kalerkantho


তুমি আমার কত চেনা

একজন পড়েন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে, অন্যজন কলেজে। গল্পের চেয়েও সত্যি তাঁদের সেই প্রেমের গল্প লিখে পাঠিয়েছেন স্বপ্নীল মাহফুজ

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



তুমি আমার কত চেনা

কোচিং ক্লাসে ঢুকতেই হঠাৎ একটি মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ছেলেরা পেছনে বসবে, আমরা সামনে।’ ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে রূপবতী সেই মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘তোমাদের রসায়নের প্রথম ক্লাসটি আমি নেব।’ তার মুখটি লাল হয়ে গেল। ভেবেছিল, আমি তারই মতো কোনো ছাত্র! পড়ানোর ফাঁকে কখনো কখনো আপনাতেই সেই ছাত্রীর দিকে চোখ গেল। বেশ স্নিগ্ধ একটি মুখ। কখনো সে মাথা নামিয়ে ফেলছে, কখনো অপলকে চেয়ে আছে। হঠাৎ মনে হলো, আচ্ছা ওর নাম কী? আগে কোনো দিনও কোনো ছাত্র বা ছাত্রীর নাম জানতে চাইনি। ক্লাস শেষে সবার নামটি একে একে জেনে নিলাম। জানা হলো, নামটি ‘ইউশা ফারিয়া’। এই নাম তো কোনো দিন শুনিনি। নামটিও ভালো লেগে গেল। সেটি ছিল তাদের এইচএসসির বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম ক্লাস। আমি তখন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট), সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম বর্ষের শেষ সেমিস্টারের ছাত্র।

বাসায় ফিরে শেষ পরীক্ষার জন্য পড়তে লাগলাম। আমাদের পড়ালেখা, ক্লাস আবার কড়া শিডিউলে বাঁধা। আধঘণ্টা পড়েই মন উঠে গেল। মোবাইলের ফেসবুক ওপেন করলাম। ঘেঁটে ঘেঁটে ওকে পেয়েও গেলাম। তবে আশ্চর্য হয়ে গেলাম—ও লিখেছে, ‘এইচএসসির প্রথম ক্লাস করলাম আজ, স্বপ্নীল স্যারের ফ্যান হয়ে গেলাম প্রথম ক্লাসেই।’ নানা ধরনের বাস্তব উদাহরণ দিয়ে পড়াই বলেই হয়তো এটি লিখেছে। তার পরও মনটি একটু দুলে উঠল। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিতে একটুও দেরি হলো না। কিছুক্ষণ পরে সে অ্যাকসেপ্ট করল। এই খুশিতে পড়ার কথা বেমালুম ভুলে গেলাম। কিছুক্ষণ ওর ছবি দেখলাম, তারপর পড়তে বসলাম। অন্য দিন গভীর রাত পর্যন্ত পড়ালেখা করি। আজ আর হলো না। ১১টার মধ্যে পড়ালেখা শেষ করে খেয়েদেয়ে ফেসবুক নিয়ে বসে গেলাম। ততক্ষণে মেসেজ এসে গেছে—‘সরি ভাইয়া, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দেরিতে অ্যাকসেপ্ট করার জন্য।’ ‘না, আপু, আমি তো আজই রিকোয়েস্ট পাঠালাম।’ ‘আজ!’ এরপর আলাপে আলাপে রাত ভোর হয়ে গেল। কখন ঘুমিয়েছি মনে নেই, উঠে দেখি দুপুর ১২টা!

পরদিন মেসেঞ্জারে ছাত্রী জানাল, “আমাদের একটি ইউটিউব চ্যানেল আছে ‘নাম হোয়াট ডি ফিশ’। নানা মজার মজার ভিডিও আপলোড করি সেখানে।” এরপর ইউশা ওর অস্ত্র ছুড়ল, ‘চ্যানেলটি নিয়ে আমাদের খুব আশা, কিন্তু ক্যামেরার জন্য ভিডিও বানাতে পারছি না।’ ‘আমার ডিএসএলআর নিয়ে যাও।’ ‘আপনি আমাদের সঙ্গে আসুন না।’ গেলাম। কিন্তু বন্ধুরা বলল, তিনি তো আমাদের চেয়ে বড়। নেব কেমন করে? ইউশার পাল্টা জবাব, ‘স্বপ্নীল ভাইয়াকে না নিলে আমিও থাকব না।’ ফলে ঢুকে পড়লাম ওদের দলে। পরদিন ক্লাস শেষে বলল, ‘আপনার দুটি গল্পের বই আমার কাছে আছে।’ পুরো ক্লাসের ছেলে-মেয়েরা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। ইউশা অবলীলায় ব্যাগ থেকে বের করে দিল—‘দেবী’ ও ‘নিশীথিনী’!

পরীক্ষার আগের দিন রাতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি সাত রাস্তার মোড়ে। হঠাৎ ফেসবুকে ছাত্রীর আদেশ—‘বাসায় গিয়ে এখনই পড়তে বসুন!’ যাক, ওর মনে আমি ঢুকে পড়তে পেরেছি! চলে গেলাম বিদায় নিয়ে। পরীক্ষাও শেষ হলো, ফেসবুকে আলাপও জমে উঠেছে। মাঝে কোয়ান্টামের কোর্স করতে ঢাকায় গেল ও। অভিভাবকের শাসন পেরিয়ে রাতভর আমার সঙ্গে মেসেজ চালাচালি করল। মনে হলো, হয়তো ভালো কিছু অপেক্ষা করছে।

