kalerkantho

ল্যাবেই কাটে দিন

৭৫ বছর বয়সেও গবেষণাগারেই বেশির ভাগ সময় কাটে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার বসাকের। অনেক কীর্তি আছে তাঁর। সেগুলোই বলছেন জাকির হোসেন তমাল ও হুসাইন মিঠু। ছবি তুলেছেন রায়হানুল রানা

২৪ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০



ল্যাবেই কাটে দিন

দেশ ভাগের সময় তাঁর বাবা ভারতের মালদহে চাকরি করতেন। তবে দেশ ভাগের পর মা জন্মভূমি ছেড়ে যেতে রাজি হলেন না। ফলে বাবাকে চাকরি ছেড়ে চলে আসতে হলো। আস্তে আস্তে সংসারে অভাব দেখা দিল। তবুও মা ছেলেকে টিউশনি করতে দিতেন না। সারা দিন সংসারের কাজ করে গভীর রাত পর্যন্ত চরকায় সুতা কাটতেন। ভোরে মায়ের রিলে করা সুতার বান্ডেল কাঁধে করে নিয়ে সেগুলো ফ্যাক্টরিতে দিয়ে আসতেন। সোয়া মাইল হেঁটে নতুন সুতা বাড়িতে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যেতেন। এভাবেই পড়ালেখা করেছেন অরুণ কুমার বসাক।

ছাত্র খুব ভালো ছিলেন তিনি। ১৯৫৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক, ১৯৫৯ সালে ইন্টারমিডিয়েটে রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে সম্মিলিত মেধাতালিকায় দ্বিতীয় হয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ছিল না বলে রাজশাহী কলেজে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে দুই বছরের অনার্সে পড়েছেন। সেখানে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্সেও প্রথম শ্রেণিতে প্রথম। যেদিন তাঁর এমএসসির রেজাল্ট বেরোল, পরদিন থেকে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করলেন। প্রথম ক্লাসটি নিতে হয়েছিল এমএসসির। ক্লাসের ৬০ শতাংশ ছাত্রছাত্রীই তাঁর ক্লাসমেট, বাকিরা এক ব্যাচ সিনিয়র। তখন তাঁকে দুটি কোর্স পড়াতে হতো। সে সময়ের একটি ঘটনা বলে হেসে ফেললেন তিনি। বললেন, একদিন হঠাত্ রাস্তায় একজন তাঁকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘খোকা, কোন স্কুলে পড়ো?’

