kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

সেই মায়াবী মুখচ্ছবি

এম নজরুল ইসলাম

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



এক শিশুর কথা বলা যাক। আকাশের কাছ থেকে উদারতা শিক্ষা নেওয়ার কথা ছিল তার।

বিস্ময়ভরা চোখ নিয়ে সে হয়তো দেখত সকালের সূর্যোদয়। পূর্ণিমা রাতের ভরা চাঁদ তার মনে কোনো প্রশ্নের জন্ম দিত কি না, তা আমাদের জানা হয়নি। কিন্তু কল্পনা করতে পারি, সেই শিশুটি নিজের জগতে ছিল রাজা। বাবার ব্যস্ততা, মায়ের গৃহকর্ম, ভাইবোনদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া দেখে তার শিশুমনেও হয়তো আগামী দিনের স্বপ্ন সঞ্চারিত হচ্ছিল একটু একটু করে। দুই চোখে ছিল অপার বিস্ময়। তার মায়াভরা মুখ সবার দৃষ্টি কাড়ত। পরিবারটি রাজনৈতিক। দেশের রাজনীতির কেন্দ্র। কাজেই দিন-রাত সেখানে মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকত। সেই বাড়ির যে শিশুটি সবার আদর কেড়ে নিয়েছিল, তার নাম শেখ রাসেল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা ফজিলাতুননেসা মুজিবের কনিষ্ঠ সন্তান। পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে সবার আদরকাড়া এই শিশুটির কি কোনো স্বপ্ন ছিল? সকালের সূর্যোদয় কি কোনো বার্তা পাঠাত তাকে? সন্ধ্যার পশ্চিমাকাশ কেন আবির মাখে—এমন প্রশ্ন কি কোনো দিন উঁকি দিয়েছে তার মনে? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই। এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগেই তো ঘাতকের নির্মম বুলেট কেড়ে নিয়েছে তাকে।

কী দোষ ছিল তার? একরত্তি শিশু, জাগতিক কোনো বোধ যাকে ছুঁয়ে যায়নি, তাকে কেন ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হলো? এমন তো হওয়ার কথা ছিল না! যে বয়সে আপন ভুবনে রাজা হয়ে থাকার কথা তার, সেই বয়সে তাকে পরপারে পাড়ি জমাতে হলো। নিশ্চিত করেই বলা যায়, নিজের একটা জগৎ ছিল তার। ছিল নিজের রাজ্যপাট, যেখানে সে নিজেই রাজা। সেই শিশুরাজা নিজের রাজ্যে নিজেকে যখন গুছিয়ে নিতে শুরু করেছে, তখনই তাকে বিদায় নিতে হয় পৃথিবী থেকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বিশ্বের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের নির্মম শিকার শিশু রাসেল।

বাবার রাজনৈতিক ব্যস্ততা, পরবর্তী সময়ে দেশ গঠনে মনোনিবেশ—এসবই তো তার খুব কাছ থেকে দেখা। বঙ্গবন্ধু যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী, তখন জাপানি চিত্র পরিচালক নাগিসা ওশিমা বাংলাদেশে এসেছিলেন তাঁর ওপর একটি প্রামাণ্য চিত্র তৈরি করতে। একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন শিশু রাসেলের কথা। নাগিসা ওশিমা দেখতেন শিশুটি সব সময় তার বাবার পাশে পাশে থাকে। এটাই ছিল তাঁর প্রশ্ন—শিশুটি কেন কাছে কাছে থাকে? বঙ্গবন্ধু ঠাট্টা করেই জবাব দিয়েছিলেন, ‘ওর মনে বোধ হয় এমন ভয় আছে, কখন সে তার বাবাকে হারিয়ে ফেলে। ’ বাবাকে হারিয়েছে শেখ রাসেল। মা, ভাই, ভাবিদের হারিয়েছে। নিজেও হারিয়ে গেছে কোন দূরলোকে! সেই অনন্তলোক থেকে কেউ কোনো দিন ফেরে না। শুধু কিছু স্মৃতি রয়ে গেছে তার দুই বোনের মনের গহিন কোণে, যে স্মৃতি তাঁরা বয়ে বেড়াবেন আজীবন। তাঁদের হৃদয়ের সেই গভীর ক্ষত কোনো দিন জানবে না কেউ। কেউ জানবে না ছোট ভাইটির জন্য দুই বোনের গোপন অশ্রু বিসর্জনের কথা। ছোট ভাইয়ের জন্য বোনের মনে স্নেহ ও ভালোবাসার যে ফল্গুধারা, তা বাইরের কেউ বুঝতে পারে না। হয়তো এখনো ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে গেলে শেখ হাসিনা কিংবা শেখ রেহানার চোখে ভেসে উঠে সেই মায়াভরা মুখ, সেই দুষ্টুমিভরা চাহনি। কিন্তু বোনের বাড়িয়ে দেওয়া হাতে ধরা দেয় না ছোট ভাইটি আর। তাকে আর বুকে তুলে নেওয়া হয় না। শুধু বুকের ভেতরে থাকা কষ্টগুলো ঝরে পড়ে দুই চোখ বেয়ে অশ্রু হয়ে।

