kalerkantho


টুঙ্গিপাড়ার খোকার আকাশ ছোঁয়ার গল্প

আবদুল মান্নান

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ার বেশির ভাগ স্থানীয় মানুষকে দেখেছি নামের আগে শেখ পদবিটা ব্যবহার করতে। কোনটি আসল শেখ আর কোনটি নয়, তা নির্ণয় করা কঠিন। বছরখানেক আগে একবার কবি কাজী নজরুলের জন্মস্থান আসানসোলে গিয়েছিলাম। বেশির ভাগ মুসলমান তাদের নামের আগে কাজী ব্যবহার করে। সবাই দাবি করে, তারা কবির আত্মীয়। এখানেও আসল-নকল পৃথক করা কঠিন। আজমিরের খাজাবাবার দরগাহর আশপাশে যারা থাকে সবাই চিশতি। বলে, তারা খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির সরাসরি বংশধর। এখানেও বিভ্রান্তি। তবে টুঙ্গিপাড়ায় বিভ্রান্তি একটু কম, কারণ সবাই আদি শেখ পরিবার—অর্থাৎ শেখ লুত্ফর রহমানের পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে তেমনটা দাবি করে না। শেখ লুত্ফর রহমান জাতির জনক শেখ মুজিবের পিতা।

তাঁদের পূর্বপুরুষ শেখ আওয়াল প্রায় চার শ বছর আগে বেশ কিছু সঙ্গী নিয়ে মেসোপটেমিয়া (ইরাক) থেকে চট্টগ্রাম হয়ে পূর্ব ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। শেখ আওয়ালের জন্ম বর্তমান ইরাকের রাজধানী বাগদাদের হাসনাবাদ নামক স্থানে। শেখ আওয়াল অন্য আরব সুফিদের মতো পূর্ব ভারতে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য এসেছিলেন বলে অনেকে মনে করেন। একই সঙ্গে তাঁরা এই দেশে তেজারতিও শুরু করেন। ধর্ম প্রচার ও তেজারতির উদ্দেশ্যে শেখ আওয়াল ও তাঁর সঙ্গে আসা সঙ্গী-সাথিরা পূর্ব ভারতের বেশ কয়েকটি স্থানে ঘুরে শেষতক গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন।   শেখ মুজিব ছিলেন শেখ আওয়ালের সপ্তম বংশধর। বাবা শেখ লুত্ফর রহমান ও মা সায়েরা খাতুনের ঘরে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার মতো এক অজপাড়াগাঁয়ে শেখ মুজিবের জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। মা-বাবা আদর করে ডাকতেন ‘খোকা’ বলে আর স্থানীয় বন্ধুবান্ধব, সমবয়সী ও গ্রামের মানুষের কাছে ‘মজিবর’। স্কুলের খাতায় শুদ্ধ নাম ‘শেখ মুজিবুর রহমান’। রাজনীতিতে যখন থিতু হয়ে যশ-খ্যাতি হয়েছে, তখন ‘শেখ মুজিব’। বিদেশিদের কাছে ‘মুজিব’। সেই খোকা আজ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। আন্তর্জাতিক মহলে তিনি রাজনীতির কবি, Poet of Politics। বেঁচে থাকলে আজ তিনি ৯৮ বছরে পা রাখতেন। জীবিত অবস্থায় তিনি কখনো জন্মদিন পালন করেননি, কোনো কেক কাটা হয়নি, পারিবারিকভাবেও না। বেশির ভাগ জন্মদিন তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন। আর বাঙালি সমাজে ঘটা করে জন্মদিন পালন করার রেওয়াজও তখন  তেমন একটা ছিল না।   তাঁর মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগ দিনটিকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। বঙ্গবন্ধু শিশুদের খুব আদর করতেন। তাঁর সন্তানরা শিশু হিসেবে পিতার আদর থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কারণ, হয় তিনি রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে প্রায়ই পরিবারের বাইরে থাকতেন অথবা তাঁর জন্মদিনটা কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে কাটত। কিছুটা ভাগ্যবান ছিলেন পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেল, তা-ও স্বাধীনতার পর। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু যে সাড়ে তিন বছর বেঁচেছিলেন, তখন তিনি প্রায় সব সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রাসেলকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। সেদিক থেকে রাসেল তাঁর অন্য চার ভাই-বোনের চেয়ে কিছুটা ভাগ্যবান বটে। আজকের এই দিনে জনকের প্রতি রইল সশ্রদ্ধ অভিবাদন।

পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, বঙ্গবন্ধু সময়ের আগেই জন্মেছিলেন। যে সময় বঙ্গবন্ধুর জন্ম, সে সময় বাঙালি মুসলমান সমাজ প্রকৃত অর্থেই একটি পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী ছিল। তারা শিক্ষা-দীক্ষায় ছিল পিছিয়ে। বেশির ভাগ মানুষ হিন্দু জমিদারদের জমিতে বর্গাচাষি হিসেবে কাজ করত। বঙ্গবন্ধুর পরিবার ছিল কিছুটা ব্যতিক্রম। পূর্বপুরুষদের তেজারতির কারণে পরিবারের আর্থিক অবস্থা কিছুটা সচ্ছল ছিল। বলা চলে উচ্চমধ্যবিত্ত। বঙ্গবন্ধুর বাবা শেখ লুত্ফর রহমান মাদারীপুর দেওয়ানি আদালতের সেরাস্তাদার ছিলেন। তাতে বোঝা যায়, তিনি শিক্ষিত ছিলেন। শেখ মুজিবের শৈশব কেটেছে টুঙ্গিপাড়ায়। বাল্যকাল থেকে মুজিব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে কখনো কুণ্ঠা বোধ করতেন না। গোপালগঞ্জে মুসলমানরা ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। তখন হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতভেদ প্রথা বেশ শক্তভাবে গেড়ে বসেছিল। ১৯৩৭ সালে বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে দেখেন, মুসলমান ছাত্রদের শ্রেণিকক্ষের পেছনের বেঞ্চে বসতে হতো। দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে তিনি সামনের বেঞ্চে বসা শুরু করলেন। যেহেতু স্কুলের ফুটবল টিমে তিনি একজন নিয়মিত খেলোয়াড় ছিলেন, সেহেতু স্কুলের মাস্টার মশায়রা এ বিষয়ে তাঁকে আর কিছু বলেননি। স্কুলজীবনে তিনি বেশ ডানপিটে স্বভাবের ছিলেন। বাল্যকালে নানা ধরনের অসুস্থতার কারণে বালক শেখ মুজিব তাঁর সহপাঠীদের তুলনায় স্কুলে বেশ কয়েক বছর পিছিয়ে পড়েছিলেন।

বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে সবাই নেতা হতে চায়। কর্মী হয়ে দলের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে কেউ আর ওপরে উঠতে  চায় না। আর যাঁদের বিত্ত আছে, তাঁরা অর্থ খরচ করে রাতারাতি নেতা হয়ে যান। বঙ্গবন্ধু ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে গিয়ে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, শরত্চন্দ্র বসু, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। হক সাহেবের সঙ্গে অনেক বিষয়ে তাঁর বনিবনা হতো না, তবে তিনি কখনো হক সাহেব সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনো কটুবাক্য ব্যবহার করেননি, কারণ তিনি জানতেন তাঁর পিতা ছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের একজন ভক্ত। স্বল্প সময়ের জন্য তিনি নেতাজি সুভাষ বোসের সংস্পর্শেও এসেছিলেন। নেতাজির নির্দেশে হলওয়েল মনুমেন্ট ভাঙার আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলন শুরু হলে যুবক মুজিব সেই আন্দোলনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। অনেকের মতো তাঁরও ধারণা ছিল, মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র হলে হিন্দু জমিদার, মহাজন আর বেনিয়াদের শোষণ থেকে মুসলমানরা রক্ষা পাবে। সেই বিশ্বাসে তিনি মুসলিম লীগ নেতাদের সঙ্গে ১৯৪৬-এর নির্বাচনের আগে বাংলার গ্রামগঞ্জে ঘুরেছেন। জিন্নাহর ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে-কে কেন্দ্র করে ১৯৪৬ সালে কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূত্রপাত হলে মুজিব একটি ভলান্টিয়ার বাহিনী গঠন করে জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সব নিরীহ মানুষের জীবন রক্ষা করার চেষ্টাসহ আহতদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