এমএসসির থিসিসের মাধ্যমে ১৯৬৩ সালে তিনি গবেষণার ভুবনে প্রবেশ করেন। তাঁর সুপারভাইজর ছিলেন পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক আহমদ হুসেন। ক্ষেত্র ছিল কণাবিজ্ঞান। এক বছরের মাথায় ফলাফল পেয়েছিলেন। এটি নিয়ে তখনকার ডেইলি পাকিস্তান অবজারভারে খবর প্রকাশিত হয়েছে। থিসিস পেপারটি ১৯৬৪ সালের ২৭ আগস্ট চীনের চায়না সিম্পোজিয়ামে প্রথম উপস্থাপন করা হয় এবং খুব প্রশংসা লাভ করে। তবে ১৯৬৫ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে যাওয়ার কথা থাকলেও পাকিস্তান সরকার তাঁর পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করায় তিনি যেতে পারেননি। ফলে ১৯৭২ সালে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে বিলেতে যান, কিন্তু ব্রিটেনের বার্মিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, কণাবিজ্ঞানে গবেষণার জন্য পোস্ট ফাঁকা নেই। নিউক্লিয়ার ফিজিকসে গবেষণার সুযোগ আছে। ফলে নিউক্লিয়ার ফিজিকস নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি। সেখানে প্রোটন, নিউট্রন, হিলিয়াম থ্রি ইত্যাদি কণার আচরণ সম্পর্কে তিনি গবেষণা করেছেন। দেশে ফিরে ১৯৯৭ সাল থেকে নিউট্রন স্টার নামে এক ধরণের তারা যেগুলো থেকে আলো বের হয় না, সেগুলোর স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে গবেষণা করেছেন। সূর্য যে আমাদের আলো দিচ্ছে, এটিও একদিন নিউট্রন স্টার হয়ে যাবে। দেশের একমাত্র গবেষক হিসেবে ড. অরুণ কুমার বসাক যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে এই প্রজেক্টে গবেষণা করেছেন। প্রথম ধাপে ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০১ সালের জুলাই এবং পরে ২০০২ সালের আগস্ট থেকে ২০০৮ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত যে গবেষণাকর্ম চালিয়েছেন, তার ফলাফল নিয়ে ৩৩টি আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র লিখেছেন। সেগুলো ইংল্যান্ডের ইন্সটিটিউট অব ফিজিকস [আইওপি] ও যুক্তরাষ্ট্রের ফিজিক্যাল সোসাইটি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এখন তাঁর অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক আলফাজউদ্দিন অ্যাটমিক ফিজিকস ও নিউক্লিয়ার ফিজিকস নিয়ে গবেষণা করছেন। এছাড়াও এ পর্যন্ত তিনি ৫৫টি এমএসসি, দুটি এমফিল ও ছয়টি পিএইচডি থিসিসের তত্ত্বাবধায়ক। দেশি-বিদেশি জার্নালে তাঁর ১৩৯টি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। অনার্স লেভেলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য তাঁর লেখা ‘ব্যবহারিক পদার্থবিজ্ঞান’ বইটি বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে। কিভাবে এত বছর ধরে গবেষণা করে চলেছেন—এ প্রশ্নের জবাবে সরল হাসিতে ভরে উঠল মুখ। ফিরে গেলেন বহু বছর আগের এক উজ্জ্বল স্মৃতিতে, “তখন আমি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে পড়তাম। প্রিয় শিক্ষক ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাখনলাল। একদিন ক্লাসে তিনি বলেছিলেন, ‘মুখস্থ কোরো না। যেটি পড়ছ, সেটি কি চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাচ্ছ?’ এই যে কোনো কিছু গভীরভাবে দেখা, তা শুধু সম্ভব গবেষণাতেই।” এ জন্যই ল্যাব তাঁকে এত টানে।  ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহামে ‘লো এনার্জি নিউক্লিয়ার ফিজিকস’ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ৫৬ ঘণ্টা ল্যাবের সেই রুমের মধ্যেই কেটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওহিও স্টেট ইউনিভার্সিটিতে প্রতিদিন সকাল ৭টায় ল্যাবে ঢুকতেন, বেরোতেন রাত ৩টায়। অথচ ছোটবেলায় তিনি ছিলেন রোগা, টিংটিংয়ে একটি ছেলে, যার সারা বছরই অসুখবিসুখ লেগে থাকত। বড় হয়ে কিভাবে এত পরিশ্রম করছেন—এমন প্রশ্নের জবাবটি দিলেন এভাবে, ‘লক্ষ্যে তো আমাকে পৌঁছতেই হবে। ল্যাবের যন্ত্রপাতির প্রতি এত ভালোবাসা তৈরি হয়েছে যে ওগুলো না দেখে থাকতে পারি না। কোনো গবেষণা করতে গিয়ে প্রতি মুহূর্তে কী যে হয়, এই রোমাঞ্চও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এটিও পরিশ্রমের অন্যতম কারণ।’ ফলে ৭৫ বছর বয়সে এসেও সকাল ৮টা থেকে রাত ৭টা কি ১০টা পর্যন্ত বিভাগে শিক্ষকতা ও গবেষণার রুটিন পাল্টায়নি তাঁর। ৫৩ বছর ধরে পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা করে চলেছেন।

ড. অরুণ কুমার বসাক ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি ছিলেন। ১৯৯০-৯৪ সাল পর্যন্ত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান ছিলেন। ২০০৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে অবসর নেওয়া এই মানুষটি শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে দেশের একমাত্র প্রফেসর ইমেরিটাস সম্মাননায় ভূষিত হন। উত্তরাঞ্চলের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর হাত দিয়েই কম্পিউটার সেন্টার চালু হয়। ১৯৮৬-৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি সেটির প্রশাসক ছিলেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সেন্টারও তাঁর হাতেই গড়া।

তাঁর নামে ২০০৭ সাল থেকে পেনিনসুলা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট প্রফেসর বসাক পুরস্কার ও বৃত্তি চালু করেছে। প্রতিবছর এখান থেকে চার মেধাবীকে বৃত্তি ও দুজনকে ক্রেস্ট ও আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়।



মন্তব্য