kalerkantho

হাওরের বর্গাচাষিদের দুঃখ

‘ঋণ দেয় না সরহার’

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



‘মহাজন ঋণ দেয়, এনজিওরাও দেয়; কিন্তু আমরারে ঋণ দেয় না খালি সরহার। গরিবরারে সরহারও বিশ্বাস করে না।

’ কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার সুতারপাড়ার বর্গাচাষি আল-আমিন এ অভিযোগ করেন।

তিনি জানান, মহাজন ও এনজিওর কাছ থেকে ঋণ নিলে চড়া সুদ গুনতে হয়। এ কারণে ফসল ভালো হলেও কৃষিকাজ করে আসলে তেমন কিছুই থাকে না।

গত বুধবার ওই এলাকায় গেলে বর্গাচাষি স্বাধীন মিয়া জানান, আগাম বন্যায় তাঁর সব ধান তলিয়ে যায়। গতবার চাষাবাদ করে তাঁর ঋণ হয় ৫০ হাজার টাকা। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার মাঠে নেমেছেন; কিন্তু তাঁর হতে কোনো পুঁজি নেই। সরকারি-বেসরকারি কোনো ব্যাংক বর্গাচাষিদের ঋণ দিচ্ছে না। তাই এবার হাত পেতেছেন মহাজনের কাছে।

কৃষকরা জানায়, হাওরে যারা কৃষিকাজ করে তাদের বেশির ভাগই বর্গাচাষি।

ফলে জমির কোনো দলিল বা কাগজপত্র নেই তাদের হাতে। কাগজপত্র না থাকায় কোনো ব্যাংকই ঋণ দেয় না। ফলে বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছে যেতে হয় তাদের।

পাশের চংনোয়াগাঁও গ্রামের আবু সালেক (৬০) জানান, যারা কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত, তাদের সবাইকে কৃষি কার্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের নামে ব্যাংকে অ্যাকাউন্টও রয়েছে। ইচ্ছা করলে কৃষিকার্ড দেখে বর্গাচাষি ও কৃষক সবাইকে ঋণ দেওয়া যায়। কিন্তু ব্যাংকে গেলে তারা জমিজমার কাগজ চায়। কৃষকদের জমির কাগজ থাকলেও বর্গাচাষিদের তো নেই। তাই তারা ঋণ পায় না। কৃষি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার প্রান্তিক কৃষক বা বর্গাচাষিদের ঋণ দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে তারা কৃষিঋণ পাচ্ছে না। তিনি জানান, কৃষিকার্ড পরিচিতি মাত্র। এ কার্ড ঋণ পাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।

সুতারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও কৃষক মো. ধনু মিয়া বলেন, ‘সরকার প্রণোদনা হিসেবে এক হাজার টাকা ও কিছু বীজ দিয়েছে। তা দিয়ে কৃষকদের কিছুই হবে না। ব্যাংকগুলো যদি কৃষকদের পুঁজির সংকট দূর করার পদক্ষেপ নিত, তাহলে বর্গাচাষিদের এত বেগ পেতে হতো না। ’ তিনি জানান, হাওরে যাদের জমিজমা আছে, তাদের বেশির ভাগ আর কৃষিকাজের সঙ্গে নেই। তারা জমি বর্গা দিয়ে টাকা নেয়। তাই যারা কৃষিকাজ করে, ঋণ প্রয়োজন তাদের।

জেলা কৃষিঋণ কমিটির সদস্যসচিব অগ্রণী ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক সোলায়মান মোল্লা জানান, গত চার মাসে জেলার ২৭টি ব্যাংক ৫৪ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে কৃষকদের মধ্যে। এ প্রক্রিয়া চলমান। একই সঙ্গে গত বছরের ঋণ পরিশোধে চাপ দিচ্ছে না ব্যাংকগুলো। বর্গাচাষিদের কেন কৃষিঋণ দেওয়া হয় না—এ প্রশ্নে তাঁর জবাব, ‘যাঁর জমি চাষ করা হয় তিনি যদি গ্যারান্টার হন, তাহলে বর্গাচাষিও ঋণ পাবে। ’ তবে বর্গাচাষিরা বলছে, দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া কোনো জমির মালিক বর্গাচাষির গ্যারান্টার হন না।

ফসল হারানোর শঙ্কা দূর হয়নি

এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বলেছিল, ১৫ থেকে ২১ নভেম্বরের মধ্যে বীজতলার কাজ শুরু করতে। কিন্তু খোদ কৃষি বিভাগ প্রণোদনা হিসেবে বোরো চাষিদের বীজ ও সার দিয়েছে ২১ নভেম্বরের পরে। এগুলো কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করতে লেগে যায় আরো এক সপ্তাহ। ফলে সরকারি প্রণোদনার বীজ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেনি কৃষক।

উল্লেখ্য, জেলার এক লাখ ২৫ হাজার কৃষকের মধ্যে পাঁচ কেজি বীজ, ৩০ কেজি সার ও নগদ এক হাজার টাকা করে প্রণোদনা দেওয়া হয়।

কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর কিশোরগঞ্জে এক লাখ ৬৫ হাজার ৫১৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হচ্ছে। গতবারের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নানাভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। ’


মন্তব্য