kalerkantho

খুদে দাবাড়ু

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবা ক্লাবের সদস্যরা কড়াইলের বস্তির শিশুদের দাবা খেলা শেখান। ওরা শেখেও বেশ। সেই বস্তি ঘুরে, শিক্ষক ও ছাত্র দাবাড়ুদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন সাইফুল ইসলাম। ছবি তুলেছেন শিহাব শাহরিয়ার

২৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



খুদে দাবাড়ু

দাবার বোর্ডে মগ্ন হয়ে চাল দিচ্ছে কড়াইলের বস্তির শিশুরা

কড়াইল বস্তির একটি ঘর। চারপাশে টিনের বেড়া, ওপরেও তাই। ভেতরে পাঁচটি দাবার বোর্ড সাজানো আছে। একটি বোর্ডে মনিকা আর জিয়া খেলছে। দুজনই গভীর চিন্তায় মগ্ন। অনেকক্ষণ ভেবে মনিকা তার সৈন্য আগে বাড়াল। ফলে আরো চিন্তায় পড়ে গেল জিয়া। সে করবে কী? সেও সৈন্য আগে বাড়াল। একটু পরে মনিকার হাতি আগে বাড়ল। জিয়া সেই হাতিকে খেয়ে ফেলল সৈন্য দিয়ে। চারপাশে তখন তুমুল উত্তেজনা। নানা রঙের ফ্রক আর হাফ প্যান্ট-শার্ট পরা দর্শকরা ঘিরে ধরেছে ওদের। অনেক পরামর্শ আসছে। তবে কোনো কিছুতেই মন নেই দুই খেলোয়াড়ের। ওরা খেলায় মত্ত। পাশের বোর্ডে খেলায় বুঁদ হয়ে আছে রহিম বাদশা ও তানিয়া আক্তারসহ আরো অনেকে। 

তারা সবাই থাকে ঢাকার গুলশান-বনানীর পাশের কড়াইল বস্তিতে। পড়ে বস্তির ব্র্যাক স্কুলে। বস্তির শিশুদের এই খেলোয়াড়ি জীবনের গল্পটি শোনাল জিয়া মোরশেদুল। সে ব্র্যাক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। তিন মাস ধরে স্কুলে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলা শিখছে ও। কিভাবে শুরু হলো তোমার—এই প্রশ্নের জবাবে জিয়া বলল, ‘প্রথম দিকে ভাইয়া-আপুরা যখন খেলতে বলতেন, আমার লজ্জা লাগত। পরে সেটি কেটে গেল। আমাদের স্কুলের ছেলেমেয়েদের খেলতে দেখে আমারও খেলতে ইচ্ছা করত। তবে কিভাবে খেলতে হয়—সেটি তো জানতাম না। ভাইয়ারা শিখিয়ে দেওয়ার পর এখন আমি ঘুঁটি কাটতে পারি।’ দাবা খেলতে কেমন লাগে—এই প্রশ্নের জবাবে তৃতীয় শ্রেণিরই আরেক ছাত্র রহিম বলল, ‘খুব মজা লাগে। ঘুঁটিগুলো খুব সুন্দর।’ কোন ঘুঁটিটা তোমার প্রিয়? সে বলল, ‘হাতি দিয়ে ঘুঁটি কাটতে খুব ভালো লাগে।’ সে আরো বলল, ‘মন্ত্রীর কাজ অনেক বেশি, তার অনেক ক্ষমতা। সে সব দিকে যেতে পারে। আমাকে তো মন্ত্রীই খেলা জেতায়।’ কখন খেলা শেখো—জবাব দিল আরেক খুদে দাবাড়ু তানিয়া, ‘আমি তো দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি। প্রতিদিন স্কুলের পড়া শেষ করি। সপ্তাহে এক দিন দাবা খেলা শিখি।’ তানিয়ার ভালো লাগে হাতি। এটি নাকি ইংরেজি অক্ষর ‘এল’-এর মতো চলাফেরা করে!

বস্তির শিশুদের দাবার সঙ্গে পরিচিত করানোর কৃতিত্ব শামস উদ দোহার। তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ল্যাঙ্গুয়েজেসের শিক্ষক। ছেলেমেয়েদের ইংরেজি শেখান। অনেক আগে থেকেই দাবা খেলেন তিনি। জাতীয় পর্যায়েও খেলেছেন। তাঁদের ইনস্টিটিউটের পরিচালক লেডি সৈয়দা সারওয়াত আবেদ যখন তাঁর এই গুণের কথা জানলেন, তাঁকে ছেলেমেয়েদের খেলাটি শেখানোর জন্য বললেন। সেই থেকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে দাবা ছড়িয়ে গেল।

শুরু হয়েছিল সাভারের আবাসিক ক্যাম্পাসে। কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে দিনকয়েক শেখানোর পর তারা ভালোই রপ্ত করল। এরপর ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে মহাখালীর ক্যাম্পাসে যাত্রা শুরু করল ‘ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় দাবা ক্লাব’। প্রতি সেমিস্টারের শুরুতে ক্লাবে নতুন সদস্য নেওয়া হয়। আর এই ক্লাবের উপদেষ্টা হিসেবে আছেন গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোর্শেদ। তিনি তাঁদের প্রতিযোগিতাগুলোতে অতিথি হিসেবে অংশ নেন। তাঁদের প্রশিক্ষণ ক্লাসও নেন।