বঙ্গবন্ধু আজীবন রাজনীতি করেছেন। কিন্তু কখনো তিনি পদ-পদবি বা ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন হননি। তাইতো তিনি তাঁর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে বলতে পেরেছিলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই। ’ বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার চেয়ে দলের দায়িত্ব নেওয়াটাকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, দল আর সরকারের মধ্যে দলের গুরুত্ব অনেক বেশি, কারণ সরকার ক্ষণস্থায়ী হতে পারে; কিন্তু দল যদি মজবুত থাকে তাহলে হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যেও ক্ষমতায় যাওয়া যায়। ১৯৫৬ সালে আতাউর রহমান খানের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় শেখ মুজিব বাণিজ্য, শিল্প, শ্রম ও দুর্নীতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে মন্ত্রী ছিলেন। আওয়ামী লীগের সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হুকুম দিলেন, দলের স্বার্থে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত মন্ত্রীরা হয় মন্ত্রী থাকবেন, নয়তো দলের পদ-পদবি থেকে ইস্তফা দেবেন। নেতার নির্দেশে ১৯৫৭ সালের ৩১ মে শেখ মুজিব প্রাদেশিক মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দলের দায়িত্ব নেন। অন্যরা দলীয় পদ ছেড়েছেন, কিন্তু মন্ত্রিত্ব ছাড়েননি।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম হলে শেখ মুজিবসহ অন্য যাঁরা পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদের মোহভঙ্গ হতে দেরি হয়নি, যখন ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের বড়লাট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে ঘোষণা করেন—পাকিস্তানের ৬ শতাংশ মানুষের ভাষা উর্দুই হবে বাকি ৯৪ শতাংশ মানুষের রাষ্ট্রভাষা। এর অর্থ দাঁড়াল, এই ৯৪ শতাংশ মানুষ রাতারাতি রাষ্ট্রীয়ভাবে মূর্খ হয়ে গেল, কারণ উর্দু না জানার কারণে তাদের ভাগ্যে সরকারি কোনো চাকরি জুটবে না, তারা রাষ্ট্রীয় কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে পারবে না। জিন্নাহর এই ঘোষণার পর ঢাকায় যে কজন ছাত্র তার প্রতিবাদ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে যুবক মুজিবও ছিলেন। মুজিব বুঝেছিলেন, রাষ্ট্র বা সরকারের কোনো অন্যায় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো রকমের প্রতিবাদ করতে হলে চাই সংগঠন। তাঁর হাত ধরেই জন্ম হয়েছিল প্রকৃত অর্থে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল মুসলিম ছাত্রলীগ, যা পরে ছাত্রলীগ হিসেবে পরিচয় লাভ করে। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্মের পেছনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ছিল অনবদ্য। আওয়ামী লীগের প্রথম কমিটির তিনি একজন যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন।   টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া খোকা, বাঙালি জাতির জনক শেখ মুজিব হয়তো কোনো একসময় আকাশ ছুঁতে চেয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মই হয়তো তাঁর সেই আশা পূরণ করেছিল।

জয়তু মহানায়ক, বাংলার বন্ধু, জয়তু বঙ্গবন্ধু।

 

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক


মন্তব্য