kalerkantho


কর্মমুখী শিক্ষার অনন্য বিশ্ববিদ্যালয় ‘বিইউবিটি’



কর্মমুখী শিক্ষার অনন্য বিশ্ববিদ্যালয় ‘বিইউবিটি’

গতানুগতিক খাতা-কলমের লেখাপড়া নয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি) কর্মমুখী শিক্ষাদান করে চলেছে। ধূমপানমুক্ত ক্যাম্পাসটি সিসিটিভিতে ঘেরা, শিক্ষকরাও শিক্ষার্থীদের উন্নয়নের নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। লেখাপড়ার খরচও তুলনামূলকভাবে কম। এই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এবারের বিশেষ আয়োজন। সহকারী রেজিস্ট্রার (জনসংযোগ) জিসান আল যুবাইরের সহযোগিতা নিয়ে লিখেছেন আদীব মুমিন আরিফ

 

২০০৩ সালে যাত্রা শুরু করেছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়। তবে অন্য সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নয়, ব্যবসায় ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৫ বছর আগে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল মাত্র ৬৭ জন ছাত্র-ছাত্রী, এখন সেখানে আছেন প্রায় ১০ হাজার ছাত্র-ছাত্রী। তাঁদের জন্য আছেন ৩০০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা। বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম ‘বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি)’। ঢাকার মধ্যেই এর স্থায়ী ক্যাম্পাস। ঠিকানা হলো—রূপনগর, মিরপুর-২, ঢাকা-১২১৬। এই এলাকায় সহজেই আসা-যাওয়া করা যায়। সাত একর জমিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম তিনটি বিশাল ভবনে পরিচালনা করা হচ্ছে। আছে ছয়টি অনুষদ। সেগুলো হলো—ফ্যাকাল্টি অব বিজনেস, ফ্যাকাল্টি অব আর্টস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ, ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেস, ফ্যাকাল্টি অব ল, ফ্যাকাল্টি অব সোশ্যাল সায়েন্সেস এবং ফ্যাকাল্টি অব ম্যাথমেটিক্যাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্সেস। ফ্যাকাল্টি অব বিজনেসের অধীনে অ্যাকাউন্টিং, ম্যানেজমেন্ট, ফিন্যান্স, মার্কেটিং ও হিউম্যান রিসোর্স বিষয়ে অনার্স ডিগ্রি লাভের সুযোগ আছে। এ অনুষদের অধীনে ‘মাস্টার্স’ ডিগ্রি হিসেবে এক্সিকিউটিভ এমবিএ ও মাস্টার্স অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট ডিগ্রি দেওয়া হয়। ফ্যাকাল্টি অব আর্টস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজের অধীনে ইংরেজিতে বিএ ও এমএ এবং ইংলিশ লিটারেচার অ্যান্ড ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ টিচিংয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি দেওয়া হয়। ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেসের অধীনে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং এবং টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অনার্স ডিগ্রি দেওয়া হয়। ফ্যাকাল্টি অব ল’র অধীনে এলএলবিতে অনার্স এবং এক ও দুই বছরের ‘এলএলএম’ মাস্টার্স ডিগ্রি দেওয়া হয়। ফ্যাকাল্টি অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের অধীনে অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স এবং এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকসে অনার্স ডিগ্রি দেওয়া হয়। ফ্যাকাল্টি অব ম্যাথমেটিক্যাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্সেসের অধীনে গণিতে এক বছর ও দুই বছরের (জেনারেল ও থিসিস) মাস্টার্স ডিগ্রি দেওয়া হয়। এভাবে বিইউবিটিতে মোট ১২টি বিষয়ে অনার্স ও ৯টি বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আবু সালেহ বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠাতারা সবাই শিক্ষাবিদ। তাঁরা সাধারণ পরিবারের ছাত্র-ছাত্রীদের অল্প খরচে, উন্নত মানের উচ্চশিক্ষা দানের জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, একে অলাভজনক কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কল্যানকর বিশ্ববিদ্যালয় করা। সেই লক্ষ্যে শুরু থেকেই আমরা গুণগতমানের শিক্ষাদান করে চলেছি। ১২ থেকে ১৫ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রী টিউশন ফিতে নানা ধরনের বৃত্তি ও শতভাগ ওয়েইভার বা ছাড় নিয়ে পড়ালেখা করছে।’ গুণী শিক্ষকের এই কথার সঙ্গে পুরোপুরি একমত হলেন বিবিএর আনোয়ার হোসেন। সপ্তম সেমিস্টারের এই ছাত্র বললেন, “অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য হলো—বিইউবিটিতে লেখাপড়ার খরচ তুলনামূলকভাবে কম এবং সিজিপিএ চারের মধ্যে ‘চার’ পেলে শতভাগ শিক্ষাবৃত্তি হিসেবে পুরোপুরি বিনা বেতনে লেখাপড়া করা যায়।” তবে বিইউবিটিতে লেখাপড়ার পদ্ধতি ও পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় খুবই কড়াকড়ি রয়েছে। এমবিএর ছাত্রী শাকিলা হক বলেন, “আমাদের ‘সেট’ হিসেবে পরীক্ষা নেওয়া হয়। শিক্ষকরা খুব কড়া। কোনো কোনো শিক্ষক তো ৩০ জন ছাত্র-ছাত্রীর জন্য ৩০ সেট প্রশ্ন নিয়ে আসেন, যাতে কারো সঙ্গে কারো প্রশ্ন না মেলে। দেখাদেখি বা নকলের সুযোগ নেই।” তিনি আরো বলেন, ‘শ্রেণি উপস্থিতির বিষয়ে কর্তৃপক্ষ খুব কড়া। ছাত্র-ছাত্রীদের ৯৫ শতাংশ বা তার চেয়ে বেশি শ্রেণি উপস্থিতির জন্য পাঁচ নম্বর সেমিস্টার ফাইনালে যোগ করা হয়।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মিঞা লুত্ফার রহমান বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখার জন্য সুষ্ঠু ও নিরিবিলি পরিবেশ নিশ্চিত করেছি। মাদকসেবন, ধূমপান বা অযথা হট্টগোল যেন কেউ করতে না পারে, সে জন্য পুরো ক্যাম্পাস সিসিটিভির অধীনে নিয়ে আসা হয়েছে। আমরা নিয়মিত শ্রেণিকক্ষ, খেলার স্থানসহ সব স্থান পরিদর্শন করি। ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা বিপথে যেতে পারে না।’ সুন্দর ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে লেখাপড়া করে ছাত্র-ছাত্রীরা পাশ করে গেলেও তাঁদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মন পোড়ে। পুরনো ও বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি এবং যোগাযোগ রক্ষার জন্য ‘বিইউবিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন’ আছে। অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ এইচ এম আজমল হোসেন বললেন, “বিইউবিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো—সাবেকদের হাত ধরে যেন বর্তমান ও ভবিষ্যতের ছাত্র-ছাত্রীরা ভালো ভালো কর্মক্ষেত্রে যোগদানের সুযোগ পায়। আমরা ক্যারিয়ার কার্নিভালের আয়োজন করি, বনভোজনে যাই। অ্যাসোসিয়েশনের গরিব ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ‘বৃত্তি তহবিল’ গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।” এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সেরা বিভাগ কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আমীর আলী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগে লেখাপড়ার ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। কর্মমুখী বিশ্ববিদ্যালয় বলে আমরা ব্যাবহারিক শিক্ষাদানের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। বাংলাদেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিইউবিটি’র কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে শিল্প-কারখানাবিষয়ক চারটি ব্যাবহারিক কোর্স পড়ানো হয়। ফলে সেসব প্রতিষ্ঠানের কাজ সম্পর্কে ছাত্র-ছাত্রীরা জ্ঞান লাভ করে, তাদের কর্মাভিজ্ঞতা তৈরি হয়, ভবিষ্যতে সেগুলোতে তারা কাজ করার সুযোগ পায়। তা ছাড়া ব্যাবহারিক লেখাপড়ার অংশ হিসেবে এই বিভাগে ১১টি সমৃদ্ধ গবেষণাগার রয়েছে। আমাদের  ৪৫ জন শিক্ষক আছেন। শুধু এখানে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে লেখাপড়া করে অনেক ছাত্র-ছাত্রীই বিদেশে মাস্টার্স, গবেষণা ও পরে পিএইচডি করেছে।’ এই বিভাগটি সহশিক্ষা কার্যক্রমে এগিয়ে আছে। বিভাগের চেয়ারম্যান জানালেন, কিছুদিন আগে তাঁদের উদ্যোগে ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের সহযোগিতায় ঢাকা মহানগরের সাতটি থানার পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে ‘সাইবারক্রাইম ইনভেস্টিগেশন’-এর কর্মশালা করা হয়েছে। তাতে যেমন পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের কম্পিউটার সম্পর্কীয় অপরাধগুলোর ব্যাপারে জ্ঞান ও সেগুলো রোধের দক্ষতা তৈরি হয়েছে, তেমনি শিক্ষকদেরও বাংলাদেশে প্রচলিত কম্পিউটারনির্ভর অপরাধ সম্পর্কে জানা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার (জনসংযোগ) জিসান আল যুবাইর বললেন, ‘বিইউবিটিতে টেক্সটাইল বিভাগের ১২টি আধুনিক ল্যাবসহ মোট ৪২টি ল্যাব রয়েছে। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং, ইংরেজি ও আইন বিভাগের আলাদা ল্যাব আছে।’



মন্তব্য