kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

অকালেই যে হারিয়ে গেল

বাহালুল মজনুন চুন্নু

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



অকালেই যে হারিয়ে গেল

১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর, মধ্যরাত। চারদিকে সুনসান নীরবতা।

গাছগাছালি আর পাখপাখালিতে ঘেরা ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ির কারো চোখে ঘুম নেই। সবাই উত্কণ্ঠার মধ্যে। চার ভাইবোন কী হয়, কী ঘটে এই ভাবনায় দিশাহারা। উত্কণ্ঠা, অপেক্ষার দীর্ঘ মুহূর্ত শেষে মেজ ফুফু যখন এসে খবর দিলেন তাঁদের ফুটফুটে এক ভাই হয়েছে, তখন সবার মধ্যে বয়ে গেল আনন্দের ফল্গুধারা। পৃথিবীর সব সুখ এসে জড়ো হলো সেই গৃহকোণে। ছোট্ট ভাইটিকে একনজর দেখার জন্য, কোলে তুলে নেওয়ার জন্য তাঁদের আর তর সইছিল না। সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসে অবশেষে। তাঁরা একে একে তুলতুলে নরম অতিথিকে, ছোট্ট ভাইটিকে কোলে তুলে নিয়ে পরম মমতা ও ভালোবাসায় আদরে আদরে ভরিয়ে দেন। তাঁদের ঝঞ্ঝাময় জীবনে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিতেই আগমন ঘটেছিল সেই শিশুর। শিশুটির নাম রাখা হলো রাসেল। শিশুটির বাবা দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের ভক্ত ছিলেন। তাঁর নামে ছোট ছেলের নাম রাখলেন শেখ রাসেল। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিবের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, শেখ কামাল ও শেখ জামালের পরম আদরের ছোট ভাই।

সবার ছোট বলে রাসেল ছিল সবার আদরের। সবার চোখের মণি। কে তাকে কোলে নেবে, কে তাকে আদর করে চোখে কাজল পরিয়ে দেবে, কে পাউডার মাখিয়ে দেবে—এ নিয়ে চলত কাড়াকাড়ি। এসবের মধ্য দিয়ে একটু একটু করে রাসেল বড় হতে থাকে। বাড়িতে ভাইবোনদের কাছে রাসেল ছিল যেন এক পুতুল। তারা তাকে সেভাবেই আদর করত, সাজাত, খাওয়াত, খেলত। রাসেলের আদরের কমতি নেই। ও একটু ব্যথা পেলে পরিবারের সবার কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ পড়ত। এমন আদরে-সোহাগে বেড়ে উঠতে থাকল রাসেল। চাঁদের আলোর ঝরনাধারায় পুরো পৃথিবী যেমন আলোকময় হয়ে ওঠে, তেমনি সেও পুুরো পরিবারের জন্য ছিল সুশীতল শান্তির স্নিগ্ধ আলো। তাকে ঘিরে পত্রপল্লবিত হতে থাকে পরিবারের আনন্দ-বেদনার কাব্য। তাকে ঘিরে কেটে যেতে থাকে সবার ব্যস্ত সময়। মায়ের পর রাসেল সবচেয়ে ভালোবাসত ওর বড়পাকে। বড়পা মানে আদরের হাসুপাকে। আর হাসুপাও তাকে হাত ধরে ধরে হাঁটতে শেখালেন। যেদিন সে কারো সাহায্য ছাড়াই প্রথম হাঁটতে শেখে তখন পুরো পরিবারে সেকি উন্মাদনা! সেকি খুশির ঝলক! রাসেল ক্রমে বড় হতে থাকে। শৈশবেই তার মধ্যে প্রকাশ পেতে থাকে মানবিক সব গুণ। তার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যেতে থাকে জাতির পিতার ছায়া।

রাসেল ছিল সাহসী। এই সাহস সে পেয়েছিল বাবার কাছ থেকে। রাসেল সহজেই কোনো কিছুকে ভয় পেত না। বড় বড় কালো পিঁপড়া দেখলে ধরতে যেত। একদিন একটা বড় কালো পিঁপড়া ধরতে গেলে পিঁপড়াটা তার হাতে কামড়ে দিয়েছিল। আর তাতে ডান হাতের ছোট্ট আঙুল কেটে রক্ত বের হয়েছিল অনেক। এর পর থেকে সে আর কখনোই কালো পিঁপড়া ধরতে যেত না। রাসেল সেই কালো পিঁপড়ার একটা নাম দিল ‘ভুট্টো’। সেই ছোট্ট বয়সেই সে বুঝেছিল, জুলফিকার আলী ভুট্টোর মতো মানুষরা কালো পিঁপড়ার মতোই ভয়ানক।

পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে রাসেল খুব কমই কাছে পেয়েছিলেন। কিন্তু যতক্ষণ পেতেন, ততক্ষণ তার সব কিছু পিতাকে ঘিরে আবর্তিত হতো। পিতা-পুত্র যেন একজন অন্যজনের বন্ধু। বাবা তাকে গল্প শোনাতেন। সেই গল্পগুলো ছিল এ দেশের শোষিত-নির্যাতিত-নিপীড়িত ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের গল্প। মনোযোগী ছাত্রের মতো রাসেল বাবার গল্প শুনত। সেই সব গল্প রাসেলের মধ্যে বপন করেছিল দেশপ্রেম। এর প্রমাণ আমরা পাই ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে। তখন তার মাত্র সাত বছর বয়স। পুলিশের গাড়ি দেখলেই রাসেল ‘হরতাল’, ‘হরতাল’—‘জয় বাংলা’, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিত।

৭ মার্চ বিকেলে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ’ সেদিন ছোট্ট রাসেল পুরো কথার মর্মার্থ না বুঝলেও সাত কোটি জনতা যেমন তার বাবার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান তুলেছিল, সে-ও সেই স্লোগানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে এ দেশের নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস সে পরিবারের অন্য সবার সঙ্গে গৃহবন্দি ছিল। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করলে পরদিন সকালে ধানমণ্ডির রাস্তায় মুক্তিযোদ্ধা, ভারতীয় সেনা ও মানুষের ভিড় জমে উঠেছিল। বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিবের সঙ্গে শেখ রাসেলও ঘরের ভেতর থেকে বের হয়ে সবার সঙ্গে গলা মিলিয়ে স্লোগান দিল—‘জয় বাংলা’। রাসেলের শিশুকণ্ঠের সেই ‘জয় বাংলা’ স্লোগান আমাদের বিজয়ের মাহাত্ম্যকে আরো মহান, আরো জ্যোতির্ময় করে তুলেছিল।

এরপর কালের পরিক্রমায় এলো ১৯৭৫। ১৫ আগস্ট। সেদিন নিষ্পাপ শিশু রাসেলকে নরপিশাচদের বুলেটের আঘাতে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়েছিল। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। সেই কালরাতে নরঘাতকরা নির্দয় ও নিষ্ঠুরভাবে জাতির পিতার পরিবারের সবাইকে হত্যা করেছিল। নিষ্পাপ শিশুটির বুকে গুলি ছুড়তে পশুদের একটুও বুক কাঁপেনি। এমনই পাষণ্ড পিশাচ ওরা। তাদের নির্মম বুলেট সেই ছোট্ট রাসেলকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস যে রাসেল পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বন্দি থেকেও নিরাপদে ছিল, সেই শিশুটিকেই স্বাধীন দেশের মাটিতে এদেশীয় পিশাচদের হাতে প্রাণ দিতে হলো নির্মমভাবে। এর চেয়ে নিষ্ঠুরতা আর হতে পারে! কী অপরাধ ছিল শিশু রাসেলের?

মানবতা, মানবাধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পাষণ্ডরা সেদিন ১০ বছরের রাসেলকে নির্মমভাবে হত্যা করে প্রমাণ করেছে, বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্ব, আদর্শ, চেতনা টিকিয়ে রাখা তাদের জন্য ভয়ানক বিপদের কারণ হয়ে যেতে পারে। সুতরাং রাসেলকে মেরে ফেলো! রাসেলকে মেরে ফেলা মানে বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলা। তাঁর আদর্শকে মেরে ফেলা। তাঁর স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে ফেলা। আসলেই কি তারা তা পেরেছিল? পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট অন্যদের সঙ্গে নির্মমভাবে শেখ রাসেলকে হত্যা করতে পারলেও রাসেলের মানবিক গুণাবলি, চেতনা, স্বপ্ন, দেশপ্রেমের অস্তিত্বকে হত্যা করতে পারেনি। রাসেল আজ নেই, কিন্তু আছে তার লাখোকোটি অনুসারী, উত্তরাধিকারী। আছে তার স্লোগান—‘জয় বাংলা’।

 

লেখক : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ


মন্তব্য