kalerkantho


আদমজীতে ন্যাশনাল কার্নিভাল

রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে অনুষ্ঠিত হলো এসিসি ন্যাশনাল কার্নিভাল ২০১৮। ঘুরে এসে জানাচ্ছেন জুবায়ের আহম্মেদ

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আদমজীতে ন্যাশনাল কার্নিভাল

কালচারাল ক্লাবের পরিবেশনা

শুক্রবার সকাল ১০টা। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই লক্ষ্য করলাম অনেক সুন্দর করে সাজানো হয়েছে পুরো কলেজ এলাকা। প্রশাসনিক ভবনের সামনে দিয়ে মাঠে প্রবেশ করার সময় নজর কাড়ল ভ্যানের ওপর খুদে একটা ঘর। সামনে একটি কাগজে লেখা গ্রিন ফ্যাক্টরি। ঘরটিতে বেশ কিছু টব। কোনো কোনোটা ঝুলিয়ে রাখা। টবগুলোতে ছোট ছোট উদ্ভিদ। পাশেই নেচার ফেস্টের আরো নানা ধরনের প্রজেক্ট। হাঁটতে হাঁটতে চোখ গেল একটি ভিন্ন রকমের প্রজেক্টের দিকে। একটি চৌবাচ্চায় পানির নিচে উদ্ভিদের ফাঁক-ফোকর দিয়ে কিছু মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে। ‘পানির নিচে চাষাবাদ’ নামে প্রজেক্টটি বানিয়েছে তিন বন্ধু—শাহরিয়ার, তাহফিজুল ও আরাফাত। সবাই শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। প্রজেক্টটি নিয়ে কৌতূহল হলো। জানতে চাইতেই শাহরিয়ার বলল, ‘পানির নিচে যেসব উদ্ভিদ বাস করতে সক্ষম তাদের ডিএনএ নিয়ে অন্য উদ্ভিদে (যেমন ধানে) স্থানান্তর করে রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তির মাধ্যমে ওই উদ্ভিদকে পানির নিচে বসবাসের উপযোগী করে তোলা যায়। একই সঙ্গে বিলুপ্তপ্রায় মাছের প্রজননের অভয়াশ্রম হিসেবেও ব্যবহার করা যায় জায়গাটিকে।’

তায়কোয়ানদো প্রতিযোগিতা

নেচার ফেস্টের প্রজেক্ট দেখতে দেখতে দেখা হলো ফায়েদ মাহমুদ সার্থকের সঙ্গে। এবার তার সঙ্গেই পুরো কার্নিভাল ঘুরে দেখা শুরু করলাম। বিবিএ বিল্ডিংয়ের তৃতীয়তলায় হচ্ছে বিতর্ক প্রতিযোগিতা। যুক্তির লড়াইয়ে একে অন্যকে পরাজিত করার তীব চেষ্টা চলছে। বাংলা বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ১৬টি স্কুল থেকে ১৮টি দল এবং ১৮টি কলেজ থেকে ২৪টি দল অংশগ্রহণ করে। এ ছাড়া ইংরেজি বিতর্ক প্রতিযোগিতাও ছিল। ওপরের তলাগুলোতে বিভিন্ন অলিম্পিয়াড ও কুইজ প্রতিযোগিতা হচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় কথা হলো সর্দার আফসান সাকিনের সঙ্গে। সে কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। এদিকে বিবিএ বিল্ডিংয়ের নিচতলার একটি কক্ষে হচ্ছে গেমিং কম্পিটিশন। প্রদর্শনী দেখতে আসা হাসিব মামুর বলল, ‘পুরো কার্নিভালটি বেশ ভালো লেগেছে। অনেক ক্লাবের ফেস্ট একসঙ্গে হওয়ায় একটি ফেস্ট দেখতে এসে সব উপভোগ করতে পেরেছি।’ ফেস্টগুলো ঘুরে দেখতে দেখতে যখন কিছুটা ক্লান্ত, যাচ্ছিলাম ক্যান্টিনের দিকে। বটতলায় গিয়ে দেখতে পেলাম তায়কোয়ানদো প্রতিযোগিতা হচ্ছে। দাঁড়িয়ে থেকে অনেকক্ষণ প্রতিযোগিতাটি উপভোগ করলাম। জানতে পারলাম, এবারই প্রথম কোনো কলেজে এ ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। ২১টি স্কুল-কলেজের প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী এতে অংশগ্রহণ করেছে। বিচারকাজ পরিচালনা করেন বাংলাদেশ তায়কোয়ানদো ফেডারেশন থেকে আসা ১০ জন বিচারক।

গ্রিন ফ্যাক্টরি

ক্যান্টিন থেকে ফেরার সময় বিজনেস ক্লাবের মাহির সঙ্গে দেখা। মাহিকে বললাম, এসো একটু ঢু মেরে আসি বিজনেস ফেস্টে। প্রজেক্টগুলো ঘুরে ঘুরে দেখার সময় একটি প্রজেক্ট খুব ভালো লাগল। তৌসিফ, শাকিব ও ইফাজ—তিন বন্ধু মিলে ‘টু ইন ওয়ান’ নামে প্রজেক্ট নিয়ে বসেছে। জানতে চাইতেই বলল, ‘প্রজেক্টের মূল বিষয়বস্তু হলো জনবসতিপূর্ণ যেকোনো এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে এতে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করা। কেউ খাবার লাগলে অ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার দেবে এবং অর্ডার অনুযায়ী জিনিস তারা কাস্টমারের বাসায় পৌঁছে দেবে। এ ছাড়া ছাদে শাকসবজির চাষ করা হবে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে, তারপর বড় বড় সুপার শপে সরবরাহ করা হবে তা। পাশেই বিজনেস ফেস্টের ওয়াল ম্যাগাজিন বা দেয়াল পত্রিকার প্রদর্শনী হচ্ছিল। প্রায় ৩০০টির মতো দেয়াল পত্রিকা স্থান পায় প্রদর্শনীতে। কথা হয় কার্নিভাল দেখতে আসা ইজাজের সঙ্গে। সে বলল, ‘কার্নিভালের সাজসজ্জাটা অসাধারণ। বিজনেস ফেস্টের প্রজেক্টগুলো ভালো হয়েছে।’

