জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক তিনি। সন্ধ্যাকালীন কর্মক্ষেত্র মালিবাগের মেডিনোভা। আর সেখানে গেলেই ডা. মো. তৌফিকুর রহমান ফারুকের নেমপ্লেটের নিচের নোটিশের দিকে চোখ যাবে আপনার। লেখা, 'মুক্তিযোদ্ধাদের বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।' ফারুকের জন্ম মুক্তিযুদ্ধকালে। আগস্ট মাসে। স্বাভাবিক কারণেই যুদ্ধ দেখেননি তিনি। জন্মদাত্রী মা যুদ্ধের ধকল সয়েছেন পুরোপুরি। অন্তঃসত্ত্বা মাকে জীবনের মায়ায় এখান থেকে ওখানে ছুটতে হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা জেলার খাদিমপুর গ্রামের সন্তান ফারুকের বাবা আনোয়ার হোসেন মোল্লা সংসারের চেয়েও দেশকে বড় মনে করে যোগ দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধ শেষে একটা দেশ ও একজন সন্তান পেয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন। যুদ্ধের দগদগে ঘা দেখতে দেখতে ফারুকের বেড়ে ওঠা। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে ফারুকের আরো কৌতূহল জাগে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে। বাবার কাছে শুনেছেন যুদ্ধের কথা। দাদা কোলে নিয়ে বলতেন মুক্তিযুদ্ধকালে মানুষের দুর্ভোগের কথা, পাকিস্তানি বাহিনী ও এ দেশের কিছু দালাল জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, পিডিপি ও নেজামে ইসলামের সদস্য ও সমর্থকের কুকর্ম আর অত্যাচারের কথা। জানতে পারেন মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কথা। আর তাই শৈশব থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্মান করেন। চিন্তা করতে থাকেন, যদি সুযোগ আসে, তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে তাঁদের জন্য কিছু একটা করবেন তিনি। ডাক্তার হয়ে নিজের জায়গা থেকে সেই কিছু একটাই করার চেষ্টা করছেন তিনি। কাজ করতে চাইলে সব জায়গা থেকেই করা যায়। তবু ডাক্তারের সুবিধাটা বেশি, সেই সুবিধাটা কাজে লাগাচ্ছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করা ফারুক। তার পরই নিজের কৈশোরের স্বপ্নপূরণের দিকে পা বাড়ান তিনি। প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু ক্যাম্প এবং বিচ্ছিন্ন সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ ছিল সেটা। কিন্তু বিচ্ছিন্ন এসব চেষ্টা করতে গিয়ে দেখেন এতে স্থায়ী কোনো উপকার হয় না। তা থেকেই সিদ্ধান্ত, স্থায়ীভাবেই তাঁদের সেবায় নামার। কিন্তু তখনই আবার চলে যেতে হয় উচ্চতর শিক্ষা নিতে বিদেশে। বিদেশে অনেক দিন কাটিয়েছেন; কিন্তু নিজের সংকল্পের কথাটা ভোলেননি। তাই ২০০৩ সাল থেকে যখন পুরোদস্তুর শুরু করলেন ডাক্তারি প্র্যাকটিস, তখন থেকেই খুঁজে বেড়ান মুক্তিযোদ্ধাদের। তাঁদের চিকিৎসা করে এই মুক্তিযোদ্ধা সন্তান যেন হয়ে ওঠেন এ কালের মুক্তিযোদ্ধা। মেডিনোভা মেডিক্যাল সার্ভিসে নিজের চেম্বারটি তাই অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এক ভরসার স্থল। তাঁর কথা, 'এটা আসলে খুবই সামান্য বিষয়। একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি একজন রোগীর কাছ থেকে ৬০০ টাকা নিই। একজন রোগীর কাছ থেকে এটা না নিলে এমন কিছু আয়ে ঘাটতি হয় না। বরং পাওয়া যায় একটা পরম প্রশান্তি। কিছুটা দায়শোধও হয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি।' তাঁর হিসাবে এটা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি কোনো দয়া নয়, এটা তাঁদের অধিকার। আর এভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ঋণ শোধ করতে গিয়ে একটা ব্যক্তিগত লাভও হচ্ছে তাঁর। তাঁর নিজের মতে, 'এভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। তাঁদের সামনাসামনি দেখতে পাচ্ছি। তাঁদের কীর্তি শুনতে পাচ্ছি। বয়স যাঁদের মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার সুযোগ দেয়নি তাঁরা কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করে, তাঁদের