kalerkantho


মূল প্রতিবেদন

স্কুল থেকেই গ্রুপ স্টাডি?

কথায় আছে—দশে মিলি করি কাজ। কাজটা যদি হয় পড়াশোনা, তবে তো কথাই নেই। একজনের সমস্যায় ঝাঁপিয়ে পড়বে অন্যরাও। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এ গ্রুপ স্টাডি নিয়মিত ঘটনা হলেও স্কুলে এর প্রয়োগের এদিক-ওদিক নিয়ে লিখেছেন সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



স্কুল থেকেই গ্রুপ স্টাডি?

দল বেঁধে পড়তে সবার আগে চাই বেশি বেশি শেখার আগ্রহ। ছবি : আসিফ হোসেন

পড়াশোনায় মন বসে না ইশমামের। খেলার মাঠ আর ভিডিও গেমে বুঁদ হয়ে থাকতে চায় সব সময়।

কিন্তু ইশমামকেও দেখা যায় ক্লাসের পর একটা নির্দিষ্ট সময় বই হাতে চলে যায় স্কুলের দোতলায়। ঘটনা কী! গিয়ে দেখা গেল আড্ডার মতো করেই চলছে পড়াশোনা। একের ভেতর দুই! আড্ডাও হলো, পড়াও হলো। যাকে বলে ‘গ্রুপ স্টাডি’।

পড়াশোনা একা একাই করতে হয় বেশির ভাগ সময়। কিন্তু বড় হয়ে কোনো কাজ বা চাকরি করতে গেলে কিন্তু একা একা পড়ে থাকলে হয় না। তখন তোমাকে যেতে হবে টিম ওয়ার্কের ভেতর দিয়ে। তো সেই চর্চাটা আগে থেকেই হলে মন্দ কি? তা ছাড়া গ্রুপ স্টাডিতে অনেক সময় ‘বিরক্তিকর’ আর ‘একঘেয়ে’ পড়াশোনাটাও হয়ে ওঠে মজার কিছু। তবে এ নিয়ে আবার শঙ্কাও আছে কিছু।

গ্রুপ স্টাডিটা সাধারণত স্কুলপর্যায়ে খুব একটা দেখা যায় না। এর শুরুটা হয় উচ্চ মাধ্যমিক বা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওই পর্যায়ে গ্রুপ স্টাডি ছাড়া পড়ার কথা চিন্তাই করা যায় না। তোমার বড় ভাই-বোনদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে থাকলে তাঁকে জিজ্ঞেস করেই দেখো!

জেনে নেওয়া যাক গ্রুপ স্টাডির যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা।

সহযোগিতার মানসিকতা : দারুণ মেধাবী কারো পক্ষেও মাঝেমধ্যে সব কিছু সামলে ওঠা মুশকিল হয়ে পড়ে। দরকার হয় সাহায্যের। আর এই সাহায্য দিতে পারে গ্রুপ স্টাডি। গ্রুপ স্টাডিতে শুধু যে পড়াশোনাই হবে তা নয়। একজনের জন্য আরেকজনের যে চিন্তা, জ্ঞানের ভাগাভাগি, এটারও চর্চা হয় দলবেঁধে পড়াশোনায়। পরবর্তী সময়ে বড় শিক্ষাঙ্গনে সমাজের নানা স্তর থেকে শিক্ষার্থীরা আসে পড়তে। একেকজনের চিন্তাভাবনা একেক রকম। কেউ কথা কম বলতে পছন্দ করে, কেউ আবার ছোটবেলা থেকে নিজের নোট লুকিয়ে রেখে অভ্যস্ত। এসব মানসিক বাধা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে গ্রুপ স্টাডি।

খাপ খাওয়ানো : ঘরের বাইরে বিদ্যালয়ে নতুন পরিস্থিতি, নতুন ক্লাসে খাপ খাওয়াতে বেশ ঝামেলা হতে পারে শুরুতে। সেটা দূর করে দেয় গ্রুপ স্টাডি।

ছোটখাটো কৌশল : পড়াশোনা কি শুধু পাঠ্য বই পড়া? এমন অনেক কৌশল আছে, যা দিয়ে জটিল অঙ্ক করে ফেলা যায় সহজে। গ্রুপ স্টাডিতে এমন কৌশল শেয়ার করা যায় সহজে। আর কয়েক দিন পর তো বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেই হবে। নতুন পরিস্থিতি, নতুন ক্লাস, নতুন নতুন বন্ধু পাবে। আগে থেকে দল বেঁধে পড়ার চল থাকলে দেখবে, সেখানে খাপ খাওয়াতে আর সমস্যা হচ্ছে না।

আরো সুবিধা : অনেকের আবার প্রাইভেট টিউটর আছেন। সেখানেও মুশকিল। টিউটর যে সবই জানবেন, এমন নয়। আবার যত ভালো শিক্ষার্থীই হও না কেন, ক্লাসে স্যারের লেকচারের কিছু না কিছু বাদ পড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। প্রতিদিনকার গ্রুপ স্টাডিতে টুকে নিতে পারবে ওটাও। এ ছাড়া অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে ক্লাস মিস গেলেও তখন আর টেনশন করতে হবে না। কোন ক্লাসে কবে কী পড়ানো হয়েছিল, পরীক্ষার তারিখ কবে, স্যার কী কী টপিক পড়িয়েছেন, কোনো বাড়তি সাজেশন আছে কি না—টুকটাক এসব তথ্য মাথায় গিজগিজ করতেই থাকে। দিনের একটা সময় একসঙ্গে সবাই বসলেই কিন্তু এসব নিয়ে আর ভাবনা থাকে না।

