kalerkantho

মাটি ভরাটে অনিয়ম

মানিকগঞ্জে শত শত কৃষকের মাথায় হাত

সাব্বিরুল ইসলাম সাবু, মানিকগঞ্জ   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মাটি ভরাটে অনিয়ম

মানিকগঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণের কাজ চলছে। ঠিকাদার সরিষা ক্ষেত দিয়ে এভাবে ড্রেজারের পাইপ নেওয়ায় স্থানীয় কৃষকরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রায় ২০ একর জমি অধিগ্রহণ করে মানিকগঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণের কাজ চলছে। নিচু জমি হওয়ায় ২০ একর জমির পুরোটাই ১০ থেকে ১২ ফুট মাটি ভরাট করতে হবে।

আর এই মাটির জোগান পেতে ঠিকাদার ফসলি জমির ওপর দিয়ে ড্রেজার বসিয়েছেন নির্মাণাধীন মেডিক্যাল কলেজের মাত্র ২০০ গজের মধ্যে। এতে ক্ষুুব্ধ কৃষকরা। তাদের আশঙ্কা এই পরিমাণ মাটি ড্রেজার দিয়ে খনন করে তুলে নিলে সমপরিমাণ জমি নিয়ে সৃষ্টি হবে বিশাল খাদ। তাঁরা বলেন, আশপাশে বেশ কয়েকটি সরকারি বালুমহাল আছে। সেখান থেকেই বালু এনে মেডিক্যাল কলেজের জমি ভরাট করা সম্ভব। কিন্তু বেশি লাভের আশায় কৃষকদের তোয়াক্কা না করে তাদের জমির ওপর দিয়ে ঠিকাদার এই ড্রেজার বসিয়েছেন। এ ব্যাপারে কৃষকরা মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে অভিযোগ করেছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্মাণাধীন মেডিক্যাল কলেজের বাউন্ডারি ওয়ালের মাত্র ২০০ গজের মধ্যেই একটি ডোবায় বসানো হয়েছে দুটি ড্রেজার। ড্রেজার থেকে মেডিক্যাল কলেজ পর্যন্ত সরিষা ক্ষেতের ওপর দিয়ে নেওয়া হয়েছে দুটি পাইপ।

পরিদর্শনের সময় উপস্থিত হন ওই চকে জমির মালিক ৩০-৪০ জন কৃষক। তাঁরা জানান, বিশাল এই চকটি পড়েছে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার চান্দর, উকিয়ার ও জয়রা মৌজায়। কমপক্ষে দুই হাজার বিঘা তিন ফসলি জমি রয়েছে এই চকে। এখানে কয়েক শ পরিবারের আয়-রোজগার হয়। তার পরও মেডিক্যাল কলেজের জন্য জমি অধিগ্রহণের সময় কোনো আপত্তি করেননি তাঁরা। কিন্তু এখন ড্রেজার বসিয়ে তাঁদের সর্বনাশ করা হচ্ছে। শ্যামল চক্রবর্তী, রবীন্দ্র সরকার, রকমান মুন্সী, হাতেম আলী, পরান আলীসহ বেশ কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইস্রাফিল হোসেন এই কাজের ঠিকাদার। তিনি জবরদস্তি করে গোলাম রব্বানি নামের একজনের কাছ থেকে একটি ডোবা ইজারা নিয়ে মেডিক্যাল কলেজের বালু ভরাট করছেন। কৃষকদের মতে মেডিক্যাল কলেজের নিচু জমি যদি এই ডোবা থেকে খনন করা বালু দিয়ে ভরাট করা হয় তাহলে ফসলি জমিতে প্রায় একই পরিমাণ খাদের সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া বালুর সঙ্গে যে পানি যাবে সেই পানি ঢুকে পড়বে ফসলি জমিতে। পানির সঙ্গে কিছুটা হলেও বালু থাকবে। ফলে ফসলি জমির ওপর পড়বে বালুর আস্তরণ। এতে জমিতে চাষাবাদ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

তাঁরা জানান, নির্মাণাধীন মেডিক্যাল কলেজের দুই-তিন কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত কালীগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীতে রয়েছে সরকারি বালুমহাল। ওই মহাল থেকে বালু এনে মেডিক্যাল কলেজের কাজে লাগাতে পারেন ঠিকাদার। কিন্তু বেশি লাভের আশায় ঠিকাদার কৃষকদের সর্বনাশ করে ফসলি জমিতে ড্রেজার বসিয়েছেন। কৃষকরা জানান, তাঁরা ওই ঠিকাদারের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু তিনি কোনো কর্ণপাত করেননি। বাধ্য হয়ে কৃষকরা মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। নির্বাহী কর্মকর্তার পাঠানো লোকজন ঘুরে গেলেও ড্রেজার সরানো হয়নি। বরং রাতের অন্ধকারে ড্রেজার চালানো হচ্ছে। বাধা দিতে গেলে তারা উল্টো হুমকি দিচ্ছে।

এ ব্যাপারে ডোবার মালিক গোলাম রব্বানির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ইচ্ছাকৃতভাবে আমি ড্রেজার বসাতে দেইনি। আমাকে বাধ্য করা হয়েছে। ’ রব্বানি জানান, ডোবাসংলগ্ন তাদের পরিবারের প্রায় ১৩২ শতাংশ জমি রয়েছে। কিছুদিন আগে তাঁকে লোক দিয়ে ডেকে নিয়ে যান ঠিকাদার ইস্রাফিল। রব্বানিকে বলা হয় তাঁর পুরো জমি বিক্রি করতে হবে। রাজি না হওয়ায় তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাঁর মাকেও ডেকে নেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে রব্বানি জমির দামের কথা জিজ্ঞাসা করেন। ঠিকাদার বলেন, ‘আপাতত পাঁচ লাখ টাকা রাখো। পরে দেখা যাবে। ’ এ সময় তাঁকে পাঁচ লাখ টাকার একটি চেক ধরিয়ে দেওয়া হয়। রব্বানি জানান, বর্তমান বাজার মূল্যে তাঁদের জমির দাম হবে কমপক্ষে দেড় কোটি টাকা।

জমির জন্য পাঁচ লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়ার কথা স্বীকার করে ঠিকাদার ইস্রাফিল হোসেন বলেন, ‘দুই-এক দিনের মধ্যেই জমির সব টাকা দিয়ে দলিল করে নেওয়া হবে। জমি কেনার জন্য কোনো জোর-জবরদস্তি করা হয়নি। ’ তিনি বলেন, ‘গোলাম রব্বানির পরিবার স্বেচ্ছায় জমি বিক্রি করতে চেয়েছে। মাটি কেটে সেখানে একটি মত্স্য প্রকল্প করা হবে। ’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নিজস্ব জমিতে মাটি কাটলে কোনো অনুমতির প্রয়োজন হয় না। ’ মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পরপরই লোক পাঠিয়ে ড্রেজার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রাতে ড্রেজার চালানো হয় এমন খবর কেউ দেয়নি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’ এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক নাজমুস সাদাত সেলিম বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পরপরই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কৃষকদের যাতে ক্ষতি না হয় সেদিকে আমরা নজর রাখছি। ’


মন্তব্য