ছোট এই ভাইটিকে নিয়ে দুই বোনের কি কোনো স্বপ্ন ছিল? এটা তো নিশ্চিত, ছোট ভাইটির নিত্য আবদার ছিল তাঁদের কাছে। সব শিশুর জন্য পরিবারের সদস্যদের একটি পরিকল্পনা থাকে। থাকে স্বপ্ন। পরিকল্পনা ছিল এই শিশুর পরিবারটিরও, ছিল স্বপ্ন। দুই বোন, তিন ভাইয়ের সংসারে বোনের সন্তানরা ছাড়াও নতুন দুই অতিথিও এসেছেন। শেখ কামাল ও শেখ জামালের স্ত্রী। শেখ রাসেলের দুই ভাবি। তাঁদের সঙ্গে কেমন ছিল তার সম্পর্ক?

এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই। আমরা জানি এক কালরাতের কাহিনী। বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের এক কলঙ্কময় দিনকে আমরা জানি, যেদিন পুব আকাশে উঠেছিল রক্তমাখা সূর্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। চারদিকে তখন কেবলই গুলির শব্দ। ঘাতকের গুলিতে প্রাণ দিয়েছেন বাড়ির সব সদস্য। শিশু রাসেল যেতে চেয়েছিল তার মমতাময়ী মায়ের কাছে। তাকে হত্যা করা হবে না—এই অভয় চেয়েছিল সে। কিন্তু অবুঝ শিশু বোঝেনি, ঘাতকের প্রাণে মায়া থাকে না। নির্মমতার শিকার হতে হয় তাকে। কী অপরাধ ছিল শিশু রাসেলের? জাতির জনকের সন্তান—এই কি তার অপরাধ?

রাসেলের দুই বোন বেঁচে আছেন। একজন তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ‘মাতৃরূপেণ’ এই দুই বোনের স্মৃতি থেকে তো ভাইয়ের সেই মায়াবী মুখচ্ছবি মুছে ফেলা যায়নি। এখনো দুই বোন ভাইয়ের স্মৃতি রোমন্থন করেন। এখনো হয়তো কল্পনায় আদরে আদরে ভরিয়ে দেন ভাইকে।

আহা, আদরের ভাই আর কোনো দিন ফিরে আসবে না। কোনো আবদার করবে না, স্নেহময়ী বোনদের জন্য এ যে কত বেদনার, তা বোঝে কেবল ভাইহারা বোনেরাই।

আজ ১৮ অক্টোবর রাসেলের জন্মদিন। আজ সকালে পুবের আকাশ কি লাল হয়েছে রাসেলের রক্ত মেখে? আজ রাতে যে তারার বুটি আকাশজুড়ে ফুটবে, তার ভেতরে সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটি কি রাসেলের মুখ হয়ে হাসবে?

আজ সেই দেবশিশু রাসেলের জন্মদিন। আজকের সব ফুল ফুটেছে শুধু তার জন্য। পাখিদের কণ্ঠে আজ রাসেলের গান। আজ পুবের আকাশ কি রাসেলের রক্তের রঙে লাল? দুই বোনের জন্য আজকের দিনটি অন্য রকম। তাঁরা কি আজ অবগাহন করবেন রাসেলের স্মৃতির সরোবরে? সবার অলক্ষ্যে রাসেল এসে কি ঝাঁপিয়ে পড়বে বোনদের কোলে? কপালে চুমুর রেখা এঁকে দিয়ে বোনই হয়তো বলবেন, ‘হ্যাপি বার্থ ডে রাসেল’!

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট হারিয়ে যাওয়া শেখ রাসেল, শুভ জন্মদিন। আজকের ভোরের বাতাসে ছড়িয়ে দিলাম আমাদের শুভেচ্ছা। আজকের সব ফুল ফুটেছে তোমার জন্য, তুমি কি দেখতে পাচ্ছ?

 

লেখক : অস্ট্রিয়া প্রবাসী, অল ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক

nazrul@gmx.at


মন্তব্য