দক্ষিণ বনশ্রী মডেল হাই স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মেহেদী হাসান জয় জানাল, ‘আমার বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে পড়তেই ভালো লাগে। বাসায় পড়া থেকে এভাবে পড়তেই বেশি ইচ্ছা করে। ’ কেন এমন ইচ্ছা? জানতে চাইলে মেহেদী বলে, ‘আমি ছোটবেলা থেকে গ্রামের স্কুলে পড়েছি। ক্লাস সিক্সে এখানে এসে ভর্তি হয়েছি। প্রথমে আমার কোনো বন্ধু ছিল না। কারো সঙ্গে কথা বলতে পারতাম না। কিন্তু গ্রুপ স্টাডির কারণে এখন অনেক বন্ধু হয়েছে। প্রথমে আমার রেজাল্টও ভালো ছিল না। এখন সেটিও ভালো। ’

মেহেদীর বাবা হেমায়েত হোসেন অবশ্য প্রথমে খুব একটা ভালোভাবে নিতে পারেননি ছেলের বন্ধুদের এই গ্রুপ স্টাডি। পরে তাঁর ধারণা বদলায়। বললেন, ‘প্রথমে ভেবেছি, শুধু শুধু সময় নষ্ট করবে। বাজে ছেলেদের পাল্লায় পড়লে আরো খারাপ হবে। কিন্তু তেমন কিছু হয়নি। উল্টো আমার ছেলের জড়তা কেটেছে। এখন পড়াশোনায়ও ভালো করছে। টিউটর রাখতে হচ্ছে না। ’

 

যা করতে হবে

গ্রুপ স্টাডিতে খেয়াল রাখতে হবে কিছু জিনিস। যদি দলের উদ্যোক্তা তুমি নিজে হয়ে থাকো, তবে আগেই ঠিক করে নাও দলটা কেমন হবে। দল বেশি ভারী হলে নিজ উদ্যোগে ভাগ করে নিতে পারো। অথবা একবার এক সদস্যকে একেক দলে রাখতে পারো। কারো কপালে ‘খারাপ ছাত্র-ছাত্রী’ তকমা থাকলেই তাকে বাদ দিতে হবে—এমন কথা নেই। তাকে কী করে পড়াশোনায় কৌতূহলী বানানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা করো বাকিদের সঙ্গে।

আবার গ্রুপ স্টাডিতে বসে সময় অপচয়েরও কোনো মানে হয় না। তাই কতটুকু সময় একসঙ্গে পড়া হবে, সেটি ঠিক করে নেওয়া চাই। সুতরাং বুঝতেই পারছ, গ্রুপের কেউ যেন দেরি করে না আসে, অপ্রাসঙ্গিক আলাপে যাতে সময় নষ্ট না হয়; খেয়াল রাখতে হবে এসব দিকেও। আর এসব খেয়াল রাখার দায়িত্ব যেন কখনো একজনের কাঁধে না থাকে। দলের নেতাগিরির দায়িত্বটারও একটা রুটিন করে নিলে ভালো।

সময় তো হলো, এবার ঠিক করতে হবে বিষয়। সবার জানা আছে বা বাসায় বসে বই পড়লেই হবে; এমন বিষয় নিয়ে একসঙ্গে পড়ার দরকার নেই। নির্দিষ্ট সময়ের ভেতর বুঝে ফেলা যাবে এমন টপিক বাছাই করো।

গ্রুপ স্টাডি মানেই যে একসঙ্গে বসে পড়তে শুরু করলাম তা নয়। এর জন্য আগে মন-মানসিকতাও তৈরি করে নেওয়া চাই। আশপাশের সব বন্ধুকে সারাক্ষণ প্রতিযোগী ভাবলে তা কখনোই সম্ভব হবে না। এটা কিন্তু ঠিক যে তুমি নিজে আরেকজনকে যত বেশি জানাবে বা বোঝাবে, ওই বিষয়ে তুমি তার চেয়েও ভালো করবে। তাই মানসিকতা হতে হবে সাহায্য করার, প্রতিযোগিতার নয়। আর দলে দেখা যাবে কেউ কথা কম বলতে পছন্দ করে, কেউ আবার বকবক করতেই থাকে। দুই-ই গ্রুপ স্টাডির জন্য ক্ষতিকর। কিছুদিন প্র্যাকটিস করলে দেখবে নিজের সমস্যা নিজেই ধরতে পারবে, আর তা কাটিয়েও উঠতে পারবে সহজে।

 

খেয়াল রাখো

একসঙ্গে অনেক বন্ধু থাকলে পড়তে ইচ্ছা নাও করতে পারে। আর গ্রুপে যদি আলসে বন্ধুর সংখ্যাই বেশি হয়, তবে তো কথাই নেই। এডুকো বাংলাদেশের (এডুকো পাঠশালা, মেরাদিয়া) প্রধান শিক্ষক হাফিয়া সুলতানা বলেন, ‘গ্রুপে পড়ার অভ্যাস যাতে তৈরি হয়, সে জন্য আমরা অনেক সময় ক্লাসেই গ্রুপ স্টাডি করাই। কিন্তু এটা ঠিক যে গল্পগুজব বাদ দিয়ে পড়াশোনায় মন দেওয়াটা কষ্টকর। বাচ্চাদের জন্য সেটি কঠিন। তবে এ নিয়ে যদি তাদের আগে থেকেই সতর্ক করে দেওয়া হয়, তাহলে হয়তো নেতিবাচক দিকগুলো দূর করা সম্ভব। ’

তবে মন্দের চেয়ে কিন্তু এর ভালো দিকই বেশি। গ্রুপে পড়ার কারণে অনেক অলস সদস্যও হয়ে যায় পড়ুয়া।


মন্তব্য