kalerkantho

শেরপুর

‘কৃষক মাঠ স্কুল’

হাকিম বাবুল, শেরপুর   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



কৃষকের বাড়ির আঙিনায় চাষ হচ্ছে বিষমুক্ত সবজি। লালন-পালন করা হচ্ছে গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি। ফলমূলের গাছ লাগানোর মাধ্যমে জোগান হচ্ছে পুষ্টির। পতিত পুকুর-জলাশয়ে মাছ চাষ করে মিলছে আমিষ। ফসল আবাদে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাড়ছে ফলন। এতে কৃষক পরিবারের পুষ্টি ও পরিবেশ উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আসছে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা। কৃষক মাঠ স্কুলে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণে তৃণমূলে এমন পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়েছে। সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা কম্পোন্যান্ট (আইএফএমসি) প্রকল্পের আওতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এসব কৃষক মাঠ স্কুল (এফএফএস) পরিচালনা করছে। ছয় মাস মেয়াদি কৃষক মাঠ স্কুলের কার্যক্রম শেষে অনেক এলাকার কৃষকরা নিজেরাই আবার গড়ে তুলেছেন ‘কৃষি উন্নয়ন ক্লাব’। যেখানে কৃষকরা একত্রে বসে আবাদ ও ফসলের সমস্যা, সম্ভাবনা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করেন। নিজেদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার জন্যও নানা মতের মিলন ঘটান। নিজেরা সংগঠিত হতে চেষ্টা করছেন। শেরপুরের বিভিন্ন ইউনিয়নে স্থাপিত এসব আইএফএমসি কৃষক মাঠ স্কুল তৃণমূলের কৃষকদের সচেতন ও সংগঠিত করতে ভূমিকা রাখছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, আইএফএমসি প্রকল্পের আওতায় জেলায় প্রতিবছর খরিপ-১ ও রবি মৌসুমে ৩০টি করে ৬০টি কৃষক মাঠ স্কুল স্থাপন করা হয়। এসব মাঠ স্কুলে এলাকার ২৫ জন কৃষক ও ২৫ জন কিষানি নিয়ে ৫০ জনের দল গঠন করা হয়। সপ্তাহে দুই দিন করে ছয় মাসে ৪৬টি সেশনের মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন বিষয়ে কৃষি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞানের আলোকে একটি প্রদর্শনী মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কৃষি মডেলের নানা স্টল স্থাপন করে এলাকার কৃষকদের উদ্ধুদ্ধ করা হয়। এভাবে কৃষক মাঠ স্কুলের কার্যক্রম শেষ হলেও ওই এলাকায় একটি ‘কৃষি উন্নয়ন ক্লাব’ গঠনের মধ্য দিয়ে কৃষকের বাড়িকে খামারবাড়ি হিসেবে গড়ে তোলার নানা কর্মকাণ্ড সচল রাখার চেষ্টা করা হয়।

শেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা কম্পোন্যান্ট প্রকল্পের সহায়তায় শেরপুরের পাঁচ উপজেলায় অন্তত ৩০০টি কৃষি উন্নয়ন ক্লাব গঠন করা হয়েছে। এসব ক্লাবের সদস্যরা কৃষি যন্ত্রপাতি কিনে নিজেরা চাষাবাদে আধুনিক প্রযুক্তির সমাবেশ ঘটাচ্ছেন, যা খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

শেরপুর সদর উপজেলার ধানুরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চত্বরে সম্প্রতি এমন একটি কৃষক মাঠ প্রদর্শনীতে গিয়ে দেখা যায়, এলাকার শিশুসহ নানা বয়সের কৃষক-কিষানিরা সেখানে ভিড় করে আছে। তারা মাঠে স্থাপিত ছয়টি কৃষি মডেল প্রদর্শনী স্টল ঘুরে ঘুরে দেখছে এবং বিভিন্ন বিষয় জানতে চেষ্টা করছে। এ সময় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আসাদুল্লাহ, আইএফএমসি প্রকল্পের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী ড. জগদীশ চন্দ্র পণ্ডিত, খামারবাড়ির উপপরিচালক আশরাফ উদ্দিন, সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পিকন কুমার সাহা, চর পক্ষীমারী ইউপি চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রউফসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ও মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা ওই মাঠ স্কুল পরিদর্শন করেন। পরে সেখানে স্থাপিত মঞ্চে আলোচনাসভায় অতিথিরা বক্তব্য দেন। এ সময় কৃষক মাঠ স্কুলের সদস্যরা ‘কীটনাশক ব্যবহারের কুফল’ সম্পর্কিত একটি নাটিকা ও ‘বোকার ফসল পোকায় খায়’ শীর্ষক একটি গান পরিবেশন করেন। পরে অতিথিরা ওই এলাকায় কৃষক মাঠ স্কুলের সদস্যদের গড়ে তোলা একটি ‘কৃষি উন্নয়ন ক্লাব’ উদ্বোধন করেন এবং সেরা তিন কৃষক-কিষানির মাঝে পুরস্কার ও সনদপত্র বিতরণ করেন।

