kalerkantho


মেঘনা নদীতে আওয়ামী লীগ নেতার ইটভাটা

প্রতিমন্ত্রী খোঁড়েন নেতা ভরেন

মনিরুজ্জামান, নরসিংদী   

১৮ মে, ২০১৮ ০০:০০



প্রতিমন্ত্রী খোঁড়েন নেতা ভরেন

নরসিংদীতে মেঘনা নদী ভরাট করে বোখারি ব্রিক ফিল্ডস নামে ইটভাটা নির্মাণ করছেন নজরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি বাদল সরকার, যা নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত করছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘চর বাইসা মেঘনা নদী ভইরা যাইতাছে দেইখা মন্ত্রী (পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী) খনন করতাছেন। আর তাঁর শিষ্য তাঁরই নাম ব্যবহার কইরা সেই নদী ভরাট কইরা ইটভাটা বানাইয়াছে। তো লাভ হইব কী?’ গত সোমবার দুপুরে নরসিংদী-করিমপুর সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে নির্মাণ শ্রমিক আলম মিয়া এ কথা বলেন। তিনি নরসিংদী সদর উপজেলার নবীপুরার বাসিন্দা।

অভিযোগ উঠেছে, পিসি গার্ডার নরসিংদী-করিমপুর সেতুর নিচে দড়িনবীপুরা অংশে নদী ভরাট করে বোখারি ব্রিক ফিল্ডস নির্মাণ করা হচ্ছে। মেঘনা নদীর ওপর ৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সেতুটির দৈর্ঘ্য ৬৩০ মিটার। ইটভাটাটি তৈরি করছেন নজরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি বাদল সরকার।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, নরসিংদী-১ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হীরু (বীরপ্রতীক) নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করছেন। এ অনুযায়ী মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, আড়িয়াল খাঁ, পাহাড়িয়া, ব্রহ্মপুত্র নদসহ ছয়টি নদী খনন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ হবে। বন্যায় নদীর পার ভাঙনসহ তীর রক্ষা, নদীপথে নাব্যতা ফিরিয়ে নৌ চলাচলের উন্নয়ন, পানির গুণগতমান উন্নয়ন হবে। এর ধারাবাহিকতায় ৫০০ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে পাউবোর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। গত ২৮ এপ্রিল এই প্রকল্পের কাজের সূচনা হয়।

গত সোমবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, নির্মাণাধীন সেতুর মাঝামাঝি অংশে পার্শ্ব বেষ্টনীর (রেলিং) কাজ করছে কয়েকজন নির্মাণ শ্রমিক। তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় সেতুর নিচে তাকাতে দেখা যায় নদীতে সেতুর মাঝ বরাবর মাটি দিয়ে বাঁধ দেওয়া কিছু অংশ।

এই মাটির বাঁধ কিসের, এমন প্রশ্নের জবাবে নির্মাণ শ্রমিকরা জানায়, এখানে ইটভাটা তৈরির জন্য বাঁধ দিয়েছেন স্থানীয় চেয়ারম্যান বাদল সরকার।

পরে নিচে গিয়ে দেখা যায়, একটি এক্সাভেটরের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক তারের খুঁটি টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যার তদারকি করছেন একজন। তিনি জানান, তিনি বাদল সরকারের ছোট ভাই বাবুল সরকার।

বাবুল বলেন, ‘বোকারি ব্রিক ফিল্ডস হবে। যার বিস্তৃতি প্রায় দুই হাজার ৮০০ শতাংশ (প্রায় সোয়া ৯ একর)। সোমবার তার জন্য বৈদ্যুতিক লাইনের খুঁটি স্থাপনের কাজ চলছে।’ নদী ভরাট করে কিভাবে ইটভাটা করছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এটা তিনি তদারক করছেন। আমি এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না।’

চেয়ারম্যান বাদল সরকার বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব জমিতে ইটভাটা হচ্ছে। সেতুর পূর্ব অংশের প্রায় চারটি পিলার আমাদের জায়গায়ই হয়েছে। পরে অবশ্য সরকার সেতুর নিচে ১০০ ফুট পূর্ব-পশ্চিমভাবে অধিগ্রহণ করেছে। আর আমি ইটভাটার মাটি রাখার জন্য অস্থায়ীভাবে নদীর ভেতরে ১০০ ফুট বাঁধ দিয়েছি, যা পরবর্তীতে থাকবে না। এটা শুধু মাটি আটকানোর জন্য।’

পাউবো নরসিংদী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী বিজয় ইন্দ্র শংকর চক্রবর্তী বলেন, ‘নদী ভরাটের বিষয়টি আমার জানা নেই। যদি কেউ নদী ভরাট করে থাকে, তাহলে তার কোনো কাজে আসবে না। কারণ নদী পুনঃখননের কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে, যা বাস্তবায়ন করবে সেনাবাহিনী। তারা সব অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করেই পুনঃখনন করবে।’

সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ টি এম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, ‘মেঘনা ভরাট করে ইটভাটা নির্মাণের বিষয়টি আমার জানা নেই।’ তবে এই প্রতিবেদকের সামনে তাৎক্ষণিক তিনি নজরপুর ইউনিয়নের তহশিলদারকে মুঠোফোনে তদন্ত করার নির্দেশ দেন। পরে তিনি বলেন, ‘অবৈধ দখলদার যেই হোক আর যত ক্ষমতাসীনই হোক, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হীরু বলেন, নদী দখলের বিষয়টি আমার জানা নেই। যদি সে (বাদল সরকার) দখল করে থাকে, তাহলে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



মন্তব্য