তবে ফেরার পথে হঠাৎ জানাল, ‘আমার তো এক ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, সরি, কথাটি আপনাকে এত দিন বলা হয়নি।’ মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল! আরে এক দিন আগে সারা রাত কথা বলেছে আর এখন বলছে, বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। মেয়েরা সত্যিই খুব অদ্ভুত! বারবার মেসেজ দিই—‘সত্যি বলছ?’ প্রতিবারই এক উত্তর, ‘মিথ্যা বলব কেন?’ ফোন করলে ধরে না। আজব! দূর, কার পিছে সময় দিলাম, প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার আগেই বলে, বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে! হঠাৎ মনে হলো, বিদায় নেওয়ার আগে অন্তত ভালোবাসার কথাটা একবারের জন্য হলেও বলে ফেলি। ‘ইউশা, আই লাভ ইউ’ শুনে ওর একটিই প্রশ্ন—‘মানে কী?’ ‘কোনো মানে নেই, আমি আমার মনের কথা বলে দিয়েছি।’ এবার আর থাকতে পারল না—‘আমি তো আপনাকে খ্যাপানোর জন্য বিয়ের কথাটি বলেছিলাম!’ ‘আসো তুমি খুলনায়’—এই বলে ফোন কেটে দিলাম।

মেয়ে খুলনায় এলো, দেখাও হলো। কিন্তু ঝগড়ার বদলে আমরা নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। প্রতিদিন সকাল ৮টায় আমার ক্লাস, ওরও তা-ই। কুয়েটে না গিয়ে তাদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকি। ও আসে। দুজন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়াতে যাই। চায়ের দোকানে বসে আকাশ দেখি, জুসের দোকানে জুস খাই। কোনো দিন কলেজে গেলেও সে বিকেলের কোচিং ফাঁকি দেয়, আমারও ক্লাস নেওয়া হয় না। প্রায়ই এটা-সেটা নিয়ে লেগে যায়, ‘সরি’ বলে আমিই থামাই।

কখনো কখনো দুজনের ছবি আপলোড দিই। ফেসবুকে বন্ধুরা লাইক দেয়, কমেন্ট করে। ফলে বিষয়টি রাষ্ট্র হতে দেরি হলো না। কোচিং থেকে বলা হলো, ওদের ক্লাসটি আপনার আর না নিলেই ভালো। ইউশার সঙ্গেও ওর মায়ের একচোট হয়ে গেল। মা বললেন, ‘বাসায় খবর আসে, তুই কুয়েটের একটা ছেলের সঙ্গে ঘুরে বেড়াস। আমাদের তো মাথা কাটা যায়।’ মেয়ের পাল্টা জবাব, ‘লোকের কাজই তো উল্টাপাল্টা বলা, আমি তো অন্যায় কিছু করছি না। তিনি আমার স্যার, পড়া বুঝে নিই।’ মেয়ের সঙ্গে না পেরে মা চুপ মেরে যান। তবে আমাদের বেড়ানো থামে না। দুর্গাপূজার মহানবমীর দিন মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরব—আগেই ঠিক করা ছিল। তবে সকালে আবার মা-মেয়ের একদফা হয়ে গেল। তা-ও সে এলো। আমরাও বেড়ালাম। ফেরার পথে সন্ধ্যায় রিকশায় উঠব, তখন তার সেকি কান্না—‘আমি আর ও বাসায় যাব না। সারাক্ষণ খোঁটা দেয়, আপনি থাকলে থাকেন, না হলে আমি যেদিকে পারি চলে যাব। কোথায় যাব জানি না। কিন্তু ওই বাসায় আর ফিরব না।’ ‘এখনো বাসায় বলিনি, কিভাবে বাসায় নিয়ে যাই, বলো?’ যতই বোঝাই, বেচারি শুধু ফোঁপাতে থাকে। কী করি? বাড়ি নিয়ে গেলে মা-বাবা তো মেনে নেবেন না। উপায়? এক বড় ভাই আছেন ঢাকায়। খুব পরিচিত। তাঁর কাছে যাওয়া যেতে পারে। এক ছাত্রকে ফোন করে তার কাছে টিউশনির পাওনা হাজার পাঁচ আর পকেটের দেড়-দুই মিলিয়ে বাসে চড়ে বসলাম। ইউশা ব্যাগ ঘেঁটে পেল মোটে ৮৩ টাকা!

বাসে চড়ে বসলাম দুজনে। প্রথম একসঙ্গে ঘোরার আনন্দে গল্প চলছেই। ওদিকে বাড়ি থেকে একের পর এক ফোন আসছে। আগেই জানতাম, খুঁজবে। ফলে খুলনা বাসস্ট্যান্ড থেকে না উঠে আমাদের কুয়েটের পাশের বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে উঠেছিলাম। দুজনের কেউই ফোন ধরিনি। তবে মালিবাগ বাস থামতেই আবার কান্না শুরু করল ও। বাড়ির জন্য মন খারাপ লাগছে। ভোর থেকে শুরু করেছে। আমারও খুব মন খারাপ হয়ে গেল। বন্ধুদের ফোন করে সকালের বাসের খোঁজ নিয়ে গাবতলীতে এসে দেখি—খালু, খালাতো ভাই-বোনরা সবাই আমাদের রিসিভ করতে দাঁড়িয়ে আছে। খালু নিজে আমাদের সঙ্গে বাড়ি চলে এলেন। সবাই আমাদের বাসায় এলাম। ওর পরিবারের সবাইও এলেন। ও বাড়ির বড় মেয়ে আর আমি একমাত্র সন্তান—ইচ্ছামতো বিয়ে দিতে না পারার দুঃখে দুই মা-বাবা বেশ কিছুক্ষণ চোটপাট করলেন। কিন্তু তাঁরাই আবার সম্মত হয়ে সেদিনই বিয়ে দিলেন বর-কনের। তারিখটি ২০১৫ সালের ২৪ অক্টোবর। আমরা প্রেম করেছি পাঁচটি মাস।



মন্তব্য