ধানুরপাড়া গ্রামের কৃষক মো. বাবুল মিয়া বলেন, ‘বসতবাড়িতে অন্তত ১২টি স্থান আছে যেখানে গাছ লাগানো যায়। আর বসতবাড়িতে ফলের বাগান করে আমরা পুষ্টির জোগান পেতে পারি। বাড়ির আঙিনায় রোদ থাকে এমন স্থানে বিষমুক্ত সবজি এবং ছায়াযুক্ত স্থানে আদা-হলুদ আবাদ করা যায়। আইএফএমসি মাঠ স্কুলের প্রশিক্ষণে এমন অনেক বিষয় জেনেছি এবং সে অনুযায়ী আবাদ ফসল করে লাভবান হচ্ছি। এই জ্ঞান অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দিতে আমরা ক্লাব করেছি।’ বিমলা ভাণ্ডারি নামের এক কিষানি বলেন, ‘কিভাবে গবাদি পশু লালন-পালন, পরিচর্যা করে অধিক লাভবান হওয়া যায়, রোগমুক্ত রাখা যায়, কোথায় কোন চিকিৎসা মেলে সেসব বিষয় জেনেছি। ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় কী, উপকারী পোকা কী, ফসলের কোন রোগের কী চিকিৎসা, কোথায় কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, সে বিষয়গুলো আমরা জেনেছি এই মাঠ স্কুলে। এতে আমাদের খুব লাভ হয়েছে।’ ধানুরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শরিফ উদ্দিন বলেন, ‘আমি খুব কাছ থেকে দেখছি কিভাবে আমাদের এলাকার কৃষিতে পরিবর্তন হচ্ছে। এলাকার কৃষকরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। বসতবাড়ির আঙিনায় নানা জাতের সবজি ফসলের আবাদ হচ্ছে, হাজামজা পুকুরে মাছ চাষ এবং পাড়ে সবজির আবাদ হচ্ছে। বাড়ছে কম্পোস্ট সার তৈরি, ক্ষেতে ব্যবহৃত হচ্ছে জৈব সার। ঘরের নারীরাও এখন কথা বলতে শিখেছে। এর সবই সম্ভব হয়েছে আইএফএমসি কৃষক মাঠ স্কুলের শিক্ষায়।’

শেরপুর খামারবাড়ির উপপরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘আইএফএমসি কৃষক মাঠ স্কুলের মাধ্যমে কৃষকদের সচেতন ও সংগঠিত করা হয়ে থাকে। যাতে তারা ভবিষ্যতে নিজেরা একত্রিত হয়ে কৃষিবিষয়ক আলাপ-আলোচনা করতে পারে এবং আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারে। একই সঙ্গে তারা সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারে। সে জন্যই পরবর্তী সময়ে ওই সব প্রশিক্ষিত কৃষকদের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে কৃষি উন্নয়ন ক্লাব গঠন করা হয়ে থাকে।’ আইএফএমসি প্রকল্পের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী ড. জগদীশ চন্দ্র পণ্ডিত বলেন, ‘এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা, সচেতনতা বাড়ানো ও সংগঠিত করা। এর মধ্য দিয়ে কৃষক বাড়িকে খামারবাড়িতে রূপান্তরিত করা। এ জন্য খরিপ-১ ও রবি মৌসুমে এলাকায় আইএফএমসি কৃষক মাঠ স্কুল স্থাপন করে কৃষক-কিষানিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়ে থাকে।’ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. আসাদুল্লাহ বলেন, ‘বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারে কার্যকর নীতির কারণে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে।  আইএফএমসি কৃষক মাঠ স্কুল কৃষি উৎপাদন বাড়ানো ও কৃষকদের জীবনমান উন্নয়ন ঘটাতে অবদান রাখছে।’


মন্তব্য