আইটি ফেস্টের প্রজেক্ট

এবার আর্ট ফেস্টিভালের ওয়াল ম্যাগাজিনগুলো ঘুরে ঘুরে দেখলাম। এই ফেস্টে প্রায় ২০০-র বেশি শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। আর্ট ক্লাব কলেজ সাজসজ্জায় সাহায্য করেছে। সায়েন্স ফেস্টে ‘ট্রাফিক অ্যান্ড অ্যাকসিডেন্ট রিডিউসিং’ নামে প্রজেক্ট নিয়ে এসেছে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার তূর্য ও তার দল। ট্রাফিক জ্যাম ও অ্যাকসিডেন্ট কমাতে তাদের এই মডেল। আবার এতে গতিশক্তি ব্যবহার করে ল্যাম্প পোস্টে যে লাইট জ্বালানো সম্ভব তাও দেখানো হয়েছে। পুরো কার্নিভাল ঘুরে এবার এলাম রুমী মঞ্চে। ঢুকতেই ছোট একটি গেইট সাজানো। শহীদ মিনারের সামনে ছবির ফ্রেমগুলো ঝোলানো। দর্শনার্থীরা ঘুরে ঘুরে দেখছে। করছে চুলচেরা বিশ্লেষণও। গুনগুনিয়ে এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বলছে, ‘দ্যাখ, ছবিটি জোশ হয়েছে।’ বুঝতে পারলাম আলোকচিত্র প্রদর্শনী চলছে। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ ফটোগ্রাফি ক্লাবের আয়োজনে চলে এই প্রদর্শনী। মোট ৩৯টি ছবি প্রদর্শনীতে স্থান পায়। এতে বিচারক হিসেবে ছিলেন কুদরত ই খুদা (কাজল)। সেরা আলোকচিত্রীর পুরস্কার পায় জারিন তাসনিম মনিসা। প্রদর্শনী স্থান পাওয়া ছবিগুলো নিয়ে একটি ফটো বুক তৈরি করে ফটোগ্রাফি ক্লাব। ফটোগ্রাফি ক্লাবের মডারেটর ও ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘কলেজপর্যায়ে কার্নিভালের গুরুত্ব রয়েছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে ফেস্ট হলে বেশ কিছুটা সময়ের অপচয় হয়। ফলে সব ক্লাবের ফেস্ট একসঙ্গে হওয়ায় সময় বেঁচেছে।’ পুরো কার্নিভালটির আহ্বায়ক ছিলেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. গোলাম ফারুক।

ছবি : নাফিজ ও সার্থক

 

একনজরে কার্নিভাল

২২ থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে অনুষ্ঠিত হয় ‘এসিসি ন্যাশনাল কার্নিভাল-২০১৮’। আদমজী ক্যন্টনমেন্ট কলেজের ১৪টি ক্লাবের ফেস্টিভাল একসঙ্গে আয়োজন করা হয় এখানে। তবে সব স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাই এতে অংশ নিতে পারে। অন্যান্য বছর বিভিন্ন ক্লাব ফেস্ট আলাদা আলাদা করে আয়োজন করা হতো। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ আহমেদ আলীর (পিবিজিএম, এনডিসি) আইডিয়ায় এত ফেস্ট একসঙ্গে আয়োজন করা হয়। কার্নিভালের উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের প্রায় সাড়ে চার হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে এতে। সায়েন্স ফেস্টের ইভেন্টের মধ্যে ছিল প্রজেক্ট ডিসপ্লে, অলিম্পিয়াড, ওয়াল ম্যাগাজিন, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি লেখাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতা। আইটি ফেস্টে ফিফা, আইটি প্রজেক্ট, প্রগ্রামিং, গ্রাফিকস ডিজাইনসহ বেশ কয়েকটি ইভেন্ট ছিল। আলোকচিত্র ফেস্টিভালে ছিল ফটোগ্রাফি অলিম্পিয়াড, ওয়ার্কশপ ও প্রদর্শনী। ডিবেট ইভেন্টের মধ্যে বাংলা ও ইংরেজি ডিবেট। আর্ট ইভেন্টের মধ্যে ওয়াল ম্যাগাজিন, স্ক্যাচ কম্পিটিশনসহ অন্যান্য প্রতিযোগিতা। নাচ, গান, অভিনয়—এই তিন বিষয়ে প্রতিযোগিতা হয় কালচারাল ফেস্টিভালে। সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ইভেন্টের মধ্যে অন্যতম ছিল সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার আইডিয়া উপস্থাপন প্রতিযোগিতাটি। এ ছাড়া কুইজ, তায়কোয়ানদো, স্টোরি রাইটিং, নেচার ফেস্টের ইভেন্টসহ অনেক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। কার্নিভালে বিজয়ীদের সর্বমোট প্রায় ৬৫০টি পুরস্কার দেওয়া হয়। কার্নিভালের পর্দা নামে ২৪ ফেব্রুয়ারি। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মেজর জেনারেল আবু সাঈদ মো. মাসুদ (বিএসপি)।



মন্তব্য