kalerkantho


দুধের ছানা দেখে চোখ ‘ছানাবড়া’

আলম ফরাজী, ময়মনসিংহ   

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



দুধের ছানা দেখে চোখ ‘ছানাবড়া’

ছানা তৈরির পর কাপড়ে রেখে এভাবেই ডোবা ও আবর্জনার উপরে ঝুলিয়ে রাখা হয়। সেখানে বসে মশা-মাছি ও পোকামাকড়। ইনসেটে ছানা তৈরির জন্য খোলা রাখা হয় মশা-মাছি মিশ্রিত দুধ। ছবিগুলো ঈশ্বরগঞ্জের রাজীবপুরের ভাটিচরনওপাড়া গ্রাম থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

দুধের ছানা দিয়ে তৈরি করা হয় নানা স্বাদের মিষ্টান্ন। টাটকা ছানা খেতে লাগেও বেশ। অনেকেই শুধু ছানা খেতে পছন্দ করে। কিন্তু মিষ্টিপণ্য তৈরির মূল উপাদান ছানা কোথা থেকে আসছে। ময়মনসিংহের নান্দাইল ও ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জে কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভয়ংকর সব তথ্য। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ছানা যেভাবে তৈরি হয়, তা দেখলে যে কারোরই চোখ হবে ‘ছানা বড়া’।

ননীযুক্ত দুধ জ্বালানোর পর তার মধ্যে সিরকা/সাইট্রিক এসিড/লেবুর রস মিশিয়ে দুধের আমিষকে (কেজিন) জমাট বাঁধিয়ে ছানা তৈরি করা হয়ে থাকে। দুই শ থেকে আড়াই শ বছর আগে বাঙালিরা ছানা তৈরি করতে শেখে। দুধকে বিকৃত করে ছানা তৈরি করা হয় বলে প্রথম দিকে ছানাকে অখাদ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে স্বাদের কারণে এটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মিষ্টি তৈরি করতে ছানার বিকল্প নেই। মিষ্টি তৈরির প্রয়োজনীয় ছানা তৈরি ব্যবসা করে সংসারের বাড়তি আয় সম্ভব। কিন্তু ওই দুই উপজেলার ছানা প্রস্তুতকারীরা বিশেষ উপায় অবলম্বন করে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শুধু নিজেদের আয় বাড়াতেই যেনতেনভাবে ছানা তৈরি করে মিষ্টির দোকানে দিচ্ছে, যা দেখার জন্য যেন কেউ নেই।

গত মঙ্গলবার নান্দাইল ও ঈশ্বরগঞ্জ এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বাড়ির পেছনে জঙ্গলে, বাঁশঝাড়ের নিচে, ঝোপঝাড়ে ল্যাট্রিনের পাশে, এমনকি ময়লা-আর্বজনা ডোবার পাশে মশা-মাছি উড়ে বেড়াচ্ছে—এমন পরিবেশে তৈরি করা হচ্ছে ছানা। ঈশ্বরগঞ্জের রাজীবপুর ইউনিয়নের ভাটিচরণওপাড়া গ্রামের জালাল উদ্দিনের বাড়ির পাশে ময়লা-আবর্জনার পাশেই তৈরি করে রাখা হয়েছে একটি বড় চুলা। তার ওপরে একটি বিশাল আকারের কড়াই বসিয়ে প্রায় ৪০ কেজি দুধ জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পাশে মাটির নিচে পুঁতে রাখা একটি প্লাস্টিকের ড্রাম থেকে দেওয়া হচ্ছে পুরনো টক দুধের পানি। ওই পানির ওপরে ভেসে আছে মরা মশা-মাছি। ছানা প্রস্তুতকারক আল-আমীনের কাছে জানতে চাওয়া হয় এই টক দুধ কী দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তিনি জানান, দুধ জ্বাল দেওয়ার পর ছানা আলাদা হয়ে গেলে পানির অংশটুকু মাটির নিচে কোনো পাত্রে রেখে দিলেই টক হয়ে যায়। পরে ননীযুক্ত দুধ জ্বাল দেওয়ার মধ্যে উত্তপ্ত দুধে ওই পুরনো টক পানি দিলেই ছানা আলাদা হয়। পরে তা মার্কিন কাপড়ে ছেঁকে তলানির ছানা আলাদা করা হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ওই ছানা মার্কিন কাপড়ে ঢেলে বেশ কয়েকটি অংশে আটকিয়ে জঙ্গলের পাশে একটি সাঁটানো বাঁশের মধ্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আর এর মধ্যে বসছে মশা-মাছি। এই ময়লা ও মশা-মাছিযুক্ত টক পানি দেন কেন—জানতে চাইলে কিছুটা হেসে তাত্ক্ষণিক খালি হাতে প্লাস্টিকের ড্রামের মধ্য থেকে বেশ কয়েকটি মশা ও অন্যান্য পোকামাকড় উঠিয়ে ফেলে দিয়ে বলেন, ‘এসব কাপড় দিয়ে চাইক্যা নিলেই আর কোনো অসুবিধা হয় না।’ আল-আমীন আরো জানান, প্রতিদিন তাঁরা প্রায় ৩০-৪০ হাজার টাকার ছানা বিভিন্ন বাজারের  মিষ্টির দোকানে দিয়ে থাকেন। ২০-২৫ বছর ধরে এ ব্যবসা করে যাচ্ছেন। এভাবে কেউ কখনো খোঁজ নেয়নি। তাঁর ভাষায়, যথাযথ নিয়ম মেনেই ছানা তৈরি করা হচ্ছে। পুরো এলাকায় আরো ১০ জন এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি ছানা তৈরির স্থান অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর। একটি সূত্র জানায়, সঠিক নিয়মে এক কেজি দুধ থেকে ছানা বের হয় দুই থেকে আড়াই শ গ্রাম। কিন্তু জিকো পাউডার ছাড়াও আরো দুই ধরনের ক্ষতিকর পাউডার মেশালে ছানার পরিমাণ বেশি পাওয়া যায়। দেখার কেউ না থাকায় নির্বিঘ্নে কাজটি করে যাচ্ছে তারা।

এলাকাবাসী জানায়, একসময় এ এলাকায় গোয়ালরা স্থায়ীভাবে বসবাস করে দই ও মিষ্টির ব্যবসা করত। তা ছাড়া গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই ছিল দু-চারটি করে গাভি। তারা মিষ্টির জন্য দুধ কিনে ছানা তৈরি করত। একপর্যায়ে ব্যয় কমাতে ও দুধ নষ্ট না হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট একটি বাড়িতেই সব দুধ একসঙ্গে করে ছানা তৈরি করত। এভাবে স্থানীয় লোকজন অন্য ব্যবসা বাদ দিয়ে ছানা তৈরি করেই আয় করত মোটা অঙ্কের টাকা। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এ এলাকার বিশুদ্ধ ছানা বিক্রি করে সুনাম ছড়িয়েছিল। কিন্তু এখন আর সেই সুনাম আর যশ নেই। মিষ্টির দোকানিরা কম ব্যয়ে বেশি লাভের আশায় তাদের কাছ থেকে নিয়ে যাচ্ছে প্রশ্নবিদ্ধ ওই ছানা।

এ ব্যাপারে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ও নিরাপদ খাদ্যা আইন পরিদর্শক মোছাম্মৎ বেদেনা আক্তার জানান, অনুমতি ছাড়াই ওই ছানা কারাখানা চালাচ্ছে মালিকরা। বেশ কয়েকবার হানা দিলেও স্থানীয় কিছু ব্যক্তির সুপারিশে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


মন্তব্য