kalerkantho

পরিবারে আহাজারি

তিন দম্পতির পাঁচজনের মৃত্যু

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



তিন দম্পতির পাঁচজনের মৃত্যু

নেপালে রাজশাহী থেকে ভ্রমণে গিয়েছিলেন তিন দম্পতি। এর মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন, গুরুতর আহত হয়েছেন একজন। এর মধ্যে একটি পরিবার রাজশাহীতে ভাড়া থাকত, আর বাকি দুটি পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করছিল। তিন পরিবারের তিন নারী ছিলেন পেশায় শিক্ষক। দুজন অবসর নিয়েছিলেন। আর একজন বর্তমানে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) শিক্ষক। রুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইমরানা কবির হাসি এখন পর্যন্ত জীবিত রয়েছেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দপ্তর থেকে দেওয়া তালিকা সূত্রে জানা গেছে।

নিহতরা হলেন রাজশাহী নগরীর শিরোইল এলাকার বাসিন্দা ও অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব হাসান ইমাম, তাঁর স্ত্রী নাটোরের লালপুর কলেজের শিলমঘক হুরুন নাহার বিলকিস বানু, রাজশাহী নগরীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী রাজশাহী মহিলা কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আক্তার বেগম, ঢাকায় একটি সফটওয়্যার কম্পানিতে কর্মরত কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান ও ইমরানা কবির হাসির স্বামী।

রাজশাহীর নিহত পাঁচজনের মধ্যে চারজনের লাশের অপেক্ষায় আছে পরিবারের অন্য সদস্যরা। রাজশাহীতেই তাঁদের চারজনের দাফন সম্পন্ন হবে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

নিহত মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলামের মেয়ে এবং একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী নারগিস আক্তার কাকন জানান, সোমবার রাতেই তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন ওই দুর্ঘটনায় তাঁর মা-বাবাও নিহত হয়েছেন। তাঁর মা-বাবার লাশ নিতে গতকাল সকালে নেপালে যান কাকনের মামা চিকিৎসক মইনুদ্দিন চিশতী ও মেয়ে নুসরাত আলী।

নজরুল ইসলামের বড় মেয়ের নাম সানজিদা আক্তার কনকের স্বামী অ্যাডভোকেট এমরান আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার শ্বশুর একজন মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ী গ্রামে। তবে দীর্ঘদিন ধরে নজরুল ইসলাম রাজশাহী নগরীর উপশহরে বসবাস করতেন। সম্প্রতি ছোট মেয়ে কাকন ঢাকায় পড়াশোনা করায় নজরুল ইসলাম তাঁর স্ত্রী আক্তার বেগমকে নিয়ে বেশির ভাগ সময় বড় মেয়ের বাড়ি ঢাকার মিরপুর ১০-এ থাকতেন। সেখান থেকেই নেপাল ভ্রমণের জন্য বিমানযোগে সোমবার দুপুরে বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন।’

রাজশাহী বরেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ আলমগীর মালেক কালের কণ্ঠকে জানান, নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে তাঁর বোন হুরুন নাহার বিলকিস বানু ও দুলাভাই হাসান ইমামও রয়েছেন। তাঁরা দুজনেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলেন। বোন অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক আর দুলাভাই ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব। তাঁর পরিবার এখন লাশের অপেক্ষায়। লাশ এলে রাজশাহীতে দাফন সম্পন্ন করা হবে।

হাসান ইমাম ও নজরুল ইসলাম পরস্পর বন্ধু ছিলেন। তাঁদের পারিবারিকভাবেও যাতায়াত ছিল। এ কারণেই দুই বন্ধু এবং তাঁদের দুই স্ত্রীকে নিয়ে নেপাল ভ্রমণে বের হয়েছিলেন তাঁরা।

সাবেক যুগ্ম সচিব হাসান ইমাম অবসরজীবনেও ব্যাপক পড়াশোনা করতেন বলে দাবি করেন অধ্যক্ষ আলমগীর মালেক। তিনি আরবি, ফারসি, ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সদরের নামো সংকপুর গ্রামে। হাসান ইমাম ও তাঁর স্ত্রী হুরুন নাহার বিলকিস বানুর দুই সন্তান কানাডায় থাকেন। মৃত্যুর খবর তাঁদের কাছে পৌঁছানো হয়েছে। খবর শুনে তাঁরা দুজনেই কানাডা থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। 

ইমরানা কবির হাসি ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর স্বামী রকিবুল হাসান ঢাকায় একটি বেসরকারি সফটওয়্যার কম্পানিতে চাকরি করেন। ওই শিক্ষিকা রাজশাহীর মুন্নাফের মোড় এলাকায় ভাড়া থাকতেন। তাঁর স্বামীও রুয়েটের শিক্ষার্থী ছিলেন। নেপাল যাওয়ার আগে তাঁরা বিমানবন্দরে সেলফি তুলেছিলেন।

আহত রুয়েট শিক্ষিকা ইমরানা কবির হাসির অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁর শরীরের ৩৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। রুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল আলম বেগ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।  

হাসির মামাশ্বশুরের বরাত দিয়ে উপাচার্য জানান, ‘হাসির শ্বাসনালিসহ শরীরের ৩৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাঁকে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। ৭২ ঘণ্টা পর তাঁর অবস্থা সম্পর্কে  বিস্তারিত জানা যাবে। এ ছাড়া হাসির বাঁ হাতে বড় ধরনের জখমের চিহ্ন রয়েছে।’

 



মন্তব্য