টেলিভিশনে রেসলিংয়ের প্রোগ্রাম হয়। ছোট্ট রাজীব অবাক হয়ে মারামারি দেখে। নিজেও কলাগাছে ঘুষি মেরে হাত পাকায়। আরেকটু বড় হয়ে কলেজে ওঠল। মাঠে ছেলেরা কারাতে প্রশিক্ষণ নেয়। মাঠের আশপাশে ঘুরে রাজীব তাদের নানা কৌশল দেখে। নিজে নিজে সেগুলো প্র্যাকটিস করে। ভালোবাসার এই কারাতের পৃথিবীতে রাজীব ঢালীর প্রবেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে। জগন্নাথ হলে থাকেন। বিছানার পাশে রকের একটি বড় ছবি টাঙিয়ে রেখেছেন। সে ছবি সামনে রেখে ব্যায়াম করেন। একদিন হঠাৎ এক বড়ভাই বলে বসলেন, 'নিজে নিজে না করে জিমে গেলেই তো পারিস।' কথাটি খুব মনে ধরল সমাজকল্যাণের ছাত্রটির। সেদিনই চলে গেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জুডো ও কারাতে সেন্টারে। ভেতরে ঢুকবেন কি ঢুকবেন না, ইতস্তত করছেন। হঠাৎ একজনকে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখলেন। গায়ে সাদা পোশাক। সালাম দিয়ে বললেন, 'ভাই আমিও কারাতে শিখতে চাই।' ছেলেটির দিকে একপলক তাকালেন তিনি। তারপর বললেন, 'এখানে ভর্তি হতে পারো। তবে অনেক কষ্ট করতে হবে। নিয়মিত প্র্যাকটিস করা লাগবে।' ঘাম মুছতে মুছতে ফের জানালেন, 'শরীরের সব রস কিন্তু বেরিয়ে যাবে।' কথা শুনে রাজীবের মনে একটু ভয় ঢুকে গেল, তবুও চলে গেলেন না। সেন্টারের সামনে হাঁটাহাঁটি করে সংকল্পটাকে আরো জোরালো করলেন। তারপর দেখা করলেন কোচ নয়না চৌধুরীর সঙ্গে। সব শুনে তিনি বললেন, তোমার তো ইচ্ছা আছে। তুমি পারবে। তার পর থেকেই জুডো ও কারাতে সেন্টার হয়ে গেল রাজীবের ভালোবাসার ঠিকানা। ভোরে সেন্টারে চলে আসেন। সারা দিন ক্লাস শেষে সন্ধ্যায় হলের মাঠে সকালে শেখা বিদ্যাটাকে একা একা ঝালিয়ে নেন। সময় পেলেই অ্যাকশন মুভি দেখেন। আরো ভালো করার জন্য ২০১৩ সালে 'প্রথম সেতোকান ইন্টারন্যাশনাল কারাতে ট্রেনিং ক্যাম্প'-এ অংশ নিলেন। সেখানে জাপান থেকে প্রশিক্ষকও এসেছিলেন। তিন দিনের সেই প্রশিক্ষণ ভালোই কাজে লাগল। নতুন নতুন অনেক কৌশলও শিখলেন। অনুশীলনের মাধ্যমে সেগুলোকে শাণিত করতে লাগলেন। ২০১৪ সালে শিখতে গিয়ে চোটও পেয়েছেন। শূন্য থেকে পড়ে গিয়ে হাঁটুতে যে আঘাতটা পেলেন, তার জন্য মাসখানেক ভালো করে হাঁটতেই পারলেন না। মনটা দমে গিয়েছিল। সেবারও কোচ নয়না চৌধুরী তাঁর পাশে আশ্রয় হয়ে দাঁড়ালেন, 'তোমার হাত দুটি তো আছেই। হাতের বিদ্যা তো রপ্ত করতে পারো।' সেই দিনগুলোতে হাতের নানা কৌশল আরো রপ্ত করে ফেললেন। জাতীয় কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে নাম লেখালেন ২০১৫ সালে। কোনো পদক জোটেনি ভাগ্যে। কিন্তু তাঁর ভুলগুলো পেশাদার কারাতেরা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। আরো বেশি মনোযোগী হলেন। এরই মধ্যে তাঁর নাম ছড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়ও সাফল্য পেয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে অংশ নিয়েছেন 'কানাওজা কাপ সাউথ এশিয়ান কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপ ২০১৫' প্রতিযোগিতায়। ভারত ও শ্রীলঙ্কার মতো প্রবল প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেশের জন্য স্বর্ণপদক জিতে আনলেন রাজীব ঢালী। সেটি অবশ্যই তাঁর জীবনের অনন্য এক মুহূর্ত, 'অন্য দেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ও পারিবারিকভাবে নানা ধরনের সমর্থন ও সহযোগিতা করা হয়। আমাদের এখানে সেগুলোর কোনো কিছুই নেই। সবাই মনে করে, ছেলে আবার নতুন কোনো পাগলামোতে মেতেছে। সে পরিস্থিতিতে আমি যে স্বর্ণ জিতে এনেছি, নিজের কাছেই খুব ভালো লাগছে।' ইয়োলো বেল্টধারী রাজীবের আরো একটি সাফল্য এলো এবার। ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেশিয়ামে অনুষ্ঠিত 'আন্তহল জুডো ও কারাতে প্রতিযোগিতা ২০১৫'-এ সেরা খেলোয়াড় হলেন সমাজকল্যাণের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রটি। দুটি স্বর্ণ ও একটি রৌপ্যপদক জিতেছেন। জুডোতে পেয়েছেন স্বর্ণ। কারাতের কুমিতে (দুই প্রতিযোগীর মুখোমুখি লড়াই) স্বর্ণ ও কাতায় (অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে লড়াই) পেয়েছেন রৌপ্য। প্রতিযোগিতা নিয়ে বলতে গিয়ে হেসে ফেললেন রাজীব, 'পদক নয়, নিজের সঙ্গে নিজেই লড়েছিলাম। লক্ষ্য ছিল, হেরে যেন না যাই।' ফারজানা আফরিন জিতেছেন তিনটি স্বর্ণপদক নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া আরেকজন জুডো ও কারাতে চ্যাম্পিয়নের নাম ফারজানা আফরিন। তিনি এবার তিনটি বিভাগেই স্বর্ণপদক জিতেছেন। এ অর্জন আর কারো নেই। এ বছর আরো একটি সাফল্য পেয়েছেন ফারজানা। ২৩তম জাতীয় কারাতে প্রতিযোগিতায় সবার মধ্যে তাঁর অবস্থান ছিল তৃতীয়। তবে এর আগেও সাফল্য এসেছে তাঁর। ২০১৩ সালে 'অষ্টম বাংলাদেশ গেমসে' ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হিসেবে রৌপ্য জিতেছিলেন। তখন ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) এই ছাত্রীকে সংবর্ধনাও দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়। সে প্রতিযোগিতার কথা বলতে গিয়ে ফারজানা জানালেন, 'আসলে আমি স্বর্ণপদকের জন্যই লড়েছিলাম। তবে পিচ্ছিল ফ্লোর ম্যাটে একটুর জন্য পা নড়ে গিয়েছিল।' কাতাতে পিচ্ছিল ফ্লোর ম্যাটে প্রতিযোগীদের লড়তে হয়। তাতে অবশ্য মোটেও দমে যাননি ফারজানা। সে বছরই ঢাকায় হয়ে যাওয়া 'চতুর্থ জাপান কাপ কারাতে প্রতিযোগিতা'য় কাতাতে দ্বিতীয় ও কুমিতে তৃতীয় হয়েছেন। সেখানে অবশ্য অনেক নামিদামি প্রতিপক্ষ ছিলেন। এসব সাফল্যের পেছনে সব কৃতিত্ব তাঁর মা-বাবার। ফারজানা বললেন, 'বাবা প্রায়ই বলেন, স্বাস্থ্য সুরক্ষায় খেলাধুলার বিকল্প নেই। তিনি আমাকে সব সময় উৎসাহ দেন। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৬টায় বাবাই আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেশিয়ামে পৌঁছে দিতেন।' অনুশীলন শেষে ক্লাসে ছুটতেন ফারজানা। বিকেলে বাসায় চর্চা চলত। ব্ল্যাকবেল্টধারী ফারজানা বিভাগেও পরিচিত নাম। আইবিএর দ্বিতীয় ক্লাসেই তিনি যে কারাতের চর্চা করেন, সেটি অন্যদের দেখাতে বলেছিলেন স্যার। তাঁদের নবীনবরণে মঞ্চস্থ নাটকে অভিনয় করেছেন কারাতে জানা এক মেয়ের চরিত্রে। ফারজানার এই খেলার প্রতি ভালোবাসা দেখে আরো অনেক মেয়েই আগ্রহী হয়ে জুডো ও কারাতে শেখা শুরু করেন। তবে তাঁদের অনেকেই এখন আর চর্চা করেন না। খেলার বাইরে তিনি বিভাগের শিক্ষক ড. মহিউদ্দিনের গবেষণা সহযোগী। তাঁরা বললেন এই দুই খেলোয়াড়ের ব্যাপারে বলতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জুডো ও কারাতে সেন্টারের প্রশিক্ষক নয়না চৌধুরী বললেন, 'রাজীব ও ফারজানা অন্য খেলোয়াড়দের চেয়ে একেবারেই আলাদা। তাঁরা খুবই মনোযোগী এবং শেখার ব্যাপারে আগ্রহী। তাঁদের ফিটনেসও খুব ভালো।' ছাত্রের সাফল্য সম্পর্কে জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক অসীম সরকার বললেন, 'রাজীব তাঁর পরিশ্রমের পুরস্কার পেয়েছে।'