরে বেড়ে উঠল। তখন থেকে সাদবী চাইতেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদে (আইবিএ) পড়বেন। তিনি খুব ভালো ছাত্র ছিলেন। সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজে পড়েছেন। নামকরা এ  স্কুলে স্প্রিন্ট ও লংজাম্পে সব সময় সেরা হতেন। ভালো বেইজ গিটার বাজাতেন। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০১০ সালে জিপিএ ৫ নিয়ে এসএসসি পাস করলেন। ঢাকার অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল থেকে ২০১২ সালে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসিতেও জিপিএ ৫ পেয়েছেন। সেবার ঢাকা বোর্ডে সম্মিলিত মেধাতালিকায় তাঁর অবস্থান ছিল ৫৪! তারপর স্বপ্ন পূরণের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ ভর্তির জন্য প্রস্তুতি শুরু করলেন; কিন্তু টিকলেন না। পরে তিনি আফসোসও করেছেন, লেখাপড়ার জন্য আরো বেশি সময় দিলে হয়তো টিকে যেতেন। তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে লিখিত পরীক্ষায় ভালো করলেন। মৌখিক ভালো হলো না বলে সেখানেও হলো না। পেছন ফিরে তাকিয়ে তাঁর মনে হয়, শুধু আইবিএর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া ও শুধু ঢাকার দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম কেনার ফলে তিনি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারেননি। তত দিনে বন্ধুরা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাণিজ্যের ভালো ভালো বিভাগে ভর্তি হয়ে গেছেন। তাঁদের দেখলেই তাঁর মন খারাপ হয়, ভেঙে পড়েন। ছেলের এই অবস্থা দেখে বাবা মিয়া মোহাম্মদ মোরশেদ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খোঁজ নিলেন। এরপর ছেলেকে বললেন, ‘ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিটি (ইউআইইউ) বেশ ভালো, সেখানে ভর্তি হতে পারো।’ ২০১৩ সালের স্প্রিং সেমিস্টারে তিনি বিবিএতে ভর্তি হলেন। জীবনের এই ভাঙা-গড়ায় তাঁর খেলাধুলার শখটি বিদায় নিল।

ইউআইইউতে লেখাপড়ার পরিবেশ বেশ ভালো। সাদবীও পড়ালেখায় মনোযোগ দিলেন। বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে ব্যবসায় প্রশাসনের বিভিন্ন বিষয় বুঝতে খুব কষ্ট হতো। তার পরও মন দিয়ে পড়ে প্রথম সেমিস্টারে ‘৩.৮৯’ সিজিপিএ পেলেন। আশপাশের অনেকে চারের মধ্যে চার পেয়েছেন বলে মনটি খারাপ হলো। জেদও চাপল, আমিও তাঁদের মতো করে ভালো করব। শিক্ষকরা মেধার পরিচয় পেয়ে তাঁকে ভালো ফল করতে সাহায্য করতে লাগলেন। ইশরাত সুলতানা, ইশরাত জাহান, সায়মা হাসিন, বেহরোজ জলিল, হাসান আল মামুন, মোহাইমেন, সালমা করিম, তাসকিনা আলী, সোহেল স্যারের সাহায্যের কথা ভুলবেন না সাদবী। মনোযোগ দিয়ে পড়ে, শিক্ষকদের সাহায্য নিয়ে দ্বিতীয় সেমিস্টারে তিনি চারের মধ্যে ‘চার’ সিজিপিএ নিয়েই পাস করলেন। সাদবী বলেন, ‘বন্ধুরাও কিন্তু আমাকে খুব সাহায্য করেছে। আমরা দলগতভাবে পড়ে প্রস্তুতি নিয়েছি। আমি তাদের অ্যাসাইনমেন্টগুলো করে দিয়ে মেধাকে আরো শাণিত করার সুযোগ পেয়েছি। তখন আমি এত সিরিয়াস ছিলাম যে যেকোনো সমস্যার সমাধান শিক্ষকদের কাছ থেকে নিয়ে তবেই বাড়ি ফিরেছি। পরীক্ষার দুদিন আগে সব পড়া শেষ করতাম। আগের দিন শুধু দেখে যেতাম।’ দিনের পড়া দিনে শেষ করার যে পুরনো অভ্যাসটি ছোটকাল থেকে তাঁর ছিল, সেটিও এই ভালো ফলাফলের পেছনে খুব কাজে দিয়েছে বলে জানালেন। তবে তৃতীয় সেমিস্টারে অ্যাকাউন্টিং আরো জটিল হয়ে গেল। সাদবী খতিয়ান মেলাতে পারতেন না, জাবেদাগুলো মিলত না। ফলে ‘৩.৮৯’ সিজিপিএ নিয়ে তাঁকে সন্তুষ্ট থাকতে হলো। এরপর আরো চেষ্টার ফলে চতুর্থ থেকে সপ্তম—টানা চার সেমিস্টার সিজিপিএ ‘৪’ পেলেন তিনি। টানা চার সেমিস্টারে সর্বোচ্চ ফলাফলের কারণ? সাদবী হেসে বললেন, ‘যখন যেটা বুঝতাম না বাড়ি ফিরেই সেটির সমাধানের চেষ্টা করে বুঝে নিতাম।’ তবে অষ্টম সেমিস্টারে ইলেকট্রনিক বিজনেস (ই-বিজনেস) নিয়ে তাঁকে বেশ ঝামেলায় পড়তে হলো। ইন্টারনেট ব্যবসার নানা দিক নিয়ে সাজানো বিষয়টি এই কোর্সে অনেক কিছু মুখস্থ করতে হয়েছে। তিনি সহজে কোনো কিছু মুখস্থ করতে পারেন না বলে সেটিতে ফলাফল খারাপ হলো। ফলে আবারও ‘৩.৮৯’। ১২ সেমিস্টার শেষে গড় ‘৩.৯৮’ সিজিপিএ নিয়ে সাদবী বিবিএ পাস করলেন।

এবার ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) অনার্সে সবচেয়ে ভালো ফল করা ছাত্র হিসেবে তিনি চ্যান্সেলর্স গোল্ড মেডেল (আচার্যের স্বর্ণপদক) পেয়েছেন। অসাধারণ এই ফলের মাধ্যমে সাদবী আগের সব দুঃখ ভুলে গেলেন। পঞ্চম সমাবর্তনে তিনি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সামনে সব ছাত্র-ছাত্রীর হয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। সেদিন কিভাবে তাঁকে এই ফলের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সাহায্য করেছেন, নানা প্রতিকূলতায়ও মা সৈয়দা নাজনীন ফেরদৌসী সাহস জুগিয়েছেন—সবই বলেছেন।

শেষ সেমিস্টারে তিনি ‘জুয়েলিগ ফার্মা’র মার্কেটিং বিভাগে শিক্ষানবিশ অফিসার হিসেবে ইন্টার্ন করেছেন। এখন তিনি বিশ্বখ্যাত টয়োটা গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান টয়োটা-টুশো করপোরেশনের টেক্সটাইল মেশিনারিজ বিভাগের এক্সিকিউটিভ। গিটার বাজানোর পুরনো শখটিও আছে। ‘আপেক্ষিক’ নামের ব্যান্ডদলে তিনি বেইজ গিটারিস্ট। ভবিষ্যতে কোনো এক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করার স্বপ্ন দেখেন, সারা জীবনের সুখ-দুঃখের সঙ্গী মা-বাবাকে সুখী করার ইচ্ছা তাঁর।



মন্তব্য