সাহচর্যে গিয়ে এভাবে মুক্তিযুদ্ধে শরিক হতে পারি।' ডা. ফারুক তাঁর এই সেবা কার্যক্রম শুরু করার সময় ভেবেছিলেন, ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাবে। গরিব মুক্তিযোদ্ধারা আসবেন অনেক। কিন্তু বাস্তবে সে রকম ঘটনা ঘটেনি। তাঁর প্রত্যাশার তুলনায় সাড়া অনেক কম। কেন? নিজের বিশ্লেষণে কারণটা হলো, আসলে গরিব মুক্তিযোদ্ধারা দেশের বিভিন্ন স্থানে। তাঁদের পক্ষে ঢাকা আসাই অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। তা ছাড়া তাঁর এই কার্যক্রমের খবরও অনেকে জানেন না। বিষয়টার সুরাহা কিভাবে করা যায় তিনি সেটা ভাবছেন। আবার অন্য রকম অভিজ্ঞতাও হয়। স্বাভাবিকভাবেই হয়তো কোনো রোগী এসেছেন, চেম্বারের সামনে নামফলকের নিচে লাগানো নোটিশ দেখে মুক্তিযোদ্ধা রোগী খুব খুশি হন। তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ ফি দিতে চান। বলেন, তাঁর ব্যয়ভার বহন করার ক্ষমতা আছে। কিন্তু তাহলেও ফারুক তাঁর কাছ থেকে ফি নেন না। তাঁর যুক্তি, 'এটা দান কিংবা করুণা নয়। তাঁদের প্রতি সম্মান জানাতেই আমি টাকা নিই না।' সেই সম্মান জানাতে চান সব সময়। আর তাই আশা করেন, কালের কণ্ঠে প্রকাশিত এই লেখা পড়েও হয়তো মুক্তিযোদ্ধারা পরামর্শ সেবার জন্য তাঁর কাছে আসতে পারেন। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত যাঁরা, তাঁদের যোগাযোগের জন্য তিনি এমনকি তাঁর মোবাইল নম্বরও দিয়েছেন। যেকোনো মুক্তিযোদ্ধা চাইলে যেকোনো সময় তাঁর (০১৭১১০৪৭১৮৯) এই নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন। কিংবা সরাসরি চলে আসতে পারেন মেডিনোভার মালিবাগ শাখায়। গত এক বছরের একটি হিসাব অনুযায়ী, এই সময়ে ১০০ জনের মতো মুক্তিযোদ্ধাকে সেবা দিয়েছেন তিনি। শুধু এখানেই কাজ শেষ না করে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগও রক্ষা করেন নিজের মতো। এখন ভাবছেন মুক্তিযোদ্ধা রোগীদের জন্য একটা আলাদা তথ্য ব্যাংক করার। যেহেতু বেশির ভাগ মুক্তিযোদ্ধাই বয়স্ক এবং তাঁদের অনেক ক্ষেত্রে ডাক্তারের লেখা পড়ে বোঝা কঠিন, তাই তাঁদের জন্য ব্যবস্থাপত্র তিনি তৈরি করেন কম্পিউটারে। নিজেই ফোন করে খোঁজখবর নেন। ওষুধে কাজ হচ্ছে কি না! নতুন কিছু দরকার আছে কি না! আর এভাবেই হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে হৃদ্যতা তৈরি হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা রোগীদের। একজন মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের এমন ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে যান রণাঙ্গনে জীবন বাজি রাখা মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁরা বেশির ভাগই এসে দাঁড়িয়েছেন এখন জীবনের শেষপ্রান্তে। আর হয়তো ২০-৩০ বছর। তারপর আর পাওয়াই যাবে না। আর সে জন্যই সমাজের সচেতন মানুষকে এই সময়টা কাজে লাগিয়ে এ সময়ের 'মুক্তিযোদ্ধা' হওয়ার অনুরোধ ডা. ফারুকের, 'মুক্তিযোদ্ধারা তো বয়সে ভারাক্রান্ত। হয়তো কুড়ি বছর পরে কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে খুঁজেও পাওয়া যাবে না। তাই নাগরিক হিসেবে চিকিৎসক, হাসপাতাল, ক্লিনিক, ওষুধ উৎপাদনকারী কিংবা মুক্তিযুদ্ধপ্রেমী যেকোনো নাগরিক মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সুবিধায় এগিয়ে আসতে পারেন। এ মুহূর্তে এটা হবে মুক্তিযুদ্ধের মতোই একটা কাজ।' নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আরেকটা পরামর্শ আছে তাঁর, 'সাধারণত জেনারেল হাসপাতালগুলোতে গরিব রোগীরা বেশি আসেন। তাই জেনারেল হাসপাতালগুলো যদি উদ্যোগ নেয়, তাহলে মুক্তিযোদ্ধা গরিব রোগীরা সুবিধা পাবেন আরো বেশি।' এভাবেই ডাক্তারির কঠিন জগতে ডুবে থেকেও একজন ডা. ফারুক হয়ে উঠেছেন এ যুগের 'মুক্তিযোদ্ধা'। তিনি সেখানে একা থাকতে চান না। চান আরো অনেক অংশীদার। আরো অনেক সঙ্গী। মুক্তিযুদ্ধও তো এমনই সবার অংশগ্রহণেই হয়েছিল!