kalerkantho

নিপ্পনে নিক্কন

৬৫ দেশকে হারিয়ে ‘জাপান প্রাইজ’ পেয়েছেন নভেরা হাসান নিক্কন। ১০ হাজার মার্কিন ডলারও লাভ করলেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্রীর সাফল্যের গল্প শোনাচ্ছেন সাইফুল ইসলাম

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



নিপ্পনে নিক্কন

এনএইচকেতে অতিথিদের সামনে প্রামাণ্যচিত্রের পেছনের গল্প শোনাচ্ছেন নভেরা হাসান নিক্কন

নভেরা হাসান নিক্কন পড়েন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। চারুকলা বিভাগের প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্রী।

ছোটবেলা থেকেই তাঁদের পরিবারে ছবি দেখার চল আছে। বাবা খ ম তাসবি-উল ইসলাম নিয়ম করেছিলেন, সপ্তাহে এক দিন সিনেমা দেখতেই হবে। সেই থেকে ছবি দেখার শুরু। ‘জাপান প্রাইজ ২০১৬’ প্রতিযোগিতার কথাও শুনেছিলেন বাবার মুখে। তিনি ২০০৭, ’১০ ও ’১৩ সালে ‘ইউনেসকো জাপান প্রাইজ’ জয় করেছেন। এটি প্রদান করে জাপানের জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে।

৪৩তম জাপান প্রাইজের জন্য নিক্কন আইডিয়া জমা দিয়েছিলেন গেল বছরের ৩০ জুন। বিষয় ছিল ‘বালিকারা বধূ নয় (দ্য গার্লস আর নট ব্রাইড)’। তাতে বলেন, ‘আমাদের দেশের মেয়েদের ৬৫ শতাংশের ১৮ বছরের আগে আর ৩৫ শতাংশের ১৫ বছরের মধ্যে বিয়ে হয়ে যায়।

ফলে তারা সংসারে মন দিতে গিয়ে লেখাপড়া করতে পারে না। ’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার প্রামাণ্যচিত্রটি মোট ২৮ মিনিটের হবে। মেয়েদের সংগ্রামের পাশাপাশি সাফল্যের গল্পও বলব। সে জন্য আমাদের দেশের প্রথম নারী ট্রেনচালক সালমা খাতুনের গল্পটি তুলে ধরা হবে। ’ গল্পটি বলতে বলতে মনটিই খারাপ হয়ে গেল নিক্কনের। বললেন, ‘আমরা অনেক বান্ধবী একসঙ্গে এসএসসি পাস করি। এইচএসসিতে উঠেই দেখি, বেশির ভাগেরই বিয়ে হয়ে গেছে। ফলে কেউ লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে, অন্য যারা পড়ছে, অনেকেরই আগের মতো পড়ার দিকে মনোযোগ নেই, সংসার সামলাতেই ব্যস্ত। বন্ধুদের জীবনের এই গল্পগুলোই এ পরিকল্পনাটি জমা দিতে উদ্দীপ্ত করেছে। ’

অডিও ভিজ্যুয়াল ফরম্যাটে জমা দেওয়া নিক্কনের পরিকল্পনাটি সারা দুনিয়ার ৬৫টি দেশের ৩৬১টি পরিকল্পনার মধ্যে সেরা পাঁচটির অন্যতম হলো। ১ সেপ্টেম্বর এনএইচকে টেলিভিশন জানাল, সেরা পাঁচ পরিকল্পনার অন্যতম হিসেবে তাঁর আইডিয়া নির্বাচিত হয়েছে। এরপর প্রামাণ্যচিত্রের অংশবিশেষ বা ট্রেইলার তৈরি করে সেটি নিয়ে জাপানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হলো নিক্কনকে।

২৬ অক্টোবরের মধ্যে নিপ্পনে (জাপানকে নিপ্পনও বলা হয়) যেতে হবে। তড়িঘড়ি বাড়ির আশপাশের কয়েকজন বাল্যবিয়ের শিকার নারীর সংগ্রামের কাহিনি নিয়ে পাঁচ মিনিটের একটি ট্রেইলার তৈরি করে ফেললেন। বাবা-মেয়ে উড়ে গেলেন টোকিও। পরদিন এনএইচকে ভবনে গেলেন। সেখানে দেখা হলো আরো চার প্রতিযোগীর সঙ্গে। তবে তিনিই বয়সে সবার ছোট। সেদিন থেকে সাত দিনের অনুষ্ঠান শুরু হলো।

