kalerkantho

ময়মনসিংহে প্রাইভেট ও এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষক

নজিরবিহীন বিরোধ

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নজিরবিহীন বিরোধ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বৈধতার প্রশ্ন নিয়ে নজিরবিহীন বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন ময়মনসিংহের প্রাইভেট ও এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরা। বিষয়টি নিয়ে ময়মনসিংহের মাধ্যমিক শিক্ষাক্ষেত্রে এক ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত রবিবার বই পাওয়ার দাবি জানিয়ে প্রাইভেট বিদ্যালয়ের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক মানববন্ধন করে। এদিকে এসব প্রাইভেট বিদ্যালয় অনুমোদনহীন এবং এদের পাঠদান কার্যক্রমকে অবৈধ উল্লেখ করে ৩ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। তাঁরা এগুলোকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভিযুক্ত করেন। এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে তাঁরা অনড়।

এই পরিস্থিতিতে ময়মনসিংহ সদরের প্রায় ১০০ প্রাইভেট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী এখনো সব বই হাতে পায়নি বলে বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরা অভিযোগ করছেন। শিক্ষকরা জানিয়েছেন, আগে তাঁরা অন্য বিদ্যালয় থেকে বই এনে তাঁদের শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতেন। এখন সেসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বই দিচ্ছেন না। তাঁরা আরো জানান, নিয়মানুযায়ী বিদ্যালয় শুরুর পর অনুমোদন পাওয়া যায়। কাজেই তাঁরা এখন পর্যন্ত অনুমোদন না পেলেও অবৈধ নয়। ভবিষ্যতে তাঁরা অনুমোদন পাবেন। সারা দেশেই এমন হচ্ছে।

৩ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করেন ময়মনসিংহ সদর উপজেলার এমপিওভুক্ত ও পাঠদানের সরকারি অনুমতি পাওয়া বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা। সম্মেলনে সদর উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ২৮ জন প্রধান শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ময়মনসিংহ জেলা শিক্ষক সমিতির সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ময়মনসিংহ সদর উপজেলায় চারটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৬১টি এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও আটটি সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত বিদ্যালয় আছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকরা যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগ পেয়েছেন। কিন্তু দেশে নিয়মবহির্ভূতভাবে গড়ে উঠছে অবৈধ নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ময়মনসিংহ সদরে আনুমানিক ৭০টি সরকারি অনুমতিবিহীন প্রাইভেট মাধ্যমিক বিদ্যালয় এরই মধ্যে বেপরোয়া বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটিরই সরকারি বিধি অনুযায়ী জমি, ক্যাম্পাস ও শিক্ষক নিয়োগ নেই। প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদের জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি নেই।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক নেতারা বলেন, কিছুসংখ্যক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অসাধু প্রধান শিক্ষকের যোগসাজশে ও আঁতাতের মাধ্যমে এসব অবৈধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টিকে আছে। প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো থেকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষার্থী নেওয়ার চেষ্টা করছে। এভাবে চলতে থাকলে শুধু ময়মনসিংহ নয়, সারা দেশের এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়গুলোই সংকটে পড়বে। তাঁদের প্রশ্ন, প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে ভাড়া বাড়িতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সুযোগ পায়? সরকারি বই অনুমতিবিহীন বিদ্যালয়গুলো পাওয়ার কথা নয়; কিন্তু কিভাবে এরা বই পাচ্ছে, তা দেখার বিষয়।

জানা গেছে, ওই সংবাদ সম্মেলনের পরই প্রাইভেট বিদ্যালয়গুলো আর বই সংগ্রহ করতে পারছে না। এর আগে এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়গুলোই তাদের বই দিয়ে সহায়তা করত; কিন্তু এমপিওভুক্ত বিদ্যালয় বই দেওয়া বন্ধ করায় বেকায়দায় পড়েছে প্রাইভেট বিদ্যালয়গুলো। এদিকে অনুমোদন না থাকায় শিক্ষা অফিসও বই দেওয়ার বিষয়ে প্রাইভেট বিদ্যালয়গুলোর জন্য কিছু করতে পারছে না। কারণ বই পেতে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসংখ্যা সরকারিভাবে শিক্ষা বিভাগে জমা দেওয়ার সুযোগ নেই।

সমস্যাটি প্রকট হওয়ায় গত রবিবার আন্দোলনে নামে প্রাইভেট বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। তারা শহরে মানববন্ধন করে। আন্দোলনকারী শিক্ষকরা বলেন, প্রাইভেট বিদ্যালয়ের প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী এখনো বই পায়নি। অথচ শিক্ষাবর্ষের এক মাস চলে গেছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ষড়যন্ত্রে ২০ হাজার শিক্ষার্থী বইবঞ্চিত হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায় আছে। অনেক বিদ্যালয় বন্ধ ও শিক্ষকের বেকার হওয়ার অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

শিক্ষকদের দুই পক্ষই শহরবাসীর উদ্দেশে প্রচারপত্র (লিফলেট) ছেড়েছে। প্রাইভেট বিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে প্রচারপত্র ছেড়েছে শিক্ষক-কর্মচারী সংগ্রাম কমিটি। তারা বলছে, প্রাইভেট বিদ্যালয়গুলো শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য করছে। প্রাইভেট বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ছাড়া প্রচারপত্রে বলা হয়েছে, এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিম্নমুখী হওয়ার কারণেই অভিভাবকরা সন্তান ভর্তি করতে প্রাইভেট বিদ্যালয়ে আগ্রহী হচ্ছেন। দেশে শিক্ষার প্রসারে প্রাইভেট বিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা আছে।

বাংলাদেশ প্রাইভেট স্কুল অ্যাসোসিয়েশন ময়মনসিংহের সভাপতি মো. কামাল হোসেন বলেন, বিদ্যালয় করার পরই অনুমতি আনতে হয়। কাজেই তাঁরা অবৈধ নন। সদর উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী বই পাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা বই না পেলে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান চাহিদা দিয়েছে, তাদের শতভাগ বই দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকারী প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চাহিদা দেয়নি। তাই তারা বই পায়নি। তবে তিনি বিষয়টি দেখছেন। ঊর্ধ্বতন পর্যায়েও বিষয়টি জানিয়েছেন।


মন্তব্য