kalerkantho


ময়মনসিংহের রাধা সুন্দরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

কবে কাটবে শনির দশা?

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ   

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আবাসিক এলাকায় নিরিবিলি ও নিরাপদ পরিবেশে বিদ্যালয়টির অবস্থান। মূল ভবনের সামনে ও পেছনে দুটি খেলার মাঠ। ১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানের নাম রাধা সুন্দরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। ময়মনসিংহ শহরের নারীশিক্ষার প্রসারে বিদ্যালয়টির নাম ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি আজ অনেকটা নিষ্প্রাণ। কারণ এর একেকটি শ্রেণিতে শিক্ষার্থী মাত্র ১৫-২০ জন। যদিও মেয়েদের বিদ্যালয় হওয়ায় শিক্ষার্থীদের কোনো বেতনই দিতে হয় না। 

এমন চিত্র সাম্প্রতিককালের নয়, অন্তত ২৫ বছর ধরে। অনেকের ভাষায়, ‘শনি’ ভর করেছে বিদ্যালয়টিতে। দুঃখের বিষয়, সম্ভাবনার এ বিদ্যালয় নিয়ে ময়মনসিংহ শহরের শিক্ষা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি বা নাগরিক সমাজ—কারোরই কোনো মাথাব্যথা নেই। যোগ্য শিক্ষক, অবকাঠামো নির্মাণ আর দক্ষ পরিচালনার মাধ্যমে বিদ্যালয়টিকে এখনো ফিরিয়ে আনা যেতে পারে তার গৌরবের পথে।

রাধা সুন্দরী বালিকা বিদ্যালয়টি মৃত্যুঞ্জয় স্কুল রোডে। মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের ঠিক উল্টো দিকে বিদ্যালয়টির অবস্থান। একসময় মৃত্যুঞ্জয়ে ছেলেরা আর রাধা সুন্দরীতে মেয়েরা পড়ত। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সাল পর্যন্ত রাধা সুন্দরী মোটামুটিভাবে শিক্ষার্থী ধরে রাখতে পেরেছিল। এর পরই শিক্ষার্থী সংখ্যা কমতে থাকে। এটি এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়। এখানে শিক্ষার্থীদের (মেয়ে) কোনো বেতনই দিতে হয় না। অথচ বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫৬। তথ্য নিয়ে জানা গেল, এখন দশম শ্রেণিতে ১৯ জন ও নবম শ্রেণিতে মাত্র ১১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। বিদ্যালয়ে আছেন সাতজন শিক্ষক, একজন অফিস সহকারী, একজন লাইব্রেরিয়ান ও তিনজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। সকাল সোয়া ১০টায় ক্লাস শুরু হয় চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। ২০১৭ সালে বিদ্যালয় থেকে ১৬ জন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে ১১ জন পাস করে। কেউ ‘জিপিএ ৫’ পায়নি।

সরজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাধা সুন্দরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস হয় অনিয়মিত। পাঠদান ও গ্রহণের ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয় পক্ষেরই আগ্রহ কম। শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ দরিদ্র পরিবারের সন্তান। অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী। আবার শিক্ষকদের মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। সব মিলিয়ে বিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান নিম্নমুখী। দৈন্যতার ছাপ বিদ্যালয়ের ভবনগুলোতেও। পুরনো মূল ভবনটি বলতে গেলে এখন ব্যবহারেরই অনুপযোগী। এর দরজা-জানালা ভাঙা, চেয়ার-টেবিলগুলো ভালো নয়, ময়লার ছাপ কক্ষগুলোতে। অন্য ভবনের শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চগুলো এলোমেলো। ভবনগুলোর কিছু কক্ষের দরজা-জানালা নিয়মিত না খোলায় পরিবেশ অন্ধকার ও গুমোট। পড়াশোনার পাশাপাশি সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমেও হতাশার চিত্র। খেলাধুলা নেই বললেই চলে। নেই গার্ল গাইডসের কার্যক্রম। সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের তেমন উদ্যোগই নেই। বড় সংকট প্রায় ছয় মাস ধরে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী প্রধান শিক্ষক নেই কত দিন ধরে তা শিক্ষকরাও বলতে পারেননি। বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন শিখা রানী সরকার। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষক ও শরীরচর্চা শিক্ষক নেই।

বাড়ির কাছের এই বিদ্যালয় নিয়ে এলাকার অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কম। বিদ্যালয়ে উপস্থিত কয়েক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাদের অনেকেরই বাড়ি বিদ্যালয় থেকে বেশ দূরে। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি বলেন, বিদ্যালয়টির দুরবস্থা শুরু ২৫-৩০ বছর আগে। দুরবস্থা কাটানোর চেষ্টা খুব একটা করেননি বিভিন্ন সময়ে এখানে দায়িত্বরত প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটি। সংশ্লিষ্ট সবার উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতায় এটি এখন একটি মৃতপ্রায় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কষ্টের বিষয়, বিদ্যালয়ের দুরবস্থা নিয়ে শহরের সচেতন মহলও নীরব। শিক্ষা বিভাগের উল্লেখযোগ্য তৎপরতা নেই। অথচ এটি একটি সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান। অভিভাবকরা বাড়তি টাকা দিয়ে বসতবাড়ির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলেমেয়েদের পাঠাচ্ছে। আর এখানে বিনা বেতনের, মাঠসহ খোলামেলা ভালো পরিবেশের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে না।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শিখা রানী সরকার বলেন, এখানে কম মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়। যারা নিচের ক্লাসে ভর্তি হয়, তারাও পরে অন্য বিদ্যালয়ে চলে যায়। আগে পাশের বিদ্যালয়ে (মৃত্যুঞ্জয় স্কুল) মেয়ে ভর্তি হতো না। এখন সেখানে মেয়েদের ভর্তি করে। তাই মেয়েরা ওই বিদ্যালয়ে চলে যায়। বিদ্যালয়ের বর্তমানে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আতা মো. আব্দুল্লাহ আলামীন। তিনি বলেন, অনেক দিন ধরেই বিদ্যালয়টির এমন দুর্দশা চলছে। তবে তাঁরা চেষ্টা করছেন প্রতিষ্ঠানটিকে ভালো অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, তিনি একাধিকবার ওই বিদ্যালয়ে গেছেন। তিনি শিক্ষকদের বলেছেন, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। এ জন্য বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি শিক্ষা বিভাগের সর্বতো সহায়তা থাকবে।


মন্তব্য