৩০ অক্টোবর ফাইনাল। ১৮ জন বিচারকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্লু ব্যাটারি কোলাবরেশনের প্রযোজক শার্লট কোল, এনএইচকের সেক্রেটারি বা মহাসচিব ইয়ুকি ইউসিদা ও তুরস্কের টার্কিস টেলিভিশনের প্রধান প্রযোজক সেভিলার বাজভোমিও ছিলেন। তাঁরা প্রশ্ন করলেন, কেন এই বিষয়টি বেছে নিলে? নিপ্পন বললেন, ‘আমার দেশের ৬০ শতাংশ মেয়েরও নিজের মত প্রকাশের অধিকার নেই। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হয়। তাদের কথা বলব। ’ কোথায় কোথায় প্রচার করা হবে? শেষ প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের এটি দেখানো হবে। ছেলেরা দেখে যেমন বাল্যবিয়ের কুফল জানতে পারবে, মেয়েরা তেমনই নিজেদের আরো সচেতন করতে পারবে। স্পন্সর পেলে দেশের প্রত্যন্ত এলাকায়ও দেখাব। এ ছাড়া সব গণমাধ্যমকেও শিক্ষামূলক প্রামাণ্যচিত্রটি প্রচারের অনুরোধ জানাব। ’

২ নভেম্বর শাড়ি পরে স্টেজে উঠলেন তিনি। আলো ঝলমলে মিলনায়তনে তখন ঠিক পরির মতোই লাগছিল নিক্কনকে। এনএইচকের পরিচালকের হাত থেকে প্রথম পুরস্কারের ক্রেস্ট ও ১০ হাজার মার্কিন ডলার নিলেন।

দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে কাজে নামতে হলো। তবে কাউকেই রাজি করাতে পারছিলেন না। সামাজিক ও পারিবারিক অসুবিধার কথা ভেবে কোনো নারীই জীবনের গল্প বলতে রাজি নন। অবশেষে কাজলরেখা গল্প বললেন। ১৩ বছরে এই মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। সন্তানসম্ভাবনা হওয়ার পর তাঁকে যৌতুকের জন্য চাপ দিতে থাকে স্বামীর পরিবার। তবে সেই ক্ষমতা তাঁর গরিব মা-বাবার নেই। ফলে সেই স্বামীর ঘর করা হয়নি। পরে অন্য জায়গায় বিয়ে দিয়েছেন মা-বাবা।

বিলকিস আক্তারের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল তাঁদের এলাকা ঢাকার ইব্রাহীমপুরেই। ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায় এই গার্মেন্ট শ্রমিকের। সন্তান আসার পর থেকে আগের মতো শ্রম দিতে পারছিলেন না। বেতন কমে গেল। কোনোভাবেই সেটি মেনে নিতে পারছিলেন না স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন। তাঁরা সন্দেহ করছিলেন, বাপের বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে দেন তিনি। টাকার জন্য নিয়মিত মারধর করা হতো তাঁকে। ফলে অসুস্থ হয়ে গেলেন। অসুস্থ স্ত্রীকে আর ঘরে তুলে নিতে রাজি হচ্ছেন না স্বামী।

রেশমা আক্তার অন্য দুজনের মতো অসহায় নন। এসএসসিতে পেয়েছিলেন জিপিএ ৫। বিজ্ঞানের তুখোড় ছাত্রী ছিলেন। একটিই স্বপ্ন দেখতেন, বড় হয়ে শিক্ষকতা করবেন। তবে বেশি লেখাপড়া করলে ভালো স্বামী পাবেন না—এই কুসংস্কারে মা-বাবা জোর করে খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলেন। এই তিন নারীর গল্প, কান্না ও দীর্ঘশ্বাসের কাহিনি ক্যামেরাবন্দি করলেন তিনি।

‘কন্যাশিশু বিবাহযোগ্য পাত্রী নয় (দ্য গার্লস আর নট ব্রাইড)’ প্রামাণ্যচিত্রে এক নারীর গল্প

