kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

শুভ জন্মদিন

সেলিনা হোসেন

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



শুভ জন্মদিন

আজ শেখ রাসেলের জন্মদিন। ১৯৬৪ সালের এই দিনে তার জন্ম হয়েছিল।

আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর লেখা থেকে জানতে পারি, ৩২ নম্বর রোডের যে ঘরটিতে তার জন্ম হয়েছিল সে ঘরটি ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শোবার ঘর। এই বাড়িতে ছোট্ট শিশু রাসেল দিনে দিনে বড় হয়ে ১০ বছর বয়সে পৌঁছে গেছে। ৩২ নম্বর বাড়িটি এভাবে রাসেলের স্মৃতির বাড়ি।

আজকে শেখ রাসেল সম্পর্কে লিখতে গিয়ে তার কিছু ছবির কথা আমার খুব মনে পড়ছে। একটি ছবি মুক্তিযুদ্ধের সময় পতাকা হাতে রাসেল। সেই পতাকায় লাল গোলাকার বৃত্তের মধ্যে বাংলাদেশের মানচিত্র ছিল। অন্য ছবিটি স্বাধীনতার পরে তোলা। ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গমাতাসহ পরিবারের অন্যরা ধানমণ্ডি ১৮ নম্বর রাস্তার একটি বাড়িতে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁদের বন্দি করে রেখেছিল, সেই বাড়ি থেকে মুক্ত হওয়ার আগে রাসেলের একটি ছবি তোলা হয়েছিল, যেখানে ওর সঙ্গে আরেকটি শিশু ছিল। ওদের মাথায় ছিল হেলমেট, ওরা মাটিতে শুয়ে যুদ্ধের সৈনিকের ভঙ্গিতে ছিল। ওদের সামনে ছিল একটি স্টেনগান। ওদের পেছনে আছে চারজন ভারতীয় সৈনিক। প্রথম ছবিতে আমাদের সামনে মুক্তিযুদ্ধের সূচনার ছবি। শেষ ছবিটি স্বাধীনতার পরের দিনের ছবি। প্রথম ছবিতে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দ্বিতীয় ছবিতে সে যুদ্ধের বঙ্গ সৈনিক। ১৯৭১ সালে ও ছয় বছরের শিশু। এই দুটি ছবি দেখে আমার একটি কথাই মনে হয়েছে যে ওই ছয় বছরের শিশুর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিস্ময়করভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। আমি এই ছবি দুটিকে কোনো সাধারণ ছবি মনে করছি না।

‘শেখ রাসেল’ নামে একটি বই লিখেছেন শেখ রেহানা ও শেখ হাসিনা। দুজনেই বইটিতে তাঁদের ছোট ভাইকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে স্মৃতিচারণা করেছেন সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, “চলাফেরায় ও বেশ সাবধানী কিন্তু সাহসী ছিল, সহসা কোনো কিছুতে ভয় পেত না। কালো কালো বড় বড় পিঁপড়া দেখলে ধরতে যেত। একদিন একটা ওল্লা (বড় কালো পিঁপড়া) ধরে ফেলল আর সাথে সাথে পিঁপড়া ওর হাতে কামড় দিলো। ডান হাতের ছোট্ট আঙ্গুল কেটে রক্ত বের হলো। সাথে সাথে ওষুধ দেয়া হলো। আঙ্গুলটা ফুলে গেছে। তারপর থেকে আর ও ওল্লা ধরতে যেত না। তবে এই পিঁপড়ার একটা নাম নিজেই দিয়ে দিল। কামড় খাওয়ার পর থেকেই কালো বড় পিঁপড়া দেখলে বলত, ‘ভুট্টো’। ”

ভাবতে অবাক লাগে ছয় বছরের শিশু ১৯৭১ সালে রাজনৈতিক টানাপড়েন, অসহযোগ আন্দোলন, ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভুট্টো ইত্যাদি শব্দ থেকে কালো পিঁপড়ার সঙ্গে ভুট্টোকে যুক্ত করেছে। যে ভুট্টো ১৯৭০ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে পারছিল না এবং প্রবল বিরোধিতা করে একটি ২৫ মার্চের রাতের গণহত্যার একজন হিসেবে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর যখন পেছন ফিরে আমরা দেখি, সে সময় ৩২ নম্বর বাড়ির শিশুটি কিভাবে অনবরত শুনতে থাকা ভুট্টো নামটি তার কাছে কালো পিঁপড়ার সমান্তরাল হয়। শিশু বয়সে এই বোধের জায়গা তৈরি হয়ে যাওয়া একজন অসাধারণ শিশুর পক্ষেই সম্ভব। ওই শিশুটিকে নৃশংসভাবে হত্যা করে কতিপয় দুর্বৃত্ত সেনা সদস্য, যাদের কাছে মানবিক বোধের জায়গাটি শূন্য হয়ে গিয়েছিল।

শিশুটি যখন সেনাবাহিনীর বর্বর নৃশংসতার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, আমি মায়ের কাছে যাব, সেই অনুরোধও সেই সব নির্মম মানুষের কাছে কোনো মানবিক মূল্য পায়নি। এভাবে শিশুহত্যা আমাদের জাতীয় জীবনকে গ্লানিময় করে রেখেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর স্মৃতিচারণার এক জায়গায় লিখেছেন, ‘রাসেল এমনিতে খাবার খেতে চাইত না, কিন্তু রান্নাঘরে বাবুর্চি, দারোয়ান, কাজের বুয়ারা ফুল আঁকা টিনের থালায় করে যখন সবাই খেত তখন ওদের সঙ্গে বসত। রান্নাঘরে পিঁড়ি পেতে বসে লাল ফুল আঁকা থালায় করে কাজের লোকদের সাথে ভাত খেতে পছন্দ করত। ’

এই কথাটুকুর মধ্যে আমরা একটি শিশুর সাধারণ মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা, চলাফেরা, ভাত খাওয়ার জায়গা দেখতে পাই। বোঝা যায়, শিশুটির মানুষের প্রতি ভালোবাসা, মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার ইচ্ছা কত প্রবল ছিল। এটাই একজন শিশুকে চিনে ওঠার সুযোগ করে দেয়। আমরা এমন শিশুটি হারিয়েছি, যে তার মানবিক বোধ নিয়ে একজন পূর্ণ মানুষ হয়ে উঠত। রাজনীতি, সমাজনীতির মতো জায়গায় এমন অসাধারণ বোধের মানুষই তো বিশ্বের প্রতিটি দেশের গণমানুষের প্রবল আকাঙ্ক্ষার ব্যক্তি। আমরা আমাদের জীবন থেকে এমন বোধের মানুষ হারিয়েছি।

প্রধানমন্ত্রীর একটি বই আছে ‘পিপল অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ নামে, সেই বইটি তিনি উৎসর্গ করেছেন শেখ রাসেলকে। উৎসর্গে লেখা আছে—‘In front memory of my youngest brother@Sheikh Rusel, he was a rarity of a flower plucked in the cruelty of evil. A child whose future was sensed out in a present narrated by the sinister darkness of conspiracy’

আমাদের সামনে আজ রাসেল নেই, এটি একটি নির্মম সত্য। আমাদের অজস্র শিশু স্মরণ করবে রাসেলকে ইতিহাসের সঙ্গে তার নামটি দেখে।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক


মন্তব্য