kalerkantho


শিবপুরের ‘অবৈধ’ অধ্যক্ষ

নিজস্ব প্রতিবেদক, নরসিংদী   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



শিবপুরের ‘অবৈধ’ অধ্যক্ষ

আবুল হারিছ রিকাবদার

নরসিংদীর শিবপুর শহীদ আসাদ কলেজিয়েট গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে জালিয়াতির মাধ্যমে অধ্যক্ষের পদ আঁকড়ে রাখার অভিযোগ উঠেছে। আবুল হারিছ রিকাবদার কালা মিয়া প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি কলেজে উন্নীত হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের অনুমতি ছাড়াই ১০ বছর ধরে এর অধ্যক্ষের পদে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।

আবুল হারিছ রিকাবদার কালা মিয়া উপজেলার মাছিমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। একই সঙ্গে তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি। অথচ অবৈধভাবে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি শিবপুরে ওপেন সিক্রেট হলেও তিনি ক্ষমতাসীনদের প্রভাব বলয়ে থাকায় সংশ্লিষ্টরা নীরব ভূমিকা পালন করছে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, আবুল হারিছ রিকাবদার কালা মিয়া শহীদ আসাদ কলেজিয়েট গার্লস হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক থাকাকালীন ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে কলেজে উন্নীত করে সরকার। বিধি অনুযায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগের বিধান থাকলেও তা মানেননি তৎকালীন প্রধান শিক্ষক কালা মিয়া। তিনি প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। এরই মধ্যে ২০০৭ সালের ১৬ নভেম্বর তিনি শহীদ আসাদ কলেজিয়েট গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর নেন। কিন্তু তিনি দায়িত্ব থেকে না সরে স্বঘোষিত অধ্যক্ষ বনে যান শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি ছাড়াই।

বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এলে ২০১৩ সালের ৪ নভেম্বর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল হারিছ রিকাবদার কালা মিয়াকে মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের অনুমতিপত্র দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়; কিন্তু তিনি কোনো কাগজপত্র দাখিল না করায় পরের বছর ২০১৪ সালের ১৩ অক্টোবর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস একই নির্দেশ দেয়।

চিঠি পেয়ে একদিন পর ১৫ অক্টোবর গভর্নিং বডির সভা করে ১৬ অক্টোবর লিখিতভাবে জানান, অবসর গ্রহণের পর সরকারি কোনো অনুদান না নেওয়ার শর্তে বিদ্যালয়ের স্বার্থে সব বৈধ ও নিয়মিত গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তিনি প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিগত দিনগুলোতে কালা মিয়া স্থানীয় সংসদ সদস্যদের প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সভাপতি করে সুকৌশলে প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি বিএনপির সাবেক মহাসচিব প্রয়াত আবদুল মান্নান ভূঁইয়া থেকে শুরু করে সাবেক সংসদ সদস্য জহিরুল হক ভূঁইয়া মোহন ও বর্তমান সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম মোল্লাকেও ব্যবহার করেছেন। আর এ কারণে অবৈধভাবে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি শিবপুরে ওপেন সিক্রেট হলেও এত দিন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

তবে অতীতের পথে হাঁটেননি বর্তমান সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম মোল্লা। অধ্যক্ষের বিষয়ে বিতর্ক থাকায় পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। ফলে নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অবৈধ অধ্যক্ষের স্বাক্ষরকৃত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা গ্রহণ করতে অপারগতা জানায় শিক্ষা অফিস। পরে একজন সিনিয়র শিক্ষকের স্বাক্ষরে বর্তমানে বেতন-ভাতা উত্তোলন করা হলেও অবৈধ অধ্যক্ষ দিয়েই চলছে অফিসের সব কার্যক্রম।

নরসিংদী-০৩ (শিবপুর) আসনের সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম মোল্লা বলেন, ‘আমি দুই বছর প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। এ সময় ওনাকে একজন শিক্ষক হিসেবে বারবার বলেছি, অনৈতিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে। কিন্তু অধ্যক্ষের পদটি স্বার্থসংশ্লিষ্ট হওয়ায় উনি সেখান থেকে সরে আসেননি। আর এ বিষয়টি আমার পছন্দ হয়নি বিধায় আমি নিজেই সভাপতির দায়িত্ব থেকে সরে এসেছি। তবে একজন শিক্ষক হিসেবে অবৈধভাবে অধ্যক্ষের পদটি আঁকড়ে ধরে রাখা ঠিক নয়। শিগগিরই বিষয়টির সমাধান হওয়া উচিত এবং ওনার দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানো উচিত। ’

তবে জানতে চাইলে আবুল হারিছ রিকাবদার কালা মিয়া বলেন, ‘গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তে আমি এত দিন অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছি। যেহেতু এটা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তাই আমি নীতিগতভাবে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। ’

জানতে চাইলে শিবপুর শহীদ আসাদ কলেজিয়েট গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি এ কে এম শাহজাহান বলেন, ‘অধ্যক্ষের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ওই পদে আমরা নতুন নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। শিগগিরই আমরা বিধিসম্মতভাবে অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হবে। ’

এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ সরকার বলেন, অবসর নেওয়ার পর মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের অনুমতি না নিয়ে কেউ দায়িত্ব পালন করলে তা অবৈধ। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। নির্দেশনা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


মন্তব্য