বস্তির শিশুদের মধ্যে দাবা ছড়িয়ে দেওয়া শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালের জুন মাসে। তখন দুই মাস মেয়াদে ব্র্যাক স্কুলে দাবা খেলা শেখানো হয়। তবে এই বছরের জুন থেকে কার্যক্রমটি নিয়মিত চলছে। কেন ওদের খেলা শেখাতে গেলেন? এই প্রশ্নের জবাবে ক্লাবের উপদেষ্টা শামস উদ দোহা বললেন, ‘খেলাটি মনোযোগ ও চিন্তাশক্তি বাড়ায়। আমরা তো বিশ্ববিদ্যালয়ে দাবাকে শুধু একটি খেলা হিসেবে শুরু করিনি। বরং আমরা চাই ওরা শিক্ষার হাতিয়ার হিসেবে নিয়ে দাবা চর্চার মাধ্যমে পড়ালেখায় আরো ভালো করুক। আর শিশুকাল থেকে শিখলে দাবায় খুব ভালো করা যায়। এ জন্যই কড়াইল বস্তিতে ব্র্যাকের এক স্কুলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দাবা শেখানো হচ্ছে।’

শুরুতে ওদের সংখ্যা ছিল আট। তবে এখন শিখছে ৩৫টি শিশু। তাদের শিক্ষক ক্লাবের মহাখালী শাখার আট সিনিয়র দাবা খেলোয়াড়। তাঁরা হলেন বিবিএর শিহাব শাহরিয়ার, সাব্বির হোসেন, সোবায়েদ সাকিব, অর্থনীতির আদ্রিতা রহমান, সিএসইর আহমেদ রাহিন, আরিফ শাকিল, নাজমুল হক ও ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সাইফ আহমেদ। সাইফ বললেন, ‘দুই মাস ধরে আমি খেলা শিখাচ্ছি। প্রতি বৃহস্পতিবার আমার মতো দুই প্রশিক্ষক স্কুলে আসেন এবং সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত শিশুদের খেলা শেখান। কোন ক্লাসে কী শেখানো হবে, সেটি আগেই আমরা ঠিক করে আসি। দাবার প্রাথমিক নিয়মকানুন ও ওদের নিজেদের মধ্যে খেলার উপযোগী করে তুলতে মোট সাতটি ক্লাস নেওয়া হয়। প্রথম ক্লাসে কোনটি হাতি, ঘোড়া, সৈন্য, রাজা, মন্ত্রী—সেগুলো শেখাই। সেগুলো কিভাবে সাজাতে হবে, কিভাবে চালতে হবে তা-ও জানাই। পরের ক্লাসে আগের দিন যা শেখানো হয়েছে, সেগুলো রিভিশন দেওয়া হয়, যাতে ওরা ভুলে না যায়। এদিন হাতি দিয়ে ঘোড়াকে কিভাবে মাত করে দিতে হয়, মানে একটি ঘুঁটি কিভাবে অন্য ঘুঁটিকে খেয়ে ফেলে, সেটি জানানো হয়। তৃতীয় ক্লাসে আগের দিনের কৌশলগুলো ঝালিয়ে নিয়ে কিভাবে রাজাকে বন্দি করে ফেলতে হয় ও খেলা শেষ করতে হয় সেগুলো জানাই। এভাবে পুরো খেলাটি ওরা শিখে ফেলে। আর ওরা নিজেরাও আমাদের সঙ্গে তখন খেলে।’

কেমন পারে ছেলেমেয়েরা—এ প্রশ্নের জবাবে আদ্রিতা বললেন, ‘ওরা ভালোই পারে। কিভাবে ঘুঁটি সাজাতে হবে, কিভাবে চালতে হবে, তা দিব্যি পারে। তবে ওরা খুব ভেবেচিন্তে খেলে তো, এটিই ওদের ভালো খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তুলবে।’ এসব শিশুর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে নিয়াজ মোর্শেদের দেখা হয়েছে। তিনি বললেন, ‘এখন অনেক প্রতিভাই সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী থেকে আসে। এই শিশুদের মধ্যেই তেমন প্রতিভা নিশ্চয়ই আছে।’ এই কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ নিয়ে শামস উদ দোহা বললেন, ‘এসব শিশু যেন আগামীতে জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে, সেভাবেই তাদের গড়ে তোলা হচ্ছে। এখনই ওরা খেলাটি বেশ রপ্ত করে ফেলেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘কড়াইল বস্তির শিশুদের দাবা খেলা শেখানোর এই কার্যক্রম সফল হলে সারা দেশের ব্র্যাক স্কুলগুলোয় কার্যক্রমটি ছড়িয়ে দেওয়া হবে।’



মন্তব্য