এবার বেরিয়ে পড়লেন সফল নারীর খোঁজে। দেশের প্রথম নারী ট্রেনচালক সালমা খাতুনের সঙ্গে আলাপ করলেন। তাঁকে বললেন, আইডিয়াতে আপনার কথা বলেছি, তাঁরা সেটি পছন্দ করেছেন। আগ্রহী সালমা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করতে বললেন। আমলাতন্ত্রের বেড়া ডিঙিয়ে গল্পটি সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি করতে পারলেন না নিক্কন। হতাশ হলেন না মোটেও। এখানে-সেখানে খোঁজ লাগাতে শুরু করলেন।

ইউটিউবে একটি ভিডিও দেখলেন—‘বিয়ে চাই না, ফুটবল খেলব’। ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার সেই অদম্য মেয়েদের সঙ্গে দেখা করলেন তিনি। দলের নাম ‘রাঙাটুলা মহিলা ফুটবল দল। ’ এই মেয়েদের গল্পটি চমকে দিল। সবাই দিনমজুরের মেয়ে। স্কুলপড়ুয়া মেয়েরা ফুটবল খেলে নিজেদের জীবন বদলে ফেলার স্বপ্ন দেখে। অভাব-অনটনের সঙ্গে সংগ্রাম করেও মেয়েদের বিয়ে দিতে রাজি নন মা-বাবা। ক্যামেরা হাতে যখন তাঁদের মুখোমুখি হলেন নিক্কন, একটি উপজেলার একদল অভাবী মানুষ তাঁর চিন্তার জগত্টাই বদলে দিলেন। তাঁরা বললেন—যত কষ্টই হোক, মেয়েদের বিয়ে দেব না। খেলে ওরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করুক, ভবিষ্যৎ গড়ে তুলুক। তারপর অন্য চিন্তা।

সীমান্তের সঙ্গেও দেখা করলেন। মাবিয়া আক্তার সীমান্ত এসএ গেমসে বাংলাদেশের হয়ে ভারোত্তোলনে স্বর্ণপদক জয় করেছেন। অথচ অভাবের সংসারে একসময় তাঁর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশ আনসারে যোগ দিয়ে একই সঙ্গে লেখাপড়া ও সংসারের হাল ধরেছেন। দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছেন। কিন্তু মেয়ে ভারোত্তোলক হবে—এটি কোনোভাবেই তাঁর আশপাশের মানুষ মেনে নিতে পারছিল না। কত কথাই না শুনতে হয়েছে। এখন তাঁকে সবাই সম্মান করছে। সীমান্তের জীবনের দুটি পর্যায়ের গল্পই ক্যামেরাবন্দি করলেন।

ইব্রাহীমপুরের সুরাইয়া বেগমকে নিয়ে এলেন প্রামাণ্যচিত্রে। এককালে কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। তবে ব্যবসায় লস খেয়ে বাবা দোকানের কর্মচারীর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে ঠিক করলেন। কোনোভাবেই মেনে নিতে না পেরে ছোট ভাইকে নিয়ে ঢাকায় পালিয়ে এলেন সুরাইয়া। গার্মেন্টে কাজ শুরু করলেন। ভালোবেসে বিয়েও করেছেন। এখন ইব্রাহীমপুরে সেলাইয়ের দোকান চালান স্বামী-স্ত্রী।

শারমিন আক্তারকে ক্যামেরাবন্দি করেছেন ঝালকাঠিতে। নাইন পড়ুয়া মেয়েটি লেখাপড়া করবেন বলে বিয়েতে রাজি হননি। মা জোর করে বিয়ে ঠিক করার পর মায়ের বিরুদ্ধেই মামলা করেছেন।

এসব জীবনের গল্পের পাশাপাশি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, বেগম সম্পাদক নূরজাহান বেগম ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবির ছবি নিয়ে একটি স্থিরচিত্র প্রদর্শনীও ছিল তাঁর প্রামাণ্যচিত্রে।

‘বালিকারা বধূ নয় (দ্য গার্লস আর নট ব্রাইড)’ নিয়ে এ বছরের ১৫ অক্টোবর গেলেন টোকিও। সেটির এনএইচকে অডিটরিয়ামে হলভর্তি দর্শকদের সামনে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হলো